একটি হাত

বুধবার, ফেব্রুয়ারী ২১, ২০১৮ ১:০৫ PM | বিভাগ : পথিকৃত


১৯৫২সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ছাত্রী রওশন আরা বাচ্চু মাকে কোনোমতে বুঝিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছেন। ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী পুলিশের ব্যারিকেড ছিন্ন করে ১৪৪ ধারা ভাঙতে ১০জন ১০জন করে ছাত্ররা দু’দফায় বের হন। তৃতীয় দলে বের হন ছাত্রীরা। রওশন আরা বাচ্চু অগ্রভাগে ছিলেন সেই দলের।

মেয়েরাই প্রথম ব্যারিকেড টানাহ্যাঁচড়া করে ভাঙে। তাদের পিঠে পুলিশের লাঠির আঘাত পড়ে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’, শ্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে চলছেন তাঁরা। ‘পুলিশি নির্যাতন চলবে না, চলবে না’ এই বলে রওশন আরা বাচ্চুরা ব্যারিকেড ভেঙে এসেম্বলির দিকে অগ্রসর হলেন। পুলিশ হাঁটুভাঙা অবস্থায় রাইফেল নিয়ে দাঁড়িয়ে। পুলিশের টিয়ারশেলে আহত হয়ে চোখ দিয়ে পানি ঝরছে রওশন আরা বাচ্চুর। যখন ছাত্র-ছাত্রীরা মেডিকেল মোড়ে আসলেন তখন আর তাঁরা সামনের দিকে এগুতে পারলেন না। গুলি করা শুরু হয়ে গেছে। 

হঠাৎ রওশন আরা নিজেকে আবিষ্কার করলেন রাজপথে; একা।

ইতোমধ্যে অনেককে পেছন থেকে গ্রেফতার করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মেডিকেলের মোড়ে আসতেই গুলির শব্দ শুনতে পেলেন তিনি। ঢাকা সিটির এসপি কৌরেইশীর নির্দেশে গুলি চলছে। বরকতের উরুতে গুলি লেগেছে। বুকে গুলি লেগেছে সালামেরও। জিমনেশিয়াম গ্রাউন্ডে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন কিশোর অহিউল্লাহ। তখনও রওশন আরা জানতে পারেন নি সেসব। তিনি দলছাড়া হয়ে বুঝতে পারছেন না কোন দিকে যাওয়াটা নিরাপদ হবে। মেডিকেলের মোড়েই ছিলো দুটি বইয়ের দোকান আর একটা রেস্তোরাঁ। ‘শানে পাঞ্জাব’ রেস্তোরাঁর পাশে তিনি লুকিয়ে থাকেন কিছুটা সময়। আশেপাশে কোথাও কেউ নেই। মনে হলো এখানে থাকাটা নিরাপদ হবে না। তিনি ড. গণির বাড়ি ছিলো পিছন দিকে, মাঝখানে ছিলো তারকাঁটা, সেই তারকাঁটা ডিঙিয়ে পার হতে গেলেন। লাফানোর মুহূর্তে তারকাঁটার সাথে আটকে গেলো তাঁর শাড়ি। নির্ঘাত বেকায়দায় পড়ে যাবেন ওতটা উঁচু থেকে! তখনই, হঠাৎ কোথা থেকে একটা হাত এসে রওশন আরা বাচ্চুর শাড়িটা ছাড়িয়ে দিলো। 

আজ, এতটা বছর পরও জানতে পারেন নি, সেই একটি হাত আসলে কার হাত ছিলো!
প্রশ্ন করলাম, এখনো কি সেই একটি হাত আপনি খুঁজে ফেরেন? 
তিনি নিরুত্তর চেয়ে থাকেন সামনে।

রওশন আরা বাচ্চুরা এবং এমন অসংখ্য একটি হাতের বিনিময়ে এই বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি। আজ তাঁদের সকলের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

[সাক্ষাৎকার গ্রহণে আমার সঙ্গে মূল-ভূমিকায় ছিলেন বাশার খান। ফেব্রুয়ারি ২০১৬]


  • ১৭৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

মোজাফফর হোসেন

লেখক ও গবেষক

ফেসবুকে আমরা