আমরাও একদিন শিশু ছিলাম

মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১১, ২০১৮ ২:৩৭ PM | বিভাগ : আলোচিত


“আগে যদি জানতাম তাহলে আমার ছেলেকে এতো মার মারতাম না” একজন সন্তানহারা কারাবন্দী মায়ের অশ্রুসজল আকুতি। ঘটনাটি ইংল্যান্ডের একটি বাঙ্গালী পরিবারের। এই মায়ের ওপর আমার রাগ হয় না, তার জন্যে করুণা হয় কারণ তিনি জানতেন না যে, তার ১৬ বছরের ছেলের বয়স যতোই বাড়ুক না কেনো সে সব সময়ই ৮ বছরের শিশু। এমন কিছু ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী আমি নিজেই।

‘মানুষের কাহিনী’ শিরোনামের লেখাটিতে এ রকম একটি অটিষ্টিক ছেলের কাহিনী এবং জন্মের পর থেকে একটি শিশুর মানসিক বিকাশ কীভাবে ধাপে ধাপে ঘটে তা উল্লেখ করেছিলাম। সেই ছেলেটি এখন আমার পাশেই থাকে। তার বয়স পয়ত্রিশ বছর। তার কথাবার্তা, আচার ব্যবহার তার হাসি কান্না, চাওয়া পাওয়া ঠিক ৮/৯ বছরের শিশুর মতো। ছোট বেলা থেকে তার মা বাবা তাকে এতো অমানুষিক নির্যাতন করেছেন যে এখন সে তার মায়ের কাছে যেতে ভয় পায়। তার মা বাবার কথা কেউ শুনালেই অঝোরে কাঁদে আর বলে আমি কোনোদিন মায়ের কাছে যাবো না। অটিজম সম্মন্ধে যাদের কোনো ধারণা নেই তারা কল্পনাই করতে পারবেন না অটিষ্টিক ছেলে মেয়েরা কেমন হয়। অটিজম ছাড়াও আরো অনেক প্রকার জেনেটিক ও সামাজিক পরিবেশিক কারণে সন্তান অস্বাভাবিক আচরণ করতে পারে। কিন্তু তার স্বাভাবিক দৈহিক অবস্থা শরীরের গঠন চেহারা দেখে অনুমানই করা যায় না যে সে তার সব কিছু নিজের ইচ্ছেয় করে না বা তার মাঝে কোনো সমস্যা আছে।

একটি শিশুর মনোবিকাশ নির্ভর করে তার শিশুকালের ভরণ পোষণ, তার মা বাবার দেয়া শিক্ষা, তার পারিপার্শ্বিক সামাজিক পরিবেশ ও পারিবারিক আর্থিক অবস্থার উপর। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সন্তানের মনোজগতের পরিবর্তন সম্পর্কে মা বাবাদের পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকার কারণে তারা তাদের সন্তানের উপর নিজের পছন্দ নিজের আশা আকাঙ্খা জোর পূর্বক চাপিয়ে দিতে চান। এই লেখাটি যখন লিখছি তখন ফেইসবুকে একজন মানুষের একটি অবিশ্বাস্য স্ট্যাটাস পড়লাম। আসলেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না একজন শিক্ষিত মানুষ এমন কথা কীভাবে লিখতে পারলেন। স্ট্যাটাসটি যে সম্প্রতি ভিকারুন্নেসা কলেজের ছাত্রী অরিত্রীর আত্মহত্যার প্রেক্ষিতে লেখা তা অনুমান করা যায়। লেখক তার পাঠলশালা জীবনের অভিজ্ঞতা গর্বিত সুরে বর্ণনা করছেন এভাবে:

‘বাবা আমাকে পাঠশালায় নিয়ে গিয়ে শিক্ষককে বললেন, মাস্টার সাহেব ছেলেটাকে দিয়ে গেলাম। আপনার ইচ্ছেমত একে শাসন করবেন, ছেলের শরীরের হাড্ডি আমার আর চামড়া আপনার। বাবার অনুমতি পেয়ে স্যার আমাকে যখন তখন খুব মারপিট করতেন। আমিও খুব দুষ্ট ছিলাম। সেদিন বাবা যদি আমার শিক্ষককে অভয় না দিতেন আর শিক্ষক যদি আমাকে প্রহার না করতেন আমি কোনোদিন কলেজ ইউনিভার্সিটির শিক্ষা পেতাম না আর এখানে আজ এই স্ট্যাটাসও দিতে পারতাম না’।

সেই স্ট্যাটাস সমর্থন করে বেশ কিছু মানুষ লাইকও দিয়েছেন। তাদের অনেকগুলো মন্তব্যের একটি মন্তব্য ছিল: ‘মাইরের উপর ঔষুধ নাই’। কি মারাত্বক কথা। একজন শিক্ষিত মানুষের মুখ থেকে এমন অমানবিক কথা বের হলো কীভাবে? এরা যদি শিক্ষক হন, এদের হাতে কোনো ছাত্রছাত্রী দেয়া তো নিরাপদ নয়। মাইর যে কোনো ঔষধ নয় তা তো অরিত্রী নিজের জীবন দিয়ে শিখিয়েই দিলো। অরিত্রীকে মেন্টাল টর্চার করা হয়েছে। অশিক্ষিত অসচেতন মা বাবা ভুল করলেন, না বুঝে মুখস্ত বই পড়ুয়া বিদ্যান না হয় ভুল বললেন, একজন স্কুল শিক্ষক বা কলেজের অধ্যাপক এমন ভুল করেন কী ভাবে? শিশু কিশোরদের মন মানসিকতা নিয়ে বিজ্ঞানের একটি শাখাই আছে Child psychology ‘শিশু মনোবিজ্ঞান’ নামে। শিশুর শিক্ষা সাস্থ্য, নিরাপত্তা চাহিদা ও অধিকার নিয়ে পৃথিবীর সকল দেশে রাষ্ট্রীয় আইন আছে Children Act নামে। শিক্ষক তো দূরের কথা সন্তানের মা বাবাও তাদের সন্তানের গায়ে হাত তুলতে পারবেন না, আইন তা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। স্কুল কলেজে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্র ছাত্রীদের উপর দৈহিক বা মানসিক নির্যাতন বিশ্বের সভ্য দেশে অকল্পনীয়।

পয়তাল্লিশটি বছর ইংল্যান্ড কাটালাম, একে একে পাঁচটি সন্তান নার্সারী থেকে জুনিওর, সেকেন্ডারি, কলেজ হয়ে ইউনিভার্সিটিতে গেলো, কোনো দিন আমার অথবা অন্য কারো কোনো ছেলে মেয়ের গায়ে তাদের শিক্ষক হাত তোলা বা ধমক দেয়া তো দূরের কথা একটু কটু কথা বলেছেন বলেও শুনি নি। কিন্তু দেখেছি বছর শেষে শিক্ষক শিক্ষয়িত্রীদের গলায় জড়িয়ে ধরে ছাত্রছাত্রীদের বুক ভাঙ্গা কান্না। শিক্ষকরা সারাটি বছর এতো আদর এতো স্নেহ মমতায় বেঁধে রাখেন তাদের ছাত্রছাত্রীগুলোকে। আর আমাদের দেশে নাকি বাবা শিক্ষকের হাতে ছেলে তোলে দিয়ে বলেন, ‘ছেলের গায়ের চামড়া তোমার আর হাড্ডি আমার’?

শিশু নির্যাতন কাকে বলে যদি দেখতে চান তাহলে কওমি মাদ্রাসায় যান। আমি নিজে এর সাক্ষী। এখন অবশ্য অনেক কওমি মাদ্রাসায়ও ছাত্রদের বেত্রাঘাত করা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। যুগ যুগান্তরের নির্যাতন, মাইরের ওষুধ কউমি মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে কী দিলো কী বানালো? হয়তো জনমের বোকা আর না হয় সন্ত্রাসী জঙ্গী।

এক সময় ইংল্যান্ডে সন্তানকে কন্ট্রোল করার জন্যে পিতামাতা আস্তে করে নরম হাতে সন্তানের উরুতে বা পাছায় smacking বা চাপড়ানো যায় মনে করা হতো। এখন তাও নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। হাত দিয়ে বা অন্য কিছু দিয়ে আঘাতের কারণে শিশুর শরীরের দাগটা হয়তো দেখা যায় যা এক সময় মুছেও যায় কিন্তু তার মনের আঘাতটা? সেটা তো দেখাও যায় না মুছেও যায় না। তাই Child charity NSPCC এর বিরোধীতা করে smacking এর কুফল কী হয় জানিয়ে দিয়েছে এ ভাবে:

Gives kids a bad example of how to handle strong emotions.
May lead kids to hit or bully other children.
May encourage kids to lie because they fear being smacked.
May make defiant behaviour even worse.
Leads to a resentful or angry child, thus damaging the family relationship.

তাহলে ‘মাইরের ঔষধ’ শিশু কিশোরদের উপর প্রয়োগ করে লাভটা কী হলো?

কতো গার্ডিয়ান মিটিং, স্কুলের গভর্নিং বডির মিটিং, পেরেন্টস ইভিনিং দেখলাম, এমন আজগুবি মিটিং আমি জীবনে কোনোদিন দেখি নি যা অরিত্রীর শিক্ষকগণ দেখালেন। যে রুমে অরিত্রী ও তার মা বাবাকে ডেকে আনা হলো সেটা কি অধ্যক্ষের রুম নাকি রাস্তার পানের দোকান?

পৃথিবীর কোনো মা বাবাই চান না তাদের সামনে তাদের সন্তানের বদনাম কেউ করুক, জগতের কোনো সন্তান চায় না তার সামনে তার মা বাবাকে কেউ অসম্মান করুক। সন্তানের সামনে তার মা বাবাকে অপমান করা, কিংবা মা বাবার সামনে সন্তানের বদনাম করা সমালোচনা করা যে কতো বড় অন্যায় কতো গর্হিত কাজ এই বোধটুকু যাদের নেই তারা কলেজে শিক্ষকতার চাকুরি পান কী ভাবে, কোন যোগ্যতায়? কোন মামুর ভাগিনা ভাগিনী এরা যার আশির্বাদে এদের নিয়োগ হয়? এই শিক্ষকরা টিচার্স ট্রেইনিং নেন না? এদের প্রাক্টিক্যাল কোনো পরীক্ষা দিতে হয় না? অরিত্রী প্রশ্নোত্তর নকল করেছিলো কিনা জিজ্ঞেস করার আগে প্রশ্ন করুন ছাত্রছাত্রীরা নকল করার প্রয়োজন বোধ করে কেনো। তাদের এই মানসিকতা গড়ে উঠার জন্যে আসলে দায়ী কে? যে দেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নকল অনেক আগে থেকেই চলে আসছে এ নতুন কিছু নয়’, যে দেশের শিক্ষামন্ত্রী বলতে পারেন, ‘নকল আমাদের সময়েও ছিলো’ সে দেশে অরিত্রীর মোবাইলে নকল খুঁজে কোন বেয়াক্কেল?

এই রাষ্ট্রের ব্যর্থতা এই সমাজের কুৎসিত চেহারা অরিত্রী আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এতো অপমান অরিত্রী সহ্য করতে পারে নি। সে মরিয়া প্রমাণ করে দিয়েছে সে মরে নি। আগামী দিনের অরিত্রীদের বাঁচাতে হলে এক্ষুনি মূল অপরাধী, আসল কালপ্রিটদের ধরুন। আর মাতাপিতাদের কাছে সবিনয় অনুরোধ করি, কোনোদিন কোনো অবস্থাতেই আপনার সন্তানকে ধমকাবেন না, এমন কিছু তার সাথে করবেন না যাতে সে ভয় পায়। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিৎ নয় আমরাও যে তাদেরই মতো একদিন শিশু ছিলাম।

(প্রতিকী ছবি ইন্টারনেট থেকে)


  • ২৭৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

আকাশ মালিক

ব্লগার ও অনলাইন একটিভিস্ট

ফেসবুকে আমরা