বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে ভাঙতে হবে সকল ট্যাবু

রবিবার, মে ২০, ২০১৮ ৬:১০ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


ফেসবুকে শেয়ার করা আমার শ্রীমঙ্গল ট্যুরের গ্রুপ ছবিতে এতগুলো ছেলের মাঝে আমাকে একা একজন মেয়ে দেখে এক লোক একটা কমেন্ট করেছিলো। কমেন্টটা আমার কাছে বাজে লেগেছে। যযার্থ রিপ্লাই দেয়ার পর সে সরি বলে কমেন্টটা ডিলিট করে দিয়েছে। সে হয়তো মুখে বলেছে, কিন্তু মনে মনে কত শত বাজে চিন্তা যে কতজন করতে পারে তা আন্দাজ করতে আমাদের সমস্যা হয় না।

তাই এই লেখাটা লিখছি এসব কনজারভেটিভ চিন্তাধারীদের কিছুটা পরিবর্তনের আশায়।

বিডিসাইক্লিস্টসের ৭ম বছর উদযাপন উপলক্ষ্যে শ্রীমঙ্গল ট্রিপে আমি বিডিসির মূল গ্রুপের সাথে যেতে পারি নি আগে থেকে বুকিং (বাস+রিসোর্ট) না করার কারণে। পরিচিত বড় ভাই, বন্ধু, ছোট ভাইদের সাথে যোগাযোগ করে আমরা আলাদাভাবে গিয়েছি, আলাদাভাবে থেকেছি। আমার এই গ্রুপটার মধ্যে অনেকে ছিলো পূর্ব পরিচিত, কারো সাথে ওখানে গিয়ে পরিচয় হয়েছে, অনেকে ছিলো ফেসবুক বন্ধু যাদের সাথে প্রথমবারের মতো ওখানে দেখা হয়েছে। এদের মধ্যে দু-তিনজন ছিলো বন্ধুর মতো, একজন ছিলো বড় ভাইর মতো, আর সবগুলা ছোট ভাইর মতো। এই গ্রুপের মধ্যে আমি একাই ছিলাম মেয়ে। আমার ঘূর্ণাক্ষরেও মনে হয় নি আমি মেয়ে, ওরা ছেলে। পরিস্থিতি অনুযায়ী যখন যে ব্যবস্থা হয়েছে তখন সেভাবেই থেকেছি। কখনো মনে হয় নি আমাকে জড়তা নিয়ে থাকতে হবে। আমি সবসময় চেষ্টা করি এই ছেলে-মেয়ে আলাদা করে ভাবার দৃষ্টিভঙ্গিকে পাল্টে দিতে। আমি এসব ব্যাপারে সবসময় ইজি থাকি। সবাইকে আমার মতো সহজ করে ফেলার চেষ্টা করি এবং তাতে কাজও হয়।

আমরা তিন-চারটা দিন হাসি-ঠাট্টা, আনন্দ, সহযোগিতা,ভরসা, ভালোবাসা নিয়ে এত সুন্দরভাবে কাটিয়েছি যে সবাই চিরজীবনের মতো আপন হয়ে গেছি। সারাজীবন আমাদের এইসব স্মৃতি মনে থাকবে। আমরা এই সমাজের নারী-পুরুষ বৈষম্য নিয়েও তর্ক-বিতর্ক, আলাপ-আলোচনা করেছি।

সুকান্ত দার সাথে (যার কটেজে ছিলাম) আমার সম্পর্ক টম এ্যান্ড জেরীর মতো। খালি ঝগড়াঝাঁটি আর কে কাকে পঁচাতে পারে এমন। থাকার সমস্যা নিয়ে দাদা আমাকে ক্ষ্যাপানোর জন্য বলতেছিলো, এই একটা মেয়ে মানুষরে নিয়ে হইছে ঝামেলা। আমি বললাম, দাদা এইটা যদি পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা না হতো তাহলে কিন্তু আমি এখানে একা একটা মেয়ে থাকতাম না, আরো অনেক মেয়ে থাকতো। আর যদি এখানে আমরা সবাই মেয়ে আর একটা মাত্র ছেলে থাকতো তাহলেও কিন্তু থাকার ক্ষেত্রে সেইম ঝামেলাটাই হতো।বলাবাহুল্য, দাদা যথেষ্ট প্রগতিশীল চিন্তার একজন মানুষ, একজন সাইক্লিস্ট। আমার প্রতিবাদী লেখায় সবসময় আমাকে সাপোর্ট করে, উৎসাহ দেয়। আমাদের সখ্যতা গড়ে উঠেছে এ কারণেই। তিনি মজা করেই এসব বলছিলেন।ওখানে একটা বিষয়ে মেয়েদের গার্ডিয়ান প্রসঙ্গ চলে এসেছিলো। তখন এক বন্ধু বলেছিলো, 'সাইক্লিং, ট্যুর, আউটিং'-এ যত সমস্যা হইছে সব মেয়েঘটিত। আমি জবাব দিলাম, হ্যাঁ হতেই পারে, এরকম হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই জটিলতা, ঝামেলা আপনাদেরই সৃষ্টি। কারণ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের ক্ষেত্রেও এখানে তার গার্ডিয়ান প্রসঙ্গ চলে আসছে। অথচ এখানে ছোট একটা ছেলে আছে তার ক্ষেত্রে কিন্তু গার্ডিয়ান প্রসঙ্গ আসে নাই। সুতরাং ঝামেলা তো হবেই। বন্ধু বললো যুক্তি ঠিক আছে।

এমনকি আমার পিরিয়ড চলছিলো। আমার কাছে প্যাড ছিলো না। আমাদের কটেজ ছিলো শ্রীমঙ্গল শহর থেকে ৭-৮ কি.মি. দূরে গ্রামের ভিতরে। পাশের বাজারে প্যাড পেলাম না। ছোট ভাই রাকিবকে (ও রংপুর থেকে এসেছিলো, হামহাম থেকে ফেরার পথে আমাদের প্রথম কথা হয়, আসতে আসতে অনেক কথা হয়েছে, তখনই আপন হয়ে গেছি ) কাগজে লিখে দিয়ে নিঃসঙ্কোচে বললাম ভাই আমাকে বাজার থেকে প্যাড এনে দাও। ও দূরের বাজার থেকে এনে দিলো। ও যেন এতে আমাকে আরো একধাপ বেশি আপন ভেবে ফেললো।শেষেরদিন সাইক্লিং-এর সময় আমি অনেকটা দুর্বল ও নার্ভাস ছিলাম সব মিলিয়ে। ছোট ভাই ইমতিয়াজ কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলতেছিলো, আপু তুমি এমন বিগিনারদের মতো করতেছো কেনো, ঠিকমতো চালাও। সজল আর ফেরদৌস মাঝপথে থেমে গেছিলো। ওরা বলেছিলো আপু না পারলে রয়ে যান। আমার জিদ ছিলো যাবোই। আমি আর রাকিব সবার শেষে গন্তব্যে গিয়ে ইমতিয়াজকে বললাম, মেয়েদের দুর্বল বলে খোঁচা মারো, মেয়েদের যত সমস্যা, এত সমস্যা নিয়ে তোমরা সাইকেল চালাতেই পারতে না, আই এ্যাম অন মাই পিরিয়ড। এটা শোনার পর ও থতমত খেয়ে গেলো, ওর মুখের ভাষা পুরো চেইঞ্জ হয়ে গেলো। এরপর থেকে আমার প্রতি যে টেইক কেয়ারটা করলো (আমি ঠিকই টের পাচ্ছিলাম) তা কেবলই ভালোবাসার উদ্রেক ঘটায়। এরপর হুট করে হেলাল এসে বললো, আপু জানো তুমি কি করছো! গতকালের হামহাম ট্রেকিং শেষে আজকের এই বৃষ্টির মধ্যে তুমি প্রায় ৪০ কি.মি. সাইকেল চালাইছো! ও যে আমাকে ইন্সপায়ার্ড করার জন্য বলতেছিলো তা আমি ঠিকই বুঝেছিলাম। আরফান তো এমন আচরণ করতেছিলো যেন আমি ওর মায়ের পেটের বোন। ইমরু ভাই একজন কেয়ারিং মানুষ।

নিঃসন্দেহে আমার এই ভ্রমণসঙ্গীদের সবাই ছিলো অসাধারণ সহযোগিতাপূর্ণ মানসিকতার। আমি শুধু ভাবতেছিলাম সবাই এত ভালো কেনো! তারপরও এখানে একটা কথা বলতে চাই। এই যে সবাইকে নিজের চিন্তার বা মানসিকতার সাথে মোটিভেট করে ফেলা এটা করতে পারাটাই আসল ব্যাপার,এটা ম্যাজিকের মতো কাজ করে। যারা এটা পারে তারা কখনো কোথাও কোনো সমস্যায় পড়ে না বলে আমার বিশ্বাস।আমি এখানে মোটেও আমার কোনো বাহাদুরি প্রমাণ করার চেষ্টা করছি না। বাহাদুরির কিছু নাইও। কারণ আমার চেনাজানা অনেক মেয়েই তুখোড় সাইক্লিস্ট। ওরা ক্রস কান্ট্রি পর্যন্ত শেষ করে ফেলেছে অনেক আগেই। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ওরা মেডেলধারী। প্রচুর মেয়েরাই এখন সাইকেল চালায়। পাহাড়-পর্বতে ট্রেকিং করা মেয়েও আছে অনেক। কিন্তু সবাই তো আর সমাজের এসব সমস্যা নিয়ে লিখে না। আমি লিখি, পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখি তাই ওইসব কনজারভেটিভ চিন্তাধারীদের জবাব দিতে এবং যা মেয়েদের স্বাধীনতায় বাঁধার সৃষ্টি করে সমাজের সেইসব ট্যাবু ভাঙতে লিখছি। আমাকে এই কথাগুলোও জুড়ে দিতে হলো সেইসব নিন্দুকের মুখে ছাই দিতে যারা আমি কী এমন মহাভারত জয় করে ফেলেছি বলে হাসি-তামাশা করে আমাকে অপমান করার চেষ্টা করবে। অলরেডি দু-একজন করেছেও।

এত কথা বলার উদ্দেশ্য একটাই। সমাজকে শিক্ষা দেয়া যা আমি সবসময় করে থাকি। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে নারী-পুরুষের এ বৈষম্যমূলক সমাজের অনেক বিষয়ই চলে আসছে এবং তার সুন্দর সমাধানও আছে। আপনি যতই মনের মধ্যে ছেলে-মেয়ে খচখচানি নিয়ে থাকবেন জটিলতা, সমস্যা, ঝামেলা ততই বাড়বে। অথচ সহযোগিতা, বন্ধুত্ব, সততা, ভালোবাসার মিশেলে ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে আমরা কত সুন্দরর ভাবে পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারি। পরিশেষে আমার ভ্রমণসঙ্গীদের সকলের প্রতি অনেক অনেক ভালোবাসা।

#Be_easy #Be_normal #Be_friend #Be_human


  • ৬২৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

আফরিন শরীফ বিথী

,ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিস্ট

ফেসবুকে আমরা