ছোটগল্প : নিপুর চিঠি

বৃহস্পতিবার, মে ৩, ২০১৮ ৬:৩২ PM | বিভাগ : সাহিত্য


গত চার রাত প্রায় নির্ঘুম কাটিয়েছে নিপু। আজ যদি ঘুমাতে না পারে তবে কাল অফিস করাই মুশকিল হয়ে যাবে। গতকালই বস জানতে চেয়েছিলেন তার চোখের নিচে কালি কেনো; তার ঠিকমতো ঘুম হয় কিনা। নিপু লজ্জা পেয়েছিলো। বস হয়তো ভেবেছেন, নিপু রাতভর মামুনের সাথে কথা বলে। তা তিনি ভাবতেই পারেন, কেননা যুগটাই যে এখন এমন। কিন্তু নিপু তো তা করে না। এমনটা নয় যে, রাত জেগে কথা বলার অভ্যাস তার ছিলো না। তবে সে অনেক আগের কথা। সেই ডিজুস যুগের। তখন সে ছিলো ছাত্র। আর কথা বলতেও তার খুব ভালো লাগতো। সারা রাত কথা বলে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে দুপুর পর্যন্ত ঘুমালেও কোনো ক্ষতি ছিলো না তখন। এখনকার কর্মজীবনের সাথে তার তুলনা চলে না।
 
 
আজও রাত দু’টার ঘণ্টাধ্বণি শুনতে পেলো সে। উঠে বাথরুমে গেলো। এক গ্লাস জল খেয়ে ফের শুয়ে পড়লো এবং শুয়ে শুয়েই আড়াইটার ঘণ্টাধ্বনিও শুনতে পেলো সে। নিপু বুঝতে পারছে না, তার শ্রবণশক্তি বেড়ে গেলো কিনা। ঘণ্টাগুলো কোথায় বাজছে সে জানে না; আগে কোনোদিন শুনেছে বলেও মনে পড়ে না। যেদিন থেকে তাকে ইনসোমনিয়ায় পেয়েছে, সেদিন থেকেই কেবল ঘণ্টাগুলো শুনতে পাচ্ছে সে। সে ভাবলো, হয় তো আগেও বাজতো ঘণ্টাগুলো। কিন্তু যেহেতু রাত বারোটা পর্যন্ত শহুরে কোলাহল থাকে এবং সে বারোটার আগেই ঘুমিয়ে যেতো, তাই টের পেতো না ঘণ্টাগুলো। সে উঠে আবার জল পান করলো এবং ফের শুয়ে পড়লো।
 
প্রবন্ধ পড়লে ঘুম আসতে পারে ভেবে বেডরুমের টেবিল ল্যাম্পটা মাথার কাছে এনে আহমদ শরীফ-এর ‘বাঙালি ও বাঙলা সাহিত্য’ বইটা টেনে নিলো। না, বইয়েও মন দিতে পারছে না সে। যে-ঘুমের আশায় সে বইটি পড়তে শুরু করেছিলো, তাও আসছে না। তিনটার ঘণ্টা বাজলো। চারটার ঘণ্টা বাজলো। সাড়ে চারটার দিকে চারদিকে একযোগে আযান শুরু হলো। নিপু বুঝতে পারলো, আজ আর তার ঘুম হবে না। সে উঠে বাথরুমে গেলো। স্নান করলো দীর্ঘক্ষণ। তারপর এক কাপ চা বানালো। চা’টা খেয়ে শুয়ে পড়লো ফের।
 
২.
মামুন বিয়ের কথা তুলতেই নিপুর ভিতরে কেমন এক আতংক ভর করেছিলো। সে আতঙ্ক থেকে আসে দুঃশ্চিন্তা। তবে নির্ঘুমতার শুরুটা হয়েছিলো একটা দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে। চারদিন আগে ভোরবেলায় ঠিক ঘুম ভাঙার আগে স্বপ্নটা দেখেছিলো সে।
 
নিপু বাসরঘরে সেজেগুজে বসা। সেখানে মামুনের প্রবেশ হতেই চমকে যায় সে। শেরওয়ানীতে মামুনকে খুব সুন্দর লাগছে, যেন অচেনা কোনো পুরুষ যাকে নতুন করে আবিষ্কার করছে নিপু। এ্যারেঞ্জড্ ম্যারেজের কনের মতো মামুনের চোখ, ঠোঁট, নাক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে ইচ্ছে হয় নিপুর। আবার অদ্ভুত এক লজ্জাও এসে ভর করে তাকে। সে আগাতে পারছে না। মামুন কেনো তাকে ডাকছে না! কেনো বুকে টেনে নিয়ে আদর করছে না! নিপুর খুব রাগ হচ্ছে। মামুনের কথায় তার সম্বিত ফেরে, “কী দেখছো অমন করে?”
“তোমাকে।“ ইসৎ হেসে নিপু উত্তর দেয়।
“শুধুই কি দেখবে?”
নিপুর মাথায় পাগলামি ভর করে। সে হাসে আর বলে, “তাই যদি করি? ধরো, সারাজীবন তুমি আমি স্বামী-স্ত্রীর জৈবিক কার্যগুলোর কিছুই করবো না, কেবল দু’জন দু’জনকে দেখে যাবো। কেমন হবে বলো তো?”
“পাগল।“ বলেই মামুন তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে এবং নিজের ঠোঁট এগিয়ে দেয় নিপুর ঠোঁটের দিকে।
নিপুও এগোয়। ঠোঁটে ঠোঁট স্পর্শ করতেই নিপু বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতো চমকে উঠে। “থামো।“
নিপুর কণ্ঠ আর্ত চিৎকারের মতো লাগে। তার বলার ধরণে মামুন সরে যায়। বেশ হতাশার স্বরে বলে, “কী হলো তোমার?”
“আমাকে একটু স্থির হতে দাও, মামুন। প্লিজ।“
নিপুর চোখে-মুখে আতংকের স্পষ্ট ছাপ দেখে মামুন ওর বাম হাতটা টেনে নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলে, “কী হয়েছে তোমার নিপু? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেনো? তুমি ভয় পাচ্ছো?”
“না, মামুন। তুমি যে-ভয়ের কথা বলছো, তা নয়। তোমাকে আমার একটা কথা বলার আছে। শুনে তুমি কী বলবে, কী ভাববে, তোমার কী প্রতিক্রিয়া হবে, তাই ভেবে ভয় পাচ্ছি।“
“বলো না প্লিজ, সোনা!” অনুনয়ের সুরে বলে মামুন। “তোমার যে-কোনো কিছুই আমাকে বলতে পারো। তোমার অতীত, ভবিষ্যৎ, বর্তমানে যা কিছুই ঘটুক না কেনো, আমি তোমাকে চাই। কেবল তোমাকেই চাই। তুমি সবকিছুই বলতে পারো, সোনা।”
“মামুন, আমি আশা করবো, তুমি তোমার ভিতরের সত্যিকারের প্রতিক্রিয়াটাই আমাকে জানাবে। একটুও লুকোচুরি করবে না। প্লিজ।“
নিপুর বাহু জড়িয়ে কাছে টেনে নেয় মামুন। “তুমি এভাবে বলছো কেনো নিপু?”
নিপু ঠেলে সরিয়ে দেয় মামুনকে। তারপর বেশ গম্ভীর স্বরে বলে, “তোমাকে আমি একটা পুরোনো ক্ষত দেখাবো। এটা একান্তই শরীরের। তবে তোমাকে যেটা বলবো, সেটা এটা নয়।“ বলতে বলতেই নিপু তার বাম পায়ের শাড়িটা টেনে ওপরে তোলে। তার ধপধপে সাদা উরুতে একটা লম্বা কালো দাগ। মামুন আঁৎকে উঠে। সে ছুঁয়ে দেখতে চায় ক্ষতটা। তার হাতটা কাছে যেতেই পা সরিয়ে নেয় নিপু। শাড়িটা টেনে ঢেকে দেয় ক্ষতটা।
 
বাইরে সানাই বেজে উঠে জোরে। বিসমিল্লাহর সানাই। সাথে আরো কী সব বাদ্য বাজনা। নিপুর ভয় লাগতে শুরু করে। সে কেঁপে কেঁপে ওঠে শব্দ শুনে। সে বুঝতে পারছে না বিয়ের সানাই শুনে কাপছে কেনো সে। “এ কী সানাই, নাকি অন্য কিছু?” সে নিজেকে প্রশ্ন করে? “বাকি বাদ্যগুলো কী তবে?” না, এতো সানাই নয়! এতো যুদ্ধের দামামা! তবে কি কোথাও যুদ্ধ লেগেছে?
 
শব্দটা ক্রমশ বাড়ছে। জিঘাংসু মন নিয়ে কারা যেন উচ্চ চিৎকারে ছুটে আসছে তাদের দিকে। তবে কি এই বাসর রাতেই এবং মামুনের ভালোবাসার স্পর্শ পাওয়ার আগেই তাকে মেরে ফেলা হবে? মামুনকেও? “মামুন পালাও। ওরা আসছে। পালাও।” নিপু চিৎকার দেয়। জোরে আরো জোরে চীৎকার দেয় সে। কিন্তু তার গলা থেকে একটুও শব্দ বের হয় না। সে মামুনের হাত ধরে টানছে। তাকে নিয়ে দৌঁড়ে পালাতে চাচ্ছে, কিন্তু যতবার সে দৌড়ানোর চেষ্টা করছে, ততবারই পড়ে যাচ্ছে। বিছানা থেকে কয়েক ফুট দূরের দরজাটা পর্যন্তই পৌঁছাতে পারছে না তারা। ওদিকে শব্দটা আরো বাড়ছে, বাড়ছে এবং বাড়ছে। এবং তারা দরজায় পৌঁছে গিয়েছে। তাদের বিদীর্ণ চীৎকারে নিপুর কান ফেটে যাচ্ছে। তারা দরজায় লাথি মারছে। আর তখনই ঘুম ভেঙে যায় নিপুর। সে ধড়ফড়িয়ে বিছানায় বসে। তার পুরো শরীর ঘামে ভেজা। সে বুঝতে পারে শব্দটা আর কিছুই নয়, মোবাইলের এ্যালার্ম।
 
৩.
মাত্র এক ঘণ্টার মতো ঘুমিয়েছিলো নিপু। ফ্রেশ হতে গিয়ে বাথরুমের আয়নায় নিজেকে খুটে খুটে দেখলো নিপু। আরো একটি প্রায়-নির্ঘুম রাত কাটানোর ফলে চোখের পাশের কালিটা আরো বেড়েছে। সে একবার ভাবলো, অফিসের বসকে ফোন করে বলে যে, সে অসুস্থ, আজ অফিসে যেতে পারবে না। কিন্তু পরক্ষণেই সে তা বাতিল করে দেয়। বাসায় থাকলে সারাদিন আরো বেশি চিন্তায় কাটবে তার। তার চেয়ে বরং অফিসে যাওয়াই ভালো। ব্যাংকে চাকুরি করার এই এক সুবিধা। অফিসে ঢোকার পরে শরীর বা মন খারাপ জাতীয় কিছু থাকে না; তখন গ্রাহকদের সেবা দেয়ার ব্যস্ততাটাকেই সে উপভোগ করে। তাছাড়া অনেক গ্রাহক আছেন যারা ব্যাংকে এসে তাকেই খুঁজবেন। একদিন অফিসে না গেলে পরদিন তাকে অনেকের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
 
পৌনে আটটা বাজে। আজও মোবাইল এ্যালার্মে সাড়ে সাতটায় ঘুম ভেঙেছিলো তার। প্রতিদিন সকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা বানিয়ে খেয়ে তারপর সে স্নানে যায়। সবকিছু সারতে ন’টা বেজে যায়। তারপর বের হয়ে শেওড়াপাড়া থেকে বাস ধরে মিরপুর গোলচত্বরে নেমে ওভারব্রিজ পার হয়ে মিরপুর-১৪ এর অটোতে গিয়ে হাইটেক হাসপাতালের সামনে নেমে কয়েক মিনিট হাঁটতেই তার অফিস। তার বসও শেওড়াপাড়া থাকেন। বস একবার বলেছিলেন, নিপু যদি চায় তিনি তাকে তুলে নিতে পারেন। নিপু সরাসরি না বলতে পারে নি। অন্য একটা অজুহাত দেখিয়ে স্যরি বলেছে। বসের আচরণে সন্দেহ করার মতো কিছু পায় নি নিপু। সবসময়ই হাসি মুখে কথা বললেও বস হিসেবে নিজের দূরত্বটুকু খুব সতর্কতার সাথে বজায় রাখেন তিনি। সমস্যা হলো, বসের সাথে অফিসে আসলে কমপক্ষে ত্রিশ মিনিট আগে অফিসে এসে বসে থাকতে হয়। তখন অফিসে গার্ড আর বস ছাড়া কেউ থাকেন না; একা অফিসে বসে থাকতে তার ভালো লাগে না।
 
নিপু ঠিক করলো সে আজ বাসায় নাস্তা খাবে না, অফিসে গিয়ে গার্ডকে পাঠিয়ে নাস্তা আনিয়ে নিবে। এক কাপ চা বানিয়ে ব্যালকনিতে গেলো সে। ব্যালকনিতে একটা চেয়ার পাতা থাকে সবসময়। চা খেতে খেতে সে ভাবলো এর চেয়ে ভালো মামুনের ওপর পরীক্ষাটা করে নেয়া। একটা মেসেজে লিখে ফেললেই হলো। গত একটি বছরেরও বেশি সময় ধরে মামুনকে সে যে যতটুকু চিনেছে, তাতে ওর মেনে নেয়ারই কথা। তবুও সন্দেহ হয় তার। বাঙালি-মানসিকতা বলে কথা।
 
বিপরীতটাও ভাবে সে। প্রায় সাত বছরের ওপর বাইরে থাকে মামুন। ইউরোপের মুক্ত জগতে বাস করে বাঙালি পৌরুষসুলভ চিন্তায় নিশ্চয়ই পরিবর্তন হবার কথা। ভাবতে ভাবতেই মেসেঞ্জার ওপেন করে নিপু। মামুনকে কি সত্যিই লিখবে? কী লিখবে সে? না, এর জন্যে সময় দেয়া দরকার; এভাবে হুট করে লেখা যায় না। এখন মামুনের ওখানে রাত চারটা। কিছু লিখলেও বাংলাদেশ সময় এগারোটার আগে দেখবে না সে। তার চেয়ে বিকালে লেখাই ভালো। প্রতিদিনকার রুটিন অনুযায়ী কেবল ‘শুভ সকাল’ লিখে রেখে দিলো সে। তারপর কী ভেবে বসকে একটা মেসেজ দিলো- তাকে শেওড়াপাড়া ওভারব্রিজের নিচ থেকে তুলে নেয়া যাবে কিনা। বসের তৎক্ষনাৎ উত্তর এলো, “ইটস ওকে। ৮.৫৫ শার্প।”
 
হাতে এখনো যথেষ্ট সময়। অন্য সময়ে সালোয়ার-কামিজ, কখনো জিন্স-ফতুয়া পরলেও আজ সে একটা শাড়ি বের করলো। ডিসেম্বরে মামুন যখন বাংলাদেশে এসেছিলো, তখন মামুনের পছন্দে যে শাড়িটা কিনেছিলো, সেটা পরলো নিপু। তারপর আরো একটু অপেক্ষা করে ৮.৪৫ মিনিটে বেরিয়ে পড়লো।
 
৪.
সন্ধ্যা সাতটায় বাসায় ফিরলো নিপু। দুপুরে এক ক্লায়েন্ট অফিসের সবাইকে ভারি লাঞ্চ করিয়েছে। ঐ ক্লায়েন্ট পদ্মাসেতু সংশ্লিষ্ঠ বেশ বড় রকমের একটা কাজ পেয়েছে, সেই খুশিতে সবাইকে খাওয়াবে বলে আগেই বলে রেখেছিলো। রাতেও রান্না করবে না ভেবে ফিরতি পথে একটা স্যান্ডউইচ কিনে নিলো নিপু। বাসায় ফিরে শাড়িটা না পাল্টিয়েই এক কাপ কফি বানালো। তারপর কফিটা নিয়ে ল্যাপটপটা খুলে লিখতে বসলো মামুনকে।
 
“প্রিয় মামুন,
তোমাকে বলা হয় নি, গত ক’রাত আমার ঠিকমতো ঘুম হচ্ছে না। এর শুরুটা হয়েছিলো একটা স্বপ্ন দিয়ে। স্বপ্নটা ছিলো তোমার আমার বাসর রাতের। তারপর থেকে কেবল তোমাকেই ভাবছি।
 
না, আমি সে স্বপ্নটার কথা বলবো না এখন। স্বপ্নটা কেনো আমাকে ভাবাচ্ছে, সে গল্পই বলি। জুলাইয়ে তুমি পিএইচডি ডিগ্রী পেতে যাচ্ছো, আর তারপর তুমি ফিরলেই আমাদের বিয়ে। যেহেতু আমাদের দুই পরিবারই আমাদের সম্পর্কটা মেনে নিয়েছে, আমাদের স্বপ্নের সংসারের পথে আর কোনো বাঁধা নেই, এমনটাই মনে করেছিলাম এতোদিন। কিন্তু ক’দিন ধরে মনে হচ্ছে, আমাদের স্বপ্নের পথে সবচেয়ে বড় বাঁধা আমি নিজে। আমার জীবনের একটা গল্প তোমাকে শুনাতেই হবে। গল্পটা না শুনালে আমি স্বস্তি পাবো না।
 
তুমি কী ভাবছো? নিশ্চয়ই মহীনের সাথে আমার সম্পর্ক বিষয়ক কিছু ভেবে বসেছো? না। ওর সাথে ছাত্র জীবনের বেশ কয়েকটা বছর বেশ সুন্দর কাটিয়েছি। তার অনেক গল্পই তোমাকে বলেছি। আর যা আছে, তাতে বলার মতো তেমন কিছুই নেই। এটা একেবারেই ভিন্ন গল্প।
 
তোমাকে আরো কিছু বলে নেই। এই গল্পটি পড়ে যদি তোমার ভিতরে এমন কোনো প্রতিক্রিয়া হয় যে, তুমি এখন বা জীবনের যে-কোনো দিন আমাকে কোনো প্রশ্ন করতে পারো, তবে মেসেজ সিন করার এক ঘণ্টার মধ্যেও কোনো উত্তর দিবে না; কোনো কল করবে না; এমনকি কোনো যোগাযোগও করবে না। এক ঘণ্টার মধ্যে তোমার কোনো উত্তর না পেলে তোমার জীবন থেকে সরে যাবো আমি। তোমাকে আমি সব ধরনের যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ব্লক করে দিবো, এবং কোনোদিন আমার সাথে কোনভাবে যোগাযোগ করতে চাইলেও আমি তাতে সাড়া দেবো না।
 
মামুন, আমার বয়স যখন দশ বছর, মানে আমি যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি, তখন দেখতে বেশ বড়সড় ছিলাম। ঐ বয়সেই আমি বেশ লম্বা-চওড়া হয়ে গিয়েছিলাম। সে-সময়ের ছবি দেখলে তুমি অবাক হয়ে যাবে। আমি গ্রামে বড় হয়েছি। আমাদের বাড়িটাতে আমার বাবা এবং বড় চাচা থাকতেন। আমাদের মূল পুরোনো বাড়িটাতে থাকতেন আমাদের আর সকল চাচারা। দুই বাড়ির মাঝখানে লম্বা একটা বাগান পেরিয়ে এবং একটা ছোট নালার মতো খালের ওপরে বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে আসতে হতো। আমরা রাত-বিরেতে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যাওয়া-আসা করতাম। এর মধ্যে কোনো বিপদ হতে পারে এমন ভাবনা আমাদের কল্পনায়ও ছিলো না।
 
একদিন সন্ধ্যার পরে আমি বুড়ো দাদাকে মাছ-ভাজা দিয়ে ফিরছিলাম। আমাদের বা বড় চাচার ঘরে ভালো কিছু রান্না হলে সেটা দাদার জন্য নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বটা আমার ওপরই পড়তো। দাদাজান আমাকে খুব ভালোবাসতেন বলে এই দায়িত্বটা আমি খুব উপভোগ করতাম। আসলে দায়িত্ব-টায়িত্ব বোঝার বয়স তো তখন হয় নি, দাদার জন্য খাবার নিয়ে গেলে দাদা আমাকে তার পাশে বসিয়ে আদর করতেন এবং ভাত মেখে খাইয়ে দিতেন, ওটা আমি খুব উপভোগ করতাম। আমার কাছে তা অমৃত লাগতো। সেদিন আমার মা-ই আমাকে পাঠিয়েছিলেন। বাগান-পথটা ঘুটঘুটে অন্ধকার ছিলো। মাঝপথে আমাকে দুইটা লোক আমার মুখ চেপে বাগানের মধ্যে নিয়ে গিয়েছিলো। দুটো দৈত্য দ্বারা আমি ধর্ষিত হয়েছিলাম সেদিন। আমি আজও জানি না তারা কারা ছিলো। আমার উরুতে বিরাট একটা কাটা দাগ আছে, যেটা সম্ভবত কোনো গাছের ডালের সাথে ঘষা লেগে হয়েছে। যদি তোমার সাথে কোনোদিন আমার বিয়ে হয়, তবে তোমাকে দেখাবো।
 
আমি প্রায়শই দাদা বাড়িতে কামরুল চাচার ঘরে টিভি দেখতাম। বাড়িতে টিভি ছিলো না বলে বাবা-মাও কিছু বলতেন না। সেদিনও বাড়িতে বাবা-মা ভেবেছিলেন, আমি বুঝি দাদা বাড়িতে টিভি দেখছি। আমি কতক্ষণে জ্ঞান ফিরে পেয়েছিলাম, জানি না। তবে খুব বেশি রাত হয় নি তখনও। আমি একাই বাড়িতে এসেছিলাম। আমার সারা গায়ে রক্ত। ওরা আমার পোশাকগুলো কোথায় ফেলেছিলো পাই নি। একটা সুপারির খোল কোমড়ে পেঁচিয়ে সামনের ঘর থেকে না উঠে, পিছন থেকে রান্নাঘরের দরজা দিয়ে ঘরে উঠেছিলাম। মা আমাকে দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। মা সেই যে অসুস্থ হলেন, এরপর প্রায় চার বছর বেঁচে ছিলেন, তবে কোনোদিন স্বাভাবিক হন নি আর। নিজেকে নিজে ক্ষমা করতে পারেন নি হয় তো। শেষের দিকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হতো। একদিন কিভাবে যেন শিকল ছিড়ে সেই বাগানে গিয়ে একটা কড়ই গাছের সাথে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
 
একমাত্র মহীনকেই এই গল্পটা বলেছিলাম। মহীন খুব স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছিলো। আমাকে আরো বেশি কেয়ার করতো এরপর থেকে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষদিকে এসে ক্রমেই আমাদের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। একদিন কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে এই প্রসঙ্গ তুলতেই আমি ওর সাথে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছিলাম। বিয়ের পরে তোমাকে ডিভোর্স দিতে হবে, সেটা আমি চাই না। অন্তত এই কারণে ডিভোর্স হোক, সেটা আমি চাই না। ভালো থেকো।
নিপু।“
 
মেসেজ পাঠিয়েই নিপু ল্যাপটপ ও মোবাইলটা বন্ধ করে দিলো। বেশ হালকা লাগছে নিজেকে। ফের স্নান করলো সে। তারপর স্যান্ডউইচটা খেয়ে বিছানায় শুতেই ঘুম।
 
৫.
ভোর পাঁচটার দিকে একবার ঘুম ভাঙতেই মোবাইলটা অন করে মেসেঞ্জারটা চেক করলো নিপু। না, সেখানে মামুনের কোনো উত্তর নেই। মেসেজ দেখার সময় দেখাচ্ছে ১১.৪৭ পি.এম। নিপু হিসেব করে দেখলো পাঁচ ঘণ্টারও বেশি পূর্বে মেসেজ পড়েছে মামুন। রাগে তার হাত কাঁপতে থাকে। কাঁপা-হাতে সে দ্রুত আরেকটি মেসেজ টাইপ করে, “মামুন, ইউ হ্যাভ ফেইলড্। আমার জীবনে এমন কিছুই ঘটে নি। তোমরা বাঙালি পুরুষরা ইউরোপে গিয়েও শুদ্ধ চিন্তা করতে শেখো না। তোমরা স্বর্গে গেলেও শুদ্ধ হবে না। বিদায়।”
 

  • ১০১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সন্ন্যাসী রতন

সন্যাসী রতন নামে পরিচিত বাংলাদেশী ব্লগার আইকর্নের একজন অতিথি লেখক হিসেবে নরওয়েতে আছেন।

ফেসবুকে আমরা