এগিয়ে যাচ্ছে নারী সমাজ

সোমবার, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৭ ২:৫৫ PM | বিভাগ : অর্জন


আমাদের দেশের নারীরা পর্যায়ক্রমে তাদের কাজের দক্ষতার দেখিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এক সময় আমাদের দেশের পুরুষ শাসিত সমাজের ধারনা ছিলো যে, মেয়েরা  শুধু ঘর ও বাড়ির কাজ করবে। তারা বাড়িতে থেকেই তাদের জীবন ধারন করতো। কিন্তু বর্তমান সমাজে এসে মানুষের সেই ধারনাটা পাল্টিয়ে দিলো আমাদের দেশের নারী সমাজ। বাংলাদেশের এমন কোনো সেক্টর বা বিভাগ নেই যেখানে নারী নেই। বর্তমানে নারীরা দেশের তৃণমূল পর্যায় হতে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ আসনেও দখল করে আছে আমাদের নারী সমাজ। রাজনীতি হতে শুরু করে দেশের প্রশাসনিক পর্যায়ের অনেক বড় বড় পদে বর্তমানে দেশের নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছে। বর্তমানে আমাদের দেশের ১০৬ জন নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দায়িত্ব পালন করছেন। কর্মরত ইউএনওদের মধ্যে এই সংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ। এ ছাড়া সরকারের জনপ্রশাসনে নারী সচিব আছেন ১০ জন। ৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং ১৬ জন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার তথ্য মতে, প্রশাসন ক্যাডার ছাড়াও সরকারি চাকরিতে নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ‍দিন দিন ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ২০০৯ সালে সরকারি চাকরিতে নারীর সংখ্যা  ছিল ২ লাখ ২৭ হাজার ১১৪ জন। ২০১৫ সালে ওই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৩৫৪। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে সরকারি চাকরিতে নারী কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দেড় লাখ।

দেশে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা আছেন ৫ হাজার ৭৫৯ জন। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ১০০ জনই নারী। মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ ও পদায়ন শাখার তথ্য মতে, প্রশাসনের তৃণমূল পর্যায়ের বিভিন্ন স্তরে নারী কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ দিনে দিনে বাড়ছে। এতে দেখা যায়, আগে নারী কর্মকর্তাদের বেশির ভাগই ঢাকাকেন্দ্রিক পদগুলোতে থাকতেন। এখন ডিসি ও ইউএনওর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে শুরু করে বিভাগ, জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করছেন নারীরা। আমাদের দেশে বর্তমানে উপজেলার সংখ্যা ৪৯১। এখন পূর্ণাঙ্গ দায়িত্বে ৪২৮টি উপজেলায় ইউএনও আছেন, যাঁদের মধ্যে নারী ১০৬ জন।

কোনো কোনো জেলার অধিকাংশ উপজেলাতেই নারীরা ইউএনও’র দায়িত্ব পালন করছেন। যেমন কিশোরগঞ্জের ১৩টি উপজেলার মধ্যে ৮টি এবং টাঙ্গাইলে ১২টি উপজেলার মধ্যে ৮টিতে ইউএনও পদে এখন নারী। ময়মনসিংহের ১৩টি উপজেলার মধ্যে নারী ইউএনও আছেন ৫টি উপজেলায়।

তৃণমূল প্রশাসনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীর এই অগ্রগতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন দেশের বিজ্ঞমহল। বাংলাদেশের নারীর উন্নয়ন ও অর্জন এখন বিশ্বের কাছে দৃশ্যমান। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ এখনো কম বলে মনে করেন অনেকে।  তৃণমূলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ডিসি ও ইউএনওর পদটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এসব পদে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি খুবই ইতিবাচক।

একজন ইউএনও উপজেলা প্রশাসন পরিচালনা ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন। উপজেলায় তাঁরাই কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করে থাকেন। ফলে প্রচুর কাজের চাপ থাকে তাঁদের ওপর। এরপরও অতি আন্তরিকতার সহিত তারা তাদের দায়িত্ব পালন করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তাদের কাজ করার ক্ষেত্রে দেশের কোনো জায়গায় কোনো অসুবিধা হচ্ছে বলে কোন খবর পাওয়া যায়নি। বরং কাজ করার ক্ষেত্রে বর্তমানে পুরুষরা তাদের কে বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতা করে থাকেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে এখন ৬ জেলায় নারীরা জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। এই জেলাগুলোর মধ্যে আছে সিরাজগঞ্জ, ফরিদপুর, লক্ষ্মীপুর, মুন্সিগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর। এ ছাড়া আট বিভাগের মধ্যে সিলেট বিভাগীয় কমিশনার এখন নারী। তাঁর নাম মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম।

গত ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে ২০৬ জন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) ছিলেন। এর মধ্যে ১৬ জন নারী। নারী কর্মকর্তাদের সংগঠন বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্ক নারী কর্মকর্তাদের জন্য সাংগঠনিকভাবে কাজ করছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, ২ নভেম্বর পর্যন্ত সচিব ও সমপর্যায়ের ৭৮টি পদের মধ্যে ১০ জন নারী রয়েছেন। অর্থাৎ মোট সচিবের মধ্যে প্রায় ১৩ শতাংশ নারী। সাম্প্রতিক সময়ে নারী সচিবদের সংখ্যা এটাই বেশি। এসব কর্মকর্তা হলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব সুরাইয়া বেগম, মহিলা ও শিশুবিষয়ক সচিব নাছিমা বেগম, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক কানিজ ফাতেমা, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব মাফরুহা সুলতানা, সরকারি কর্ম কমিশনের সচিব আখতারী মমতাজ, বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসনে আরা বেগম, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য জোয়েনা আজিজ, শ্রম ও কর্মসংস্থানসচিব আফরোজা খান, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানসচিব নমিতা হালদার এবং পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য শামীমা নার্গিস।

বর্তমান সরকার নারীদের সামনে নিয়ে আসতে কর্মকৌশল প্রণয়ন, বাজেট বৃদ্ধি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। এখন চাকরির ক্ষেত্রেও নারীরা এগিয়ে আসছেন। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নারী বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন প্রশাসনের গতিও বেড়েছে। হয়তো দেখা যাবে, একটা পর্যায়ে চাকরির ক্ষেত্রেও নারী ও পুরুষ সমান হবে। আমাদের মোট জনসংখ্যার একটা বিশাল অংশ নারী। এই বিশাল অংশকে বাদ দিয়ে আমাদের অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব না। তাই আমাদের দেশের জাতীয় অর্থনীতির চাকাকে আরও গতিশীল করতে হলে পুরুষের পাশাপাশি নারী সমাজ কে ও এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমান সরকার দেশের নারী সমাজকে আরও আধুনিকায়ন করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের জন্য রয়েছে বিশাল সুযোগ সুবিধা। মেয়েদের দ্বাদশ শ্রেনী পর্যন্ত বিনা বেতনে লেখাপড়া করার সুযোগ করে দিয়েছে। সাথে রয়েছে উপবৃত্তির ব্যবস্থা। কারন দেশের নারী সমাজকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে না পারলে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব না। আমাদের দেশকে শতভাগ শিক্ষার আওতায় আনতে হলে আগে আমাদের নারী সমাজ কে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে কারণ একজন মা শিক্ষিত হলে পুরো পরিবার শিক্ষিত হবে।


  • ১৮৫৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

মো.ওসমান গনি

লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ফেসবুকে আমরা