পুরুষের সন্দেহবাতিকগ্রস্থতার শিকার যখন নারী: মিতু অথবা আমি

রবিবার, ফেব্রুয়ারী ৩, ২০১৯ ১১:১৭ PM | বিভাগ : আলোচিত


খুব ভালো লাগছে যে বাংলাদেশের মেয়েরা কিছুটা হলেও মিতু-আকাশ প্রশ্নে একটা অবস্থানে দাঁড়িয়েছে বা দাঁড়াচ্ছে। হ্যাঁ, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ধর্ষণ বা ধর্ষণ প্রচেষ্টায় সফল না হয়ে হত্যা করলে আপনারা টুঁ-শব্দও করেন না। অথচ, একজন মিতুর পরকীয়া নিয়ে তার গোটা পরিবারকে ভয়ানক অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা হচ্ছে।

আকাশের অভিযোগ অনুযায়ী মিতুর পরকীয়ার ঘটনাগুলো সত্য হলে সেটাকেও আমরা কোনোভাবেই সঠিক বলে মনে করি না। তাই বলে একটি মেয়েকে এরেস্ট করার সময় তার প্রকৃতির ডাক এলে সেই ডাকে সাড়া দিতে দেয়া হবে না এবং তাকে পুলিশের সামনে মূত্র ত্যাগ করে ফেলতে হবে...এ তো’ ভয়ানক মাত্রার অত্যাচার এবং মাত্র ক’দিন আগেই মেয়েটিকে আকাশ, আকাশের মা ও ভাই মিলে প্রহার করে, প্রহারের ভিডিও ছেড়ে দিয়ে ভোররাতে তাকে তার বাবার হাতে তুলে দিয়ে পরে আকাশ এই কান্ড করে? আত্মহত্যা করে? আকাশের ব্যক্তিত্বে আগা-গোড়া নানামাত্রিক সমস্যা আছে।

আর এই যে গুজরাটের কোন্ উত্তম প্যাটেলকে জড়িয়ে এত কথা বলা হচ্ছে, এটাও একারণে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না যে উত্তম প্যাটেলসহ প্রবাসে এই উপমহাদেশের নানা দেশের কিছু ছাত্র-ছাত্রী মিলে যে ছবিতে মিতু দাঁড়ানো...প্যাটেলের পাশে একটি ভারতীয় মেয়েই হয়তো বেশ রিভিলিং পোশাকে দাঁড়ানো (ডান দিকে)... প্যাটেলের বাঁ দিকে আর একটি মেয়ের পরে মিতু অতি সাধারণ, অতি শালীন একটি সালোয়ার-কামিজ পরে দাঁড়ানো। এখন আকাশ যদি হীনমন্যতাবোধ থেকে (কেনো মিতু বিদেশে পড়ছে যেখানে আকাশ হয়তো তখনো বিদেশে পড়ার সুযোগ পায় নি বা তার পাশে কে ঐ হাসি-খুশি উত্তম প্যাটেল) থেকে নানা কান্ড করে বসে? বলবেন ত’ মিতুর টেক্সট মেসেজের ঐ স্ক্রিনশট? কেউ কেউ মনে করছেন যে এই স্ক্রিনশট ও অন্য ছেলেদের সাথে ছবি আকাশের নিজেরই করা ফটোশপ হতে পারে।

এতটা অবশ্য বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। এসব করে আত্মহত্যায় আকাশের কি লাভ? একটা কারণ অবশ্য হতে পারে: আমাদের সংস্কৃতির তথাকথিত পুরুষতান্ত্রিক শিক্ষণে সঙ্গীনী/প্রেমিকা/স্ত্রীকে নিয়ে পুরুষের যদি অত্যধিক হীনমন্যতা থাকে -বউয়ের রূপ আছে তবে লেখা-পড়ায় লবডঙ্কা বা এক পয়সা আয় করতে পারে না ত’ পুরুষের চলে, বউয়ের গুণ আছে তবে দেখতে একদমই সুশ্রী নয়- সেটাও পুরুষ মেনে নেয়, বউ সুশ্রী আবার ভালো ছাত্রী এবং ভালো রোজগার করে, হাসি-খুশী ও সপ্রতিভ, সামাজিক মহলে জনপ্রিয়...খুব খুব কম ছেলে এটা হজম করতে পারে। পারেই না। অতএব -হে নারী, তোমার যোগ্যতাই তোমার অযোগ্যতা। শুরু হয় ছেলেটির পদে পদে সন্দেহ, পজেসিভনেস নামের সুগার কোটেড ইতর পুরুষালী আচরণের মাধ্যমে মেয়েটিকে মনো-দৈহিক সব ধরণের অত্যাচার। মনোবিকার বাড়তে বাড়তে রোগী বা পুরুষটি নিজেই স্ত্রীর ছবি অন্য ছেলেদের সাথে ফটোশপ বা টেক্সট মেসেজের স্ক্রিন শট বানালেও অবাক হবো না। সাইকিয়াট্রিস্টদের জিজ্ঞাসা করলেই জানা যাবে এমনটা সম্ভব কিনা?

মিতুর কথা থাক। ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতাই শেয়ার করি। ২০০৩-এর নভেম্বরে দেশের একটি বড় পত্রিকা অফিসে একাধিক কবি-লেখক বন্ধুর মারফত সদ্য বিদেশ প্রত্যাগত এক বাঙ্গালী লেখকের সাথে পরিচয় হয়। অল্প কিছু সময় কথার মাস দু/তিনের ভেতর আবার ঐ পত্রিকা অফিসেই সেই একই লেখকের সাথে আরো মিনিট দশেক কথা হয়- আর এক ফিচার পাতা সম্পাদকের টেবিলে বসে- তিনজন মিলে। দু’দিন মিলে খুবই অল্প সময় কথার পরিচয়টুকু ছাড়া সেই ভদ্রলোকের সাথে আমার কোনো পরিচয়ই ছিলো না। ২০০৪-এর এপ্রিলে সেই ভদ্রলোক আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ নিয়ে একটি উচ্ছসিত রিভিউ লেখার পর ঢাকা শহরের অন্তত: শ পাঁচেক নর ও নারী লেখক-পাঠক-সাহিত্য-সংস্কৃতিসেবীর কাছ থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গিলতে বা হজম করতে হয়েছে যে ঐ ভদ্রলোকের সাথে আমার ‘প্রেম,’ ‘ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ,’ ‘কতটা ঘনিষ্ঠ’ বা ‘বিয়ে করবো কিনা?’ এই সব অশ্লীলতা কানে তুলি নি কারণ মাত্রই একজনকে ভাল লেগেছিলো এবং দু’পক্ষ থেকেই তখনো অবধি ‘না বলা বাণী’র সেই ঘোরেই আচ্ছন্ন ছিলাম। সমাজে একটি ছেলেকে যেসব মাপকাঠিতে মাপা হয় মানে টাকা-কড়ি বা বড় ডিগ্রি সেসব কিছুই হয়তো সেই ছেলের ছিলো না। তবে ছেলেটির মননশীলতা আমাকে টেনেছিলো।

ওমা, এই যে এত ভাবুক-প্রগতিশীল-পড়–য়া ছেলেটিও যে আমার বই নিয়ে রিভিউ লেখার অপরাধে সেই তৃতীয় ব্যক্তির সাথে আমাকে জড়িয়ে অকথ্য সব সন্দেহ করছেন এবং দূরে সরে যাচ্ছেন সেটা আমি পরের দেড় বছরেও বুঝি নি। ওদিকে সেই বিদেশ প্রত্যাগত একটি লিটল ম্যাগ ছাপিয়ে সেখানে আমার লেখা চাইলেন। আমি সরল ভাবে লেখা দিলাম। কিছুদিন পর এক বড় পত্রিকা সেই বিদেশ প্রত্যাগত লেখকের ইন্টারভিউ করতে বললে তা-ও করলাম। এরপর ত’ মৌচাকে ঢিল। প্রেম আমি করেছি বা করছিই। বিয়ে করে ফেলেছি কিনা তাই নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। পনেরো বছর আগের কথা। বয়স অনেক কম। পাণিপ্রার্থী যুবক কিছু তাই আশপাশে ছিলো। সব পাশ থেকে সরে গেলো। আমি রাতারাতি ‘দুঃশ্চরিত্র’ মেয়ে হয়ে গেলাম। শুধুমাত্র আমার বই নিয়ে একজন খুব উচ্ছাসমূলক একটি রিভিউ লেখায়।

একটা পর্যায়ে তুলনামূলক অল্প বয়সের জেদে আমারও রোখ চাপলো। সহসা সেই ভদ্রলোকের প্রতি খানিকটা আগ্রহ তৈরি হলো। এটা হয়েছিলো এক বছর ধরে অসংখ্য মানুষের অশালীন টিপ্পনী শুনতে শুনতে একটি উটকো জেদ থেকে। সুতরাং দু/একটা ই-মেইলে আমি গীতবিতানের পূজা অধ্যায়ের গানের বাণী তাঁকে দিলাম- তিনি দু/একটি ইংরেজি কবিতার চরণ পাঠালেন। তবে করুণাময়ের অনন্ত কৃপায় আগের এক বছর তাঁর যে বিদেশী বান্ধবীর সাথে কিছু মতান্তর-মনান্তর হয়েছিলো, সেটা ততদিনে পূরিত হয়েছে। তাঁর বান্ধবী দেশে এসে সব অভিমান ঘুচিয়ে তাঁকে বিবাহ করে বিদেশে নিয়ে গেলেন। হ্যাঁ, আমরা একজন প্রতিশ্রুতিশীল লেখককে হয়তো হারিয়ে ফেলেছি তবে আমাদের সেই লেখক বন্ধু বিদেশে ব্যক্তি জীবনে সুখী আছেন বা ভাল আছেন এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওনা। তবে এই আদ্যন্ত অশ্লীল সমাজে যে রিভিউয়ার যুবকের সাথে আমার হাতও ধরা হয় নি, তাকে নিয়েই আজো সুশীলতম সাহিত্যিক সমাজের কেউ কেউ বহু দিন পর দেখা হলেও আমাকে অত্যন্ত অশালীন সব রসিকতা করেন। শুধুমাত্র আমার উপর একটি রিভিউ লেখা বা আমি তার একটি ইন্টারভিউ নেবার অপরাধে।

মানুষ হিসেবে আমি খুবই অকপট এবং যেখানে যেটুকু করেছি তা’ বলার সাহস রাখি। কারণ আসলে খুব গোপন করার মতো কিছু এত বয়সের জীবনেও করতে হয় নি। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো সেই অতি প্রগতিশীল-পড়–য়া যুবক গত দু’বছর ধরে নানা ফেক আইডি থেকে সেই রিভিউয়ারকে নিয়ে আমাকে জড়িয়ে অসংখ্য কটুক্তি, নোংরা সব সন্দেহ করেই চলেছেন। সেই অতি প্রগতিশীলেরও হালে অনেক সাহিত্য বা সংস্কৃতিসেবী বান্ধবী রয়েছেন। সেটা সাহিত্য বা সংস্কৃতি সেবা। আমি ঐ রিভিউয়ারের সাথে ‘নোংরামি’ করেছি।

তা’ এই তো’ আমাদের অতি বর্বর, অতি অসভ্য ও সামন্তবাদী সমাজ। এখানে মিতুকে পিটিয়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতেও দেয়া হবে না- সেটাই কি খুব স্বাভাবিক নয়? লাভের মধ্যে সমাজের সো-কলড অতি প্রগতিশীল বা অতি রেভল্যুশনারী কারো কারো মুখোশের আড়ালের বর্বর পুরুষটির চেহারা আমি চিনে ফেলেছি।


  • ৫৭৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অদিতি ফাল্গুনী গায়েন

লেখক ও কলামিস্ট

ফেসবুকে আমরা