আদিমতম তবু অস্বীকৃত পেশা!

বৃহস্পতিবার, মে ৩, ২০১৮ ৮:৪৫ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


সৃষ্টির শুরু থেকেই নারীদেহ নিয়ে ব্যবসায় চলে আসছে, তাই একে বলাই হয় আদিম পেশা। এক শ্রেণির পুরুষের চোখে নারী মাত্রই ভোগের বস্তু, লালসার সামগ্রী। একই মাটিতে তৈরি নারী তাই সেকেন্ড সেক্স আর পুরুষ নিজেকে ভাবে একমেবাদ্বিতীয়ম! তাই নারী শরীরে জন্ম নিয়ে নারীকেই বানায় দাসী।

সনাতন ধর্মে দুর্গাদেবীর পুজায় তাঁর মুর্তি গড়তে বেশ্যাবাড়ির মাটি লাগে। মার্কন্ডেয় পুরাণ মতে দেবীর প্রতীমা গড়তে যে নবকন্যার দ্বারের মৃত্তিকা লাগে, গণিকালয় তার একটি। সূর্যপুরাণ মতে যে ব্যক্তি সূর্যদেবের নামে গুটিকয় বেশ্যা উৎসর্গ করবে সে তাঁর সংগে অক্ষয়লোকে বিরাজ করবে।

এতো কথার পরেও বেশ্যাবৃত্তি সমাজের চোখে তথা ধর্মের চোখে পাপই। সমাজে বাস করেও পতিতা নামক নারী সমাজচ্যুত। আমরা জানি যে কোনো মেয়ে সাধ করে এই জঘন্য পেশায় আসে না। নেহাত দায়ে পড়ে আসে, আসে বিভিন্নরকমের ফাঁদে পড়ে। “পতিতা” পাওয়া যায় বলেই কি পুরুষরা “পতিত” হয়, নাকি পুরুষের “পতিত” হবার চাহিদা থেকে “পতিতা”র জোগান দেয়া হয়? স্বাভাবিক যেকোনো মানুষই দ্বিতীয় কারণের সাথে একমত হবেন। জ্বী হ্যাঁ, আমাদের দেশসহ বেশীরভাগ দেশেই “পতিত” পুরুষদের চাহিদা মেটানোর জন্যই “পতিতা”র আমদানী বা জোগান দেয়া হয়। এর জন্য দালাল হয় “পতিতা”র। বিভিন্ন অসহায় নারীদের মিথ্যা লোভ দেখিয়ে, শহরে বা বিদেশে নানারকমের চাকরীর প্রলোভন দেখিয়ে অভাবী নারীদের পাচার করা হয়।

বর্তমান বিশ্বে মনে হয় অস্ত্রব্যবসার পরেই শিশু ও নারীব্যবসা সবচেয়ে জমজমাট ব্যবসা। আরবদেশে পাচার হচ্ছে, বিক্রি হচ্ছে কত শত নারী পরিসংখ্যান মেলে কি? সকল ধর্মমতে দেহব্যবসা পাপ, এতোটাই পাপ যে কোনো পতিতা মারা গেলে সে ধর্মমতে দাফন কাফনের হকদার হয় না। একটা সময়ে এদের কপালে মাটিও জুটতো না। কোনমতে বস্তাবন্দী করে জলে ভাসানই ছিলো এদের নসিবে।

হিন্দু ধর্মমতে এরা অগ্নিসৎকার পায় না বা দাহ করা হয় না। ধর্মের কোনো বিধিই মানা হয় না। আমরা যতোই বলি পাপকে ঘৃনা করো পাপীকে নয়, তবুও পতিতাদের বেলায় আমরা অন্ধ হয়ে যাই। তাই তাদের দেহসৎকারে, স্রেফ মাটি খুঁড়ে পুতে ফেলা হয় লাশ। বর্তমান সময়ে কিছু উন্নয়ন সংস্হা পতিতা পল্লিতে তাদের স্বাস্হ্য সেবা, পরিচ্ছন্নতা, স্যানিটেশন, এইডস প্রতিরোধী প্রজেক্ট চালান। কোনো কোনো সংস্হা পতিতা পল্লিতে জন্ম নেয়া শিশুদের শিক্ষার বিষয়টা দেখেন। কিন্তু এতো কিছুর পরেও বাংলাদেশে যৌনকর্মীরা স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়েই জীবন কাটান। প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সীমানা থাকায় ও অবাধ অনুপ্রবেশকারীদদের কারণে বাংলাদেশে এইডসসহ বিবিধ যৌনরোগ বাড়ছেই। আর এসব রোগের প্রধানতম শিকার দেহব্যবসায় লিপ্ত গণিকারা। যৌনরোগ ছাড়াও আর নানান রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় বিনাচিকিৎসায় মারা যায় এরা। কারণ স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস।

আমার জানামতে দেশের কোনো কবরস্থান বা শ্মশান কমিটি তাদের নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো যৌনকর্মী কে এসব স্থানে দাফন করতে দেয় না। উন্নয়ন কর্মীরা তাদের আন্তরিক চেষ্টায় হয়তো মৃতদেহ সৎকার করবার জায়গা পান সেই পল্লীতেই। আমি জানি না ধর্মে এদের জন্য কী বিধান? সত্যই কি এসব হতভাগিনী মৃত্যুর পরে সাড়ে তিনহাত জায়গা না পাওয়াটাই নিয়ম? এরা কি নিজের নিজের ধর্ম মতে দাহ বা অগ্নিসৎকার কি সমাধি পাবে না? ধর্ম যাই বলুক, সমাজ এদের সুবিধা নেয়। এরা না থাকলে সেইসব নরপিশাচ এর লালসার শিকার হতে হতো ঘরের মা বোনদের। এরা নীলকন্ঠের মতোই সমাজের বিষ নিজেরা পান করে। তবু সমাজে পতিতাদের ব্রাত্য করা হয়, দেয়া হয় না শ্রমিকের মর্যাদাও।

বিশ্বের বহু দেশে পতিতাবৃত্তি স্বীকৃত পেশা, তারা দস্তুর মতো ট্যাক্স দেয় সরকারকে। পায় তাদের ন্যায্য মজুরী, মর্যাদা। আমাদের দেশেও বহু পতিতালয় আছে সেখানে কয়জন নারী স্বেচ্ছায় আসেন সেটা গবেষণার বিষয়। সরকার নানান সময়ে পতিতালয় উচ্ছেদ করে বটে কিন্তু নির্মূল করা আদৌ কি সম্ভব। তাই উচিত হতো এমন অবস্থা সৃষ্টির যেন কাউকে জোর করে, বিক্রি করে দেহব্যবসা করতে না আনা হয়। যে চায় সে স্বেচ্ছায় আসবে নচেৎ নয়।


  • ৩৯৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

যূথিকা জাকারিয়া

লেখক ও সংষ্কৃতি কর্মী

ফেসবুকে আমরা