আমি কেনো একজনকে অন্ধবিশ্বাস করবো!

বুধবার, মে ১৬, ২০১৮ ২:১৯ PM | বিভাগ : ওলো সই


আমি যখন দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ি তখন পাঠ্য বইয়ে একটা গল্প পড়েছিলাম, গল্পটার সবটা মনে নেই তবে মূল অংশ মনে আছে, গল্পটা হলো _

এক ক্যাথলিক পরিবার জাহাজে করে কোথাও বেড়াতে যাচ্ছিলো, পরিবার বলতে বাবা,মা, বোন,ভাই। তারা সাগরের মাঝামাঝি এসে দেখতে পায় আরেকটি জাহাজ সাগরের মাঝে থেমে আছে, পাশাপাশি আসার পর জাহাজ থামিয়ে জিগ্যেস করা হলো কেনো এখানে জাহাজ থেমে আছে! ভেতর থেকে একজন মানুষ বের হয়ে এসে বললো এই জাহাজে কিছু কুষ্ঠ রুগী আছে আর তারা মৃত্যুর কাছাকাছি, তাঁদের পরিবার এই রোগের জন্য তাদের এই সাগরে রেখে গেছে, আর জীবনের শেষ কয়েকটা দিন তাদের একটু সেবার দরকার একটু ভালোবাসার দরকার! যদি আপনাদের জাহাজে এমন কেউ থেকে থাকেন যে এই মৃত্যুর মুখের মানুষদের সেবা করতে চায় তো খুব ভালো হয়! একে একে জাহাজের সব আরোহীদের প্রশ্ন করা হয় তাদের কেউ রাজি হয় কিনা! কেউ বলে আমার পরিবার আছে আমি গেলে আমার পরিবার কষ্ট পাবে, কেউ বলে আমার স্ত্রী সন্তান আছে তারা কষ্ট পাবে, এমন করে করে সবাই মানা করে যে তারা যেতে পারবে না কারণ তাদের সবার পরিবার আছে! সব শেষে ওই ক্যাথলিক পরিবারের মেয়েটা এগিয়ে এসে বলে আমি যাবো! আমি যাবো সেসব মৃত্যু পথযাত্রীদের সেবা করতে! কারণ আমার বিয়ে হয় নি আমার কোনো পিছুটান নেই, আমি ওদের সেবার জন্য জীবন উৎসর্গ করে দিলাম! অতঃপর মেয়েটা জাহাজ থেকে কুষ্ঠ রোগীদের জাহাজে চলে যায় তাদের সেবা করতে।

পরবর্তী কালে সেই মেয়েটাই হয় "মাদার তেরেসা"।

হ্যাঁ! আমি মাদার তেরেসার কথায় বলছি, এই গল্পটা পড়ার পর থেকেই আমি মাদার তেরেসাকে আমার আইডল বানিয়ে ফেলি, সারাজীবন বিয়ে না করে অসুস্থদের সেবা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম শৈশবেই।

জানি না গল্পটা পড়ার কারণেই কিনা অন্য কারণে আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ কোনো মানুষের আর্তনাদ সহ্য করতে পারি না, অসুস্থদের সেবা করতে আমি শান্তি পাই।

পরবর্তীকালে আমার আইডল আরো বেড়ে যায়, আমার বুবু যার কাছে শিখেছি কিভাবে আবেগকে দমন করতে হয়, ম্যাচিউরিটি আমি বুবুর কাছ থেকেই শিখেছি, তারপর প্রীতিলতা যার ইতিহাস পড়ে আমি শিখেছি দেশের জন্য নিজের স্বাধীনতার জন্য কিভাবে হাসি মুখে আত্মত্যাগ করতে হয়, আরো শিখেছি তেভাগা আন্দোলনের ইতিহাস পড়ে ইলা মিত্রর জীবনী পড়ে শিখেছি কিভাবে নেত্রী হতে হয়। নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন আমি ছোটবেলা থেকেই, তবে সমাজে নারীর অবস্থান কোথায় তা আমি জানতাম না, সব বিষয়েই আমার তর্ক হতো ভাইদের সাথে বন্ধুদের সাথে, ভাইয়ের সাথে তর্ক হতো আমি কেনো তার অনুমতি নিয়ে কাজ করি না, তাকে পাত্তা দেই না এসব নিয়ে, অথচ আমার ভাই কোনোদিন আমাকে মানুষ মনে করেছে কিনা এতে আমার সন্দেহ আছে! এতো কিছুর পরও আমি জানতাম না সমাজের নারী মুক্তির পথ কি! জানতাম না নারীর আসল ফ্রিডম কিভাবে হবে! অফিসে জানালা দিয়ে বাইরের আযানের শব্দ এলে ছেলে কলিগ যখন আমাকে বলে মাথায় কাপড় দেন! তখন রীতিমত আমি অবাক হতাম কেনো মাথায় কাপড় দিতে হবে! আমাকে কলিগ উত্তরে বলেছিলো আপনি কি তসলিমা নাসরিন!

সেদিনই প্রথম আমার এই নামটা শুনা হয়, আমি অনেকের কাছে জিগ্যেস করে জানতে পারি সে একজন ডাক্তার আবার লেখিকা, এরপর অনেক জায়গায় অনেকেই আমাকে তসলিমা নাসরিন নামেই ডাকে, আমার চালচলনের সাথে নাকি অনেক মিল, আমি আগ্রহ বোধ করি তার সম্পর্কে জানার, এবং জেনেছি, তার আত্মজীবনী পড়েছি, তার প্রায় ২০ টা বই পড়েছি, তার লেখার সাথে পরিচিত হওয়ার পর থেকেই আমি জেনেছি সমাজে আসলে আমার অবস্থান কোথায়! প্রতিটা জায়গায় আমরা প্রতিনিয়ত অপমান হচ্ছি, এবং সব কিছু আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে! আমার জীবনটা খুব জটিল মনে হতো কিন্তু তসলিমা নাসরিনের লেখার সাথে পরিচিত হওয়ার পর থেকে জীবনকে আমি সহজ করেই দেখছি, আরো সুন্দর চোখে, তাই তসলিমা নাসরিন ও আমার আদর্শ।

মুল কথায় আসি! আদর্শ মানে হচ্ছে তাঁকে অনুসরণ করা, কিন্তু অনুকরণ করা নয়, কারণ তারাও কিন্তু আমার মতোই রক্ত মাংসের মানুষ, তারা কোনো যান্ত্রিক রোবট নয় যে তাদের কোনো ভুল হবে না, তাদেরও ইমোশন আছে রাগ আছে। আমার বিবেক বুদ্ধি আছে আমি সেটা কাজে লাগাবো আমি কেনো একজনকে অন্ধবিশ্বাস করবো! তাকে আদর্শ মানি বলেই তার সব কাজ আমার পছন্দ হবে এটা জরুরী নয়। ১৪০০ বছর আগে একজনকে অন্ধবিশ্বাস করে তার সব অলৌকিক কথাকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে যে ভুল আমার পুর্বপুরুষরা করেছে সেই একি রকম কোনো ভুল তো আমি করবো না! আপনি যতই আমার আদর্শ হোন না কেনো আপনার কোনো কথা যদি অযৌক্তিক মনে হয় আমি নিশ্চয় দ্বিমত পোষন করবো।


  • ২৮৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সৈয়দা সুমাইয়া ইরা

চাকুরীজিবি,নারীবাদি

ফেসবুকে আমরা