বন্ধ ঘরের অন্ধকার ভেদ করে রিতিকার উঠে আসা

শুক্রবার, মে ১১, ২০১৮ ১২:৫৪ PM | বিভাগ : ওলো সই


আঠারো বছর বয়সে মেয়েটা প্রথমবার ধর্ষিতা হয় তার বিয়ের রাতে। সামাজিক বিয়ে। পরিবারে অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণে ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের মেধাবী ছাত্রী রিতিকাকে সাততাড়াতাড়ি বিয়ের পিড়িতে বসতে হয়েছিলো। যৌনসংগমের জন্য মানসিক ভাবে একেবারেই প্রস্তুত না থাকা রিতিকার কাছে প্রথম রাতেই তার স্বামী যৌন সম্পর্ক দাবি করে এবং জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক করে।ছয় বছরের বিবাহিত জীবনে রিতিকার স্বামী রোজ রাতে মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফিরে তাকে মারধর করতো, জোর করে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতো। যখন রিতিকা প্রথমবার সন্তান সম্ভবা, তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকায়, ডাক্তার কিছুসময় যৌনসংগম বন্ধ রাখার পরামর্শ দেয়। সেই সময়তেও তার স্বামী তাকে শারীরিক নির্যাতন করে ও সঙ্গমে বাধ্য করতো। ফলে শারীরিক অবস্থার প্রচণ্ড অবনতি হতে থাকে ও মৃত সন্তানের জন্ম হয়। আবারও দু’মাস পরে রিতিকা সন্তান সম্ভব্য হয়।

বিয়ের তিনবছরের মাথায় রিতিকা চাকরি পায়। চাকরির পুরো বেতনটাই তার স্বামী নিজে হাতে নিতো। একবার রিতিকা তাদের বাচ্চার স্কুল-ফি চাওয়াই, তার স্বামী তাকে মেরে নাক ফাটিয়ে দিয়ে আবারও ধর্ষণ করে। ডাক্তারের কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়ে সে পুলিশের কাছে গেলে, পুলিশ রিতিকার প্রতি ভদ্র ও বিনয়ী হয়ে, তাকে এক কাপ চা খাইয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেয় ও সবকিছু মিটমাট করে নিতে বলে। রিতিকা বাড়ি ফিরে মিটমাট করে নিলে তার স্বামী সেটাকে বড় কোনো যুদ্ধজয় হিসেবে ভেবে নিয়ে আবারও যৌন সম্পর্ক করে। তার স্বামী এরপর আরও উদ্ধত হয়ে ওঠে। আবারও মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফিরে রিতিকাকে মারধর করে। এরপর শারীরিক নির্যাতন ও মারধরের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।

রিতিকা তার বাবা, মাকে এইসব অত্যাচারের কথা খুলে বললে, তারা জবাব দেন, “কি লজ্জা! বাইরে জানাজানি হলে লোকে কি বলবে!” তারা রিতিকাকে চুপ থাকতে বলে।

রিতিকা জীবনে একটা ঝুঁকি নেয়। বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা করে ও এই বিবাহিত সম্পর্ক থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। এখন রিতিকা নিজের জীবন নিজের মতো করে বাঁচে,  সে এখন একজন স্কুল শিক্ষিকা ও পিএইচ.ডি পড়াশোনা করছে। বাচ্চাটাকেও রিতিকা নিজের কাছেই রাখতে পেরেছে। মা ও সন্তান নিজেদের মতো করে বেশ সুখে, শান্তিতে জীবন কাটাচ্ছে।

রিতিকা পেরেছিলো সেদিন পুরুষতান্ত্রিক অমানুষিক অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে। রিতিকা দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছিলো সমাজের সামনে। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীকে কখনোই মানুষ ভাবে না, বস্তুর মতো ব্যবহার করতে চায়। হাতের পুতুল করে বা নিজের সম্পত্তি করে রাখতে চায়। বস্তু সম্পত্তির যেমন কোনো স্বাধীনতা থাকতে নেই, বস্তু সম্পত্তি যেমন শুধু চাহিদা মেটানোর একটা বস্তু, তেমনই নারীও এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের শুধু চাহিদা মেটানোর বস্তু। নিজের মানুষ অস্তিত্বের জানান দিতে গেলে প্রতিটা নারীকেই আজ দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। রিতিকা নিজের লড়াইতে কখনো হার মানতে পারে নি, মাথা নত করতে পারেনি পুরুষতান্ত্রিক স্বামীর কাছে। স্বামীর পা ধরে ভিক্ষার বাঁচার জীবন সে চায় নি। সে চেয়েছিলো নিজের অস্তিত্ব বুঝিয়ে দিতে, সে প্রতিবাদ করে উঠেছিলো। চরম অত্যাচারের বিরুদ্ধে গিয়ে সে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়াতে চেয়েছিলো। রিতিকা জিতেছে। সমাজের সামনে উদাহরণ তুলে ধরেছে যে নারী কখনোই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ব্যবহারের কোনো অস্তিত্বহীন বস্তু নয়, নারীও মানুষ।

(লেখকের জন্মদিনে তাঁর পক্ষ হতে সকলের প্রতি বার্তাঃ "শুভেচ্ছা, আমি সৌম্যজিৎ দত্ত, নারী ডট নিউজের সকল লেখক এবং পাঠকদের আমার ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। আজ ২৭শে বৈশাখ (১১ই মে) আমার জন্মদিবস। আপনাদের সকলের ভালোবাসা প্রার্থনা করছি। ভালো থাকবেন, ভালোবাসায় থাকবেন।")  


  • ১১১৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সৌম্যজিৎ দত্ত

লেখক, ব্লগার, আইএসআই তে লেকচারার এবং গবেষণারত ছাত্র।

ফেসবুকে আমরা