জেন্ডার সমতা ও বাঙালীর যাবতীয় অজ্ঞতা

বুধবার, মে ৯, ২০১৮ ৪:১৬ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


এদেশের বেশীরভাগ মানুষের "নারী-পুরুষের সমানাধিকার" সম্পর্কিত ধারাণাগুলো বেশ হতাশাজনক। অধিকাংশই মনে করে, মেয়েরা শারীরিকভাবে দুর্বল, মানসিকভাবে নির্বোধ ও বোধ-বুদ্ধিহীন, বেশি আবেগপ্রবণ, ছেলেরা যা পারে, মেয়েরা তা পারেনা। মেয়েরা ছেলেদেরকে ছাড়া চলতে পারেনা, তাই পুরুষের অধীনে থাকতে হবে। কেউ কেউ আবার বলে থাকেন,   'মেয়েরা কি পুরুষের মতো জামা খুলে রাস্তায় আসতে পারবে? তাহলে কিসের সমানাধিকার?'

তর্ক-বিতর্কের যেমন শেষ নেই, মজা নেওয়ার কোন সীমা-পরিসীমা নেই। ধরুন, "কোন মেয়ে বন্ধুকে বলছে,  গাছ থেকে বরই পেরে দে। বন্ধুটি উত্তর দিল, "সমানাধিকার নিবি তো গাছে চড়ে বরই পারতে পারিসনা কেনো? বা ভারী ব্যাগ টানতে পারিসনা কেন? অথবা, রাতে একা বের হতে পারিসনা কেন? কিংবা বাসে সংরক্ষিত আসন আর চাকুরিতে কোটা লাগে কেন?"---এ ঘটনায় মেয়েটি পুরোদমে জব্দ হয় আর পুরুষটি প্রভূত আনন্দলাভ করে।২১ বছরের জীবনে যত পুরুষের সাথে সমানাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তাদের ধারণা এরচেয়ে উন্নত  মনে হয়নি। নারীর সংখ্যাও কম নয়, তাদের সুরও এক এবং অভিন্ন। আসুন, প্রথমে এ বিষয়ে একটু পড়াশুনো করে নিই তারপর দেখি সমানাধিকার কতটুকু সম্ভব! নাকি পুরোটাই অসম্ভব আর অযৌক্তিক।

নারী-পুরুষের সমানাধিকার'  প্রসঙ্গের সাথে  কিছু  শব্দ ওতোপ্রতোভাবে জরুরি।

১.সেক্স  ২. জেন্ডার  ৩. সেক্স ডিফারেন্স ৪. জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশন   ৫. জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি।

* সেক্স:  নারী-পুরুষের জৈবিক পার্থক্য বুঝাতে সেক্স শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। মানুষের শরীরে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম থাকে যার ২২ জোড়া নারী পুরুষে একই ১ জোড়া ব্যতীত। এই ১ জোড়া নির্ধারণ করে থাকে কে ছেলে আর কে মেয়ে। জোড়াটি xx হলে নারী আর xy হলে পুরুষ শিশু জন্ম নেয়। এই ১টি ক্রোমোজোমের পার্থক্য ছেলেশিশু থেকে মেয়েশিশুর যৌনাঙ্গ ও শারীরিক কিছু বৈশিষ্ট্য আলাদা করে। কিছু পার্থক্য দেখে নেওয়া যাক:

১.বয়:সন্ধিতে মেয়েদের পিরিয়ড হয়, মেয়েরা সন্তান ধারণে সক্ষম, মেয়েদের স্তন ও যোনী থাকে। অপরদিকে, বয়:সন্ধিতে ছেলেদের বীর্যপাত হয়, দাঁড়িগোফ থাকে এবং যৌনাঙ্গের নাম পেনিস।

২. ছেলেদের শরীর পেশিবহুল ও দীর্ঘ, অস্থিসমূহ দৃঢ় এবং হাঁটুসন্ধি দুর্বল। অপরদিকে, মেয়েদের পেশী ও উচ্চতা কিছুটা কম, অস্থিসমূহ নমনীয় এবং হাঁটুসন্ধি দৃঢ়।

* জেন্ডার:  সমাজ ও সংস্কৃতি কর্তৃক আরোপিত ছেলে-মেয়ের সংজ্ঞা বা ভূমিকা যা জন্মগতভাবে নির্ধারিত নয়। যেমন:

১. মেয়েদের চুল লম্বা কিন্তু ছেলেদের ছোট রাখা।

২. মেয়েদের ঘরের কাজ এবং ছেলেদের বাইরের কাজে অভ্যস্ত করা।

৩. মেয়েদের রাগ দমন, গাছে চড়া, মাঠে ছোটা দমন, অপরদিকে ছেলেদের কান্না দমন করা ইত্যাদি।

* সেক্স ডিফারেন্স:  যেহেতু, পুরুষের থেকে নারী কিংবা উল্টে বললে নারীর থেকে পুরুষ জৈবিকভাবে আলাদা এবং প্রকৃতি দ্বারা নির্ধারিত, যা অপরিবর্তনীয়, তাই কোথাও Sex Equality শব্দটি ব্যবহার হয়না, বলা হয় Sex Difference.

* জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশন:  যেহেতু সমাজ ও সংস্কৃতি দ্বারা জেন্জার বা নারী-পুরুষের ভূমিকা নির্ধারণ করা হয় এবং সংস্কৃতিভেদে তা আলাদা, পাশাপাশি জৈবিক পার্থক্যের সাথে যুক্তিযুক্ত নয়, তাই Gender Difference শব্দটিও পাওয়া যায়না, যায় Gender Discrimination.

* জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি:  সমাজ ও সংস্কৃতি দ্বারা নির্ধারিত জেন্ডারে প্রচুর বৈষম্য থাকায়, এটি বরাবরই নারী অধিকারের বিপক্ষে যায়। যেহেতু জেন্ডার একটি পরিবর্তনযোগ্য টার্ম, তাই Gender Equality দাবি করা হয় Sex Equality না।

আসুন কষ্ট করে একটু দেখে নিই, আশির দশকে সমানাধিকার সম্পর্কে তসলিমা নাসরিন কি বলেছিলেন------" একটি X-নামের ক্রোমোজোম বেড়াতে বেড়াতে আরেকটি একটি X-নামের ক্রোমোজোমেরর গায়ে গা লাগালো। সে Y-নামের ক্রোমোজোমের গায়েও গা লাগাতে পারতো। X এবং Y এর মাঝে মূলত কোন পার্থক্য নেই, A এবং B এর ভেতর যেমন নেই অথবা R এবং S এর ভেতর! A কেউ বড় নয় B, O এবং P এর  ওজন কিংবা আয়তন কারো চেয়ে কারো কম নয়,  X যেমন Y-ও তেমন কারো চেয়ে কেউ কম মূল্যবান নয়। XX থেকে জন্ম নিচ্ছে মানুষ, XY থেকে জন্ম নিচ্ছে মানুষ, শারীরিক পার্থক্য ছাড়া মূলত কোন পার্থক্য নেই। তারা হাসে, খায়দায়, ঘুমোয়, অর অল্প অল্প মানবিক দোষগুনে বর্ধিত হতে থাকে, তারা কেউ কারো চেয়ে কম অর্থবহ নয়। ভাগাভাগি হবার কোন কারণ নেই। তবু  একদল তড়িঘড়ি নিয়ে নিল গদিওয়ালা চেয়ার, সম্পত্তির ৮০ভাগ এবং মাছের মুড়ো। আরেকপাতে পড়ে রইল, এঁটো কাটা, সস্তা অলতা শিশি, সুগন্ধি কেশতেল। X এবং Y এর মধ্যে আশি এবং বিশের, উঁচু কিংবা নিচু বা অধিক এবং অল্পের কোন সম্পর্ক নেই। অথচ Y,  X-এর কাঁধে চেপে বসে আছে, শিস দিচ্ছে, বগল বাজাচ্ছে। X-এর ঘাড়ে ঘা, জানুতে ব্যাথা, কোমড়ে খিল। এ বৈষম্য চোখের সামনে দেখছি সবাই, অথচ কেউ কোন কথা বলছি না! আমাদের জিভ কাটা, ঠোঁটে সেলাই, হাত বাঁধা, পায়ে শেকল। আমরা কি কেউ কোন কোন দিন কোন কথা বলবো না?"

প্রকৃতির কি নির্মম পরিহাস! তসলিমাকে দেশ থেকে তাড়িয়েছি ঠিকই কিন্তু আজও তার ৮০'র দশকের চিন্তাই পেরোতে পারিনি আমরা। যে মানুষটা আলো দিতে চেয়েছিলো, তাকে নির্বাসিত করে পুরো একটি সমাজকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছি।

যা হোক, সেক্স এবং জেন্ডারের পার্থক্য বুঝে থাকলে, এটুকু তো নিশ্চিত যে, শারীরিক কিছু বিভেদ ছাড়া নারী-পুরুষে কোন বিভেদ নেই। জেন্ডার সমতা তাই অসম্ভব কোন বিষয়ও নয়। জেন্ডার সমতা মানে ছেলেরা দাড়িয়ে প্রস্রাব করে বলে নারীদেরও করতে হবে এমন নয়, মেয়েরা সন্তান ধারণ করে বলে ছেলেদেরও করতে হবে এমনও নয়। জেন্ডার সমতা মানে হল ঘরের কাজ একা নারীর আর বাইরের কাজ একা পুরুষের নয়। জেন্ডার সমতা হল, সন্তান লালনপালন একা নারীর দায়িত্ব নয়, পুরুষেরও। জেন্ডার সমতা হল পুরুষের অধীনতা নয় বরং পুরুষের মতোই স্বাধীনতা। জেন্ডার সমতা হল ঘরের বাইরের সব কাজ ভাগাভাগি করে করা, সকল কাজে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ। কোন কাজ ছোট, কোন কাজ বড় ভেবে ভাগাভাগি হয়ে যাওয়া নয়। মেয়েরা রাগবে না আর ছেলেরা কাঁদবেনা এমন প্রকৃতিবিরোধী আচরণ নয়। খেলাধুলা, উচ্চশিক্ষা, বাইরের কাজ থেকে মেয়েদের আলাদা রাখা নয়। জেন্ডার সমতা মানে শুধু নারীর মুক্তিই না, পুরুষেরও একা অর্থদায় থেকে মুক্তি।


  • ১৮৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

নওরীন পল্লবী

নারীবাদী লেখক।

ফেসবুকে আমরা