কাঁকন বিবিদের বীরত্ব সূর্যস্পর্ষী

শনিবার, মার্চ ২৪, ২০১৮ ৪:৪৩ AM | বিভাগ : অর্জন


আমি যে স্কুলে পড়েছি, সেই স্কুলে এসএসসি ব্যাচের জন্য স্পেশাল ক্লাসের ব্যবস্থা করা হতো। সেকশনগুলোর মধ্যে মেয়েদের একটি সেকশনের নাম “বীরাঙ্গনা সখিনা” । একদিন আমি এক সিনিয়র আপুকে বলতে শুনেছিলাম যে, এই সেকশনে তিনি পড়তে চান না; কারণ অন্যরা, বিশেষ করে ছেলেরা নাকি তাকে বীরাঙ্গনা বলে ক্ষ্যাপায়। আমি জানতাম বীরের ফিমেইল জেন্ডার হিসেবে ‘বীরাঙ্গনা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এবং জানতাম যে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ওপর যে যৌন-সহিংসতা হয়েছিলো, সেই নারীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনা উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিলো। আমি বললাম যে, বীরাঙ্গনা শব্দটি তো ভালো, আপনার অসুবিধা কোথায়? সেই আপু বলেছিলো, “আররে এরা তো সবাই নষ্ট হয়ে গেছে, ওদের ধরে ধরে ইজ্জত লুট করেছে না, পাকিস্তানি সেনারা। বীরাঙ্গনা বললেই কি এরা আসলেই বীরাঙ্গনা নাকি?”

পুরুষতান্ত্রিক চেতনার ভাইরাস, এই সমাজের নারীর কোনো অবদানকে স্বীকার করে না। পুরুষতন্ত্র বিশ্বাস করে— নারী অবলা, প্রতি পদে পদে তাঁর একজন ত্রাণকর্তা দরকার। বাজারে পাঠানো থেকে শুরু করে তাঁর প্রাণ বাঁচানো, বা তাঁকে বিপদ থেকে রক্ষা করা পর্যন্ত একজন রক্ষক প্রয়োজন, একজন ত্রাণকর্তা প্রয়োজন। নারী নিজে রক্ষাকারী হতে পারে না। এবং পুরুষতন্ত্র বিশ্বাস করে নারীর সমস্ত অস্তিত্ব আসলে তাঁর যোনীতে। পুরুষতান্ত্রিক চেতনার ভাইরাসে আক্রান্ত নারীসমাজও তাই মনে করে। আর তাই মানবমুক্তির সংকটকালীন যে কোনো সংগ্রামে নারীর অবদান ম্লান, মলিন, বেদনার, এবং অপমানের।

অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও আমাদের দেখতে হয়, ‘বীরাঙ্গনা’ শব্দটিকে রেইপ ভিক্টিম তথা নষ্ট-পতিত মানুষের প্রতিশব্দ করে ছেড়ে দিয়েছে পুরুষতান্ত্রিক আদর্শে দীক্ষিত এবং পাকি বীর্যজাত বরাহ শাবকগোষ্ঠী। আর তাই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে লাখো নারীর ওপর ঘটে যাওয়া যৌন-সহিংসতাকে এই সমাজের মানুষরা চিহ্নিত করে এক কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে; অস্বীকার করতে চায়, মুছে ফেলে দিতে চায় কিংবা করুণা করতে চায়।

এই মার্চ মাসে আমরা হারিয়েছি মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা ও ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে এবং এই ২১ মার্চ আমরা হারালাম বীর প্রতীক কাঁকন বিবিকে। আমার জানা মতে, কাঁকন বিবিকে ‘বীর প্রতীক’ দেয়া উপাধিটি এখনো গ্যাজেট আকারে প্রকাশিত হয় নি। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে, একজন স্পাই হিসেবে তিনি কাজ করেছিলেন। তাঁর দেয়া তথ্যের সাহায্যে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন অপারেশন সফল হয়।

আন্তর্জাতিক যুদ্ধের ইতিহাসের একজন নারী স্পাই ছিলেন মাতাহারি, তাঁর মতো জৌলুস, সৌন্দর্য বা গ্ল্যামার এই আদিবাসী খাসিয়া নারী কাকাত হেনিনচিত কিংবা কাঁকন বিবির ছিলো না। তাই যতটা আগ্রহ নিয়ে দুর্ধর্ষ স্পাই মাতাহারির কাহিনী আলোচিত হয়, কাঁকন বিবির গল্প ততটাই ভাঙা কুলোয় ছাই ফেলার মতো লাগে আমাদের। মাটি চাপা পড়ে থাকে কাঁকন বিবির পাকিস্তানি ক্যাম্পে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার সত্য ঘটনাগুলো। এমন কি চাপা পড়ে থাকে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে অবহেলায়, অস্বীকৃত হয়ে মুক্তিযোদ্ধা নয়, শুধু একজন “খাসিয়া বিটি” হয়ে দুর্দিন যাপন করার গল্প।

এই আমাদের দেশ, যেই দেশে নারীর জন্য বা নারীর পক্ষে কোনো কথা বললেই, কোথা থেকে নোংরা কথার তীর এসে জর্জরিত করে দিতে থাকে আমাদের, সেই দেশে নারীর অবদান বা বীরত্বকে সূর্যস্পর্শী করে তুলে ধরার চেষ্টা, কতটুকু উলুবনে মুক্ত ছড়ানো ঠিক জানি না।

কাঁকন বিবি, নিজের জীবনকে বিপন্ন করে, নানান তথ্য যোগাড় করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের দেয়ার উদ্দেশ্যে। ধরা পড়ে যাবার পর পাকিস্তানি ক্যাম্পে পাকিস্তানী বর্বর সেনাদের দ্বারা অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করেও নিজের আদর্শ থেকে এক চুল পিছপা হন নি কাঁকন বিবি।

তাঁর প্রতি রইল সশ্রদ্ধ সালাম, এবং ভালোবাসা।


  • ১৩৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

প্রমা ইসরাত

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

ফেসবুকে আমরা