মার্ক্সবাদের সীমাবদ্ধতা দেখার সাহস আমাকে মার্ক্সবাদী দর্শনই যুগিয়েছে

রবিবার, মে ৬, ২০১৮ ১:৪৯ AM | বিভাগ : মুক্তচিন্তা


মার্ক্স নিয়ে বেশ আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে দেখতে পারছি। অনেকের ফেসবুকেই কিছু না কিছু লেখা। কিছুদিন থেকে ফেসবুকে সময় দিতে পারছি না, ইচ্ছেও করছে না। কিন্তু মার্ক্স বলে কথা! তাই পড়ে ফেলি ফেসবুক বন্ধুদের লেখা স্ট্যাটাসগুলো মার্ক্সকে নিয়ে। একটু সময় করতে পারলেই। সভয়ে বলি, মার্ক্সকে নিয়ে লেখাগুলোর একটা বড় অংশ খুব ভাবালুতায় ভরা। যুক্তির ধার নেই সেখানে। কিন্তু কিছু কিছু বিষয়ে ভাবালুতা ভালোই লাগে। ফেসবুকের এক-আধ লাইনে ভাবালুতা প্রকাশ করা খুব অপরাধমূলক কোনো কাজ নয়।
 
 
মার্ক্সের মূল ধরে পড়াশোনা যতোটা করা দরকার ছিলো, আমার ততোটা নেই। সেই অপূর্ণ পাঠের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এ'কথা বোধহয় বলাই যায় যে, মার্ক্সের সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত পৃথিবীর সম্পদে প্রত্যেক মানুষের অধিকারের কথা জোর দিয়ে বলা। তাত্ত্বিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা। এবং সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পথ বাৎলে দেয়া। লড়াই করা। ইতিহাস পালটে দেবার লড়াই। স্বর্গে যাবার উপায় হিসেবে গরীবকে করুণার ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে বরং কীভাবে গরীব তৈরি হয়েছে সমাজে ওইসব স্বর্গলোভী করুণাকারী মানুষের অবৈধ এবং সবল চুরির মধ্য দিয়ে তা দেখিয়ে দেয়া।
 
বল প্রয়োগ করে পৃথিবীর সম্পদের অসম বন্টনের মধ্য দিয়ে মানুষ কীভাবে মানুষকে শোষণ করে,এবং তার উপর দাঁড়িয়ে পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা এবং রাষ্ট্রের বিকাশ হয়, তা ফুলে-ফেঁপে ওঠে এটি চোখে এমনভাবে আর কেউ দেখাতে পারেন নি। কীভাবে আসলে প্রাতিষ্ঠানিক সকল সম্পর্ক এই শোষণের নানা ধরণের উপর প্রতিষ্ঠিত তা তিনি এমনভাবে দেখিয়েছেন যে এসব সম্পর্কের বাগাড়ম্বরগুলো খেলো হয়ে গেছে। কুৎসিত চেহারাটা বেরিয়ে গেছে। এটাকে মেনে নেয়া খুব সহজ না। তাঁর ভাবনার সমর্থক দলগুলোও সেই সত্যকে ধারণ করতে পারে নি। তাঁর চিন্তাকে ধারণ করা আসলেই খুব কঠিন। আমার মনে হয়, তাঁর তাত্ত্বিক অবদানকে বাহ্যিকভাবে উপেক্ষা করা যায় বটে, কিন্তু কেউ সত্যিই যদি সামাজিক সম্পর্কগুলো বুঝতে চায়, তবে মনে ঠিকই জানবে কত নির্ভুল তাঁর বিশ্লেষণ।
 
তাঁর সীমাবদ্ধতা যেখানে ছিলো, সেটাও আমাদের বোঝা দরকার। তিনি শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্ব চেয়েছেন। আপাতদৃষ্টে ধারনা হিসেবে ভালো। শুনতে ভালো। কিন্তু একনায়কত্ব তো একনায়কত্বই। যত ভালো বিধানই হোক, সেই বিধান যখন প্রাতিষ্ঠানিকতা তৈরি করে, তখন প্রাতিষ্ঠানিকতার ভূত তাকে গিলে খাবেই। সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর পতনের পর সেই ভূতের চেহারা আমরা দেখেছি। রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন সেই শুরুর দিকেই। অবিরল প্রশংসার সাথে যান্ত্রিকতার কাঠামোকে প্রশ্ন করতে ভোলেন নি। ভোলেন নি ভবিষ্যত নিয়ে সংশয় প্রকাশ করতেও। মূলকথা, একনায়কত্ব যারই হোক, যত বিপ্লবী প্রতিশ্রুতি নিয়েই আসুক, সেই ব্যক্তি বা শ্রেণি যখন এক নায়কের ভূমিকায়, তখন তার পীড়ন কম হবার কোনো কারণ নেই। একচেটিয়া ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তি বা শ্রেণি কিন্তু তখন আর শ্রমিক-মেহনতি শ্রেণিমাত্র নয়। তারা ক্ষমতাবান। এই দিকটি তিনি কতোটা ভেবেছেন জানি না, ভাবলেও সেই আলোচনা পৃথিবীর দেশে দেশে প্রচারিত মার্ক্সীয় পঠন-পাঠনে জায়গা করে নিতে পারে নি। এই দিকটি বিবেচনা না করে মার্ক্সবাদের আলোচনা ভক্তিতেই মেলাবে।
 
মার্ক্সবাদ পড়ার পাশাপাশি তাই ছোট একটা বই 'দ্য অ্যানিমল ফার্ম' পড়াটাও জরুরি। প্রাতিষ্ঠানিক সমাজতন্ত্রের ধব্জাধারীরা ব্যক্তিকে কোথায় ঠেলেছিলো এবং কীভাবে নিজেরা আসলে কায়েম করেছিলো এক বিভীষিকার সাম্রাজ্য যা নিজেদের খোদিত প্রতিশ্রুতির সম্পূর্ণ বিপরীত, এই পাঠ ছাড়া কোনো মতাদর্শের প্রাতিষ্ঠানিক আচরণের পাঠ সম্পূর্ণ হবার নয়।
 
আরো একটি বিষয়। সমাজতত্ত্বের বুদ্ধিবৃত্তিক পাঠে মার্ক্স পড়ে যে আরাম পাই, এমন এখনো আর কোথাও পাই নি। তবুও মনে হয়, ব্যক্তির মনস্তত্ব নিয়ে ভাববার অবকাশ হয়তো তিনি করে উঠতে পারেন নি। কেনো সামাজিক খামারে শ্রম দেয়ার পাশাপাশি নিজের বাসার টমেটো গাছটির পরিচর্যায় একটু বাড়তি শ্রম দিয়েছে মানুষ, একটু বেশি মমতা-এটিও বোঝা চাই যে! মার্ক্সের রচনায় এই দিকটি উপেক্ষিত থাকার কারণে মার্ক্সবাদীদের ভেতরে গোটা মনঃসমীক্ষণ বিষয়টিকেই বূর্জোয়া শাস্ত্র হিসেবে বাতিল করার প্রবণতা এখনো স্পষ্ট। ফলে মার্ক্সবাদ যতোটা সমষ্টির কথা বলতে পেরেছে, ব্যক্তির অন্তর্লোক নিয়ে কথা বলতে পারে নি। কিংবা উপেক্ষা করে গেছে। অথচ ইতিহাসের সকল কালপর্বেই কিন্তু ব্যক্তি ছিলো। সেদিক থেকে বরং আমাদের উপমহাদেশের মার্ক্সবাদ চর্চাকারীদের মধ্যে এক ধরণের সমন্বয়ের ব্যাপার চোখে পড়ে।
 
দেবব্রত বিশ্বাস যেমন ভারতীয় গণনাট্যের সাথে যুক্ত থেকেও, কাঁধে হারমনিয়াম ঝুলিয়ে গণমানুষের জন্য গাইতে গাইতেও, নিজেকে লুপ্ত করে দেন, 'ক্লান্তি আমার ক্ষমা কর প্রভু' গানে। এই স্পিরিচুয়ালিটি কি মাটি থেকে উঠে আসা যা শুধু বস্তুবাদী দর্শন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না? কিংবা ল্যাটিন আমেরিকার গীর্জার যাজকেরা যখন সমাজতান্ত্রিক বিল্পবে যোগ দেন, কী বলবো সেই ঘটনাকে? কেমনভাবে ব্যাখ্যা করবো কবি আর্নেস্ত কার্দেনালকে, যাঁর : 'তোমাকে হারালাম মানে আমরা দু'জনেই হারালাম, আমি হারালাম কারণ তুমিই ছিলে আমার সবচেয়ে ভালোবাসার, আর তুমি হারালে কারণ অন্য কেউ পারবে না বাসতে তেমন ভালো যেমনটা আমি তোমাকে বেসেছি।' কিংবা ‘কোস্টারিকার এই গোলাপগুচ্ছ গ্রহণ কর মিরিয়াম, সঙ্গে প্রেমের এই পংক্তিনিচয়। আমার কবিতা তোমাকে বলবে, 'গোলাপের মুখ তোমার মুখের মতোই, গোলাপেরা তোমাকে বলবে।' পড়ে বড় হয়েছি? তিনি যাজক, কবি এবং বিপ্লবী।
 
আজ আমি আর শুধু মার্ক্সীয় তত্ত্ব পড়ে তৃপ্ত নই। মার্ক্স আমাকে বুদ্ধিবৃত্তিক আশ্রয় দেন সমাজের স্তর বিন্যাস বোঝার জন্য। উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে সমাজ কীভাবে পাল্টায়, পাল্টায় সম্পর্ক- এসব বোঝার জন্য মার্ক্স পড়ার কোনো বিকল্প নেই। অথচ মার্ক্স পড়ার পাশাপাশি 'রক্তকরবী'ও পড়তে চাই। পড়তে চাই 'হ্যামলেট'। এমনকি 'মাদামবোভারি'। খোদ লেনিনের সবচেয়ে প্রিয়কবি তাই পুশকিন, চিরায়ত রাশান কবি। মায়াকোভস্কিও প্রিয়, সবচেয়ে নয়। অদ্বৈত মল্লবর্মণের 'তিতাস একটি নদীর নাম' পড়ার পরে বুঝতে পারি 'পদ্মানদীর মাঝি' এক শহুরে বিপ্লবীর লেখা। কায়দাকানুনের এক ময়নাদ্বীপ বানাতে হয় গল্পের খেই ধরার জন্য। ভুল বুঝবেন না, মানিকের অনেক লেখাই আমার খুব প্রিয়। 'পুতুল নাচের ইতিকথা' আমার পড়া পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের একটা। কিন্তু ফের বলি, 'তিতাস একটি নদীর নাম' পড়ার পরে বুঝতে পারি 'পদ্মানদীর মাঝি' এক প্রজেক্ট উপন্যাস। আসল আর আরোপিতের পার্থক্য স্পষ্ট হয়। মার্ক্সবাদ ইউরোপকেন্দ্রিক পূঁজিবাদী বিকাশের যে পর্যায়ে গিয়ে বিকশিত হয়েছিলো, সেই ঐতিহাসিক লিগেসিকে ধারণ করে। মার্ক্সবাদ পাশ্চাত্য দর্শন ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। তাই মার্ক্সবাদ ইউরোপের মাটিতে যেভাবে আত্মীকৃত হতে পারে, আমাদের সব দেশে তেমন কখনোই হবে বলে মনে হয় না।
 
তত্ত্ব যে উত্থান পরিসরের অনুভব-কাঠামোকেই ধারণ করে, এই ধারণা ভেতরে দিন দিন জোরদার হচ্ছে। সাহস নিয়ে বলেই ফেলি, মার্ক্সবাদ মূলত ইউরোপকেন্দ্রিক মতবাদ। তাহলে কি আমার দেশে এই তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা নেই? অবশ্যই আছে। মানুষের মুক্তির প্রসঙ্গ পৃথিবীর যেখানেই উচ্চারিত হয়েছে, তার নির্যাসের প্রাসঙ্গিকতা আমার দেশেও আছে। কিন্তু মুক্তির সেই বার্তা আমার মাটিতে আত্মীকৃত হবার সৃজনশীল প্রয়োগ চাই। সেটা নেই বলে সবচেয়ে নীতিবান মানুষেরা অজস্র ত্যাগের বিনিময়েও কোনো ফল বের করে আনতে পারেন নি আজতক। এই দায় কেবল নেতা কিংবা দলের নয় বোধহয়।
 
গুছানোর কাজটি না করেই লেখাটি দিচ্ছি। তবে, আজ যে কথাগুলো ভাবছি বা বলতে পারলাম, এও মার্ক্স এবং উত্তর-মার্ক্সবাদী সমালোচনাত্মক ধারার তাত্ত্বিকদের অবদান। নিজের চিন্তাকে চিনতে এবং বলতে পারার জন্য আমি মার্ক্সের কাছে অশেষ ঋণী।
 
এই মহাপ্রতিভাবান দার্শনিকের জন্মবার্ষিকীতে একেবারে বাঙালি কায়দায় অভিবাদন।
 

  • ১৩৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

কাবেরী গায়েন

অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ওসাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ফেসবুকে আমরা