ফাহমিদা জামান ফ্লোরা

শিক্ষার্থী (ডিপার্টমেন্ট অফ ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) এবং নারীবাদী লেখক।

আমি ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড ও ক্রস ফায়ার চাই না

শাহবাগে দেখলাম বহু লোকেদের প্ল্যাকার্ডে লেখা তারা ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড চায়, ফাঁসি চায়, ক্রসফায়ার চায়। আমি এসবের কিছুই চাই না৷ এবং আমি শাহবাগে কোনো প্রতিবাদ করতে বা আন্দোলনে যোগ দিতে যাই নি, অন্য কাজে গেছিলাম। এই বিষয়টা উল্লেখ করলাম কারণ পরবর্তীতে তথ্য বিভ্রান্তিতে পড়ে আমার সমস্যা হইতে পারে যেহেতু আমি কোনো প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়াবো না এবং রাজনৈতিক দলে যুক্ত হবো না প্রতিশ্রুতিতে মৌখিক স্বাক্ষর করে আমার ফ্যামলির কাছ থেকে অন্য সকল স্বাধীনতা কিনেছি। সুতরাং, ভুল তথ্য এদিক ওইদিক গেলে আমার নিজেরই সমস্যা হইতে পারে।
 
এবার মূল আলোচনায় আসি- বছরের এমন একটা মাস যায় নি যে মাসে ফেসবুকে আমাকে নিয়ে লোকে পেইজে পেইজে গাইলাই নাই। ১০১ টা স্ক্রিনশট দেখাইতে পারবো যেখানে প্রগতিশীল নারীবাদী থেকে পুরুষতান্ত্রিক পুরুষ সবাই গড়ে কইছে "নারীবাদ মানে কম কাপড় আর মদ-বিড়ি খাওয়া বানাইয়ে ফেলছে ফাহমিদা জামান"। আমাকে বলা হইছে- আমি কেনো নারীর শিক্ষার অধিকার, নারীর খাবারের, মজুরির অধিকার নিয়ে কথা কই না। যাচ্ছেতাই ভাষায় আমাকে বিভিন্ন ফেসবুক পেইজে এবং ইন্সটাগ্রামে লোকে গাইলাছে। আজ এই লোকগুলাই ধর্ষণের বিরুদ্ধে রাজপথ এবং সোশ্যাল মিডিয়া কাঁপাচ্ছে।
 
উপরিউক্ত লোকদের আমি ঘৃণা করি না। আমি সমস্ত সাইবার বুলিং মাথা পেতে নিই কারণ আমি জানি আমার সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম আজ ওদের ইভটিজার, মৌলবাদী, ধর্ষক বানাইছে। আমি জানি আমার দেশের বড় একটা অংশ সোশ্যালাইজ হইতেছে বিশ্রি একটা পুরুষতান্ত্রিক প্রসেসের মধ্য দিয়ে। আমি জানি আমাদের বাবা-মায়েরা শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারে নাই। আমি জানি জিয়ার আমল থেকে শুরু হয়ে এরশাদের আলম ক্রস করে ২০২০ এর মধ্যে চলমান ইসলামায়নের সরাসরি ভিক্টিম তারা। 
 
আমি জানি, আমি দেখি বাচ্চাদের বাবা-মায়েরা ছেলে শিশু জন্মাইলে ২ টা গরু এবং মেয়ে হইলে ১ টা গরু আকিকা দেওয়ার মধ্য দিয়ে পুরুষতান্ত্রিকতা শিশুকে দেখাইতে শুরু করে। তারপর খেলনা সামগ্রী থেকে শুরু করে স্কুলে পা দেওয়া পর অ্যাসেম্বলিতে সূরা ফাতিমা পাঠের মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে যায় একটা শিশুর মগজে লিঙ্গ বৈষম্য এবং মৌলবাদ প্রবেশের যাত্রা। শিশু বুঝে ওঠার আগেই ক্লাস থ্রিতে তাকে পড়ানো হয় "অমুসলিম মাত্রই জাহান্নামী", "নারীর পর্দা ফরয" ইত্যাদি ইত্যাদি! স্কুল থাইকা বাইর হয়ে রাস্তা-ঘাটে বিজ্ঞাপন আর সিনেমার পোস্টারে শিশুটি দেখে নারী মাত্রই গোলাপি-লাল মিশ্রিত নম্রতা, পুরুষ মাত্রই শক্তিশালী বিত্তবান আত্মনির্ভরশীল। বাসায় ফিইরা টেলিভিশন, ল্যাপটপ খুললেই গান-নাচ-সিনেমায় দেখে নারীকে সেক্সুয়াল হ্যারেসমেন্ট করা পুরুষত্বের অংশ এবং কনসেন্ট ছাড়া নারীর পিছে ঘোরাঘুরি ঢলাঢলি করা প্রেমের প্রাথমিক অংশ, ইউটিউবে ওয়াজ মাহফিলে দেখে হুজুরের কয়- নারী তেতুল! এমন কইরা টিনএজে আইসা দেখে দেশে নাই গণতন্ত্র, পাওয়ার প্রাকটিস চলে, দেশ ভরা ফান্ডাম্যান্টালিজম আর ফ্যাসিজম। এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ। এভাবেই চলমান।
 
এবং আমি বিশ্বাস করি এভাবে সামাজিকীকরণ হওয়া একজন মানুষ একজন আগাগোড়া পুরুষতান্ত্রিক পুরুষ বা নারীতে পরিণত হয়। তারপর দেখেন আমাদের দেশের আইন! কি বিশ্রি আইন! যেহেতু ধর্ষণ নিয়ে লেখতেছি আমাদের দেশে ধর্ষণের ডেফিনেশনটা দেখেন-
 
বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারা ধর্ষণের সংজ্ঞা দেয়। সেটা অনুযায়ী পাঁচটি অবস্থায় ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলা যায়। সেগুলো হলো—
 
১. নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে।
 
২. নারীর সম্মতি ছাড়া।
 
৩. মৃত্যু বা জখমের ভয় দেখিয়ে।
 
৪. নারীর সম্মতি নিয়েই, কিন্তু পুরুষটি জানে যে সে ওই নারীর স্বামী নয় এবং পুরুষটি তাও জানে, নারীটি তাকে এমন একজন পুরুষ বলে ভুল করেছে যে পুরুষটির সঙ্গে তার আইনসঙ্গতভাবে বিয়ে হয়েছে বা বিবাহিত বলে সে বিশ্বাস করে।
 
৫. যদি কোনো পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ষোল বৎসরের অধিক বয়সের কোনো নারীর সাথে তার সম্মতি ছাড়া বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তার সম্মতি আদায় করে, অথবা ষোল বৎসরের কম বয়সের কোনো নারীর সাথে তার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করেছেন বলে গণ্য হবেন।
 
মানে কি দাঁড়ায়? কয়েকটা পয়েন্ট খেয়াল করেন-
 
প্রথমত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইলে সেই নারীর সম্মতি ছাড়া তার সাথে যৌনতা করা যাবে অর্থাৎ তাকে যৌন নির্যাতন করতে পারার বৈধ কার্ড দেওয়া হইছে। সুতরাং বৈবাহিক ধর্ষণ বইলা কিছুই নাই।
 
দ্বিতীয়ত ষোল বছরের কম কোনো নারীর সম্মতিতেও তার সঙ্গে আপনি সেক্স করলে সেইটা ধর্ষণ হয়ে যাবে। হাইস্যকর! মাত্রাতিরিক্ত হাইস্যকর! পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আইন আছে - ১৪/১৫ বছর বয়সী নারী তার বয়সী পুরুষের সঙ্গে সেক্স করতে পারবে এবং ওই নারীর থাইকা বয়সে খুব বেশি বড় কিংবা তার হাইয়ার অথরিটি অর্থাৎ স্কুলের শিক্ষক, কোচ, ধর্মীয় নেতা, বয়স্ক ফ্যামলি মেম্বার কোনো পুরুষ তার সম্মতি সহকারেও সেক্স করলে সেইটা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে। কানাডার কথাই যদি বলি - কোনো ১২ বছর বয়সী নারী ১৪ বছর বয়সী পুরুষের সঙ্গে সেক্স করতে পারবে কিন্তু পুরুষটির বয়স ১৫ হইলে হবে না। এমনিতেই রাষ্ট্রের এই সিস্টেম আমার পছন্দ না। বাংলাদেশে তো একটা নারীর ১৬ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, তার আগে অর্থাৎ ১৫ বছর বয়সেও স্বেচ্ছায় যৌনতার অধিকার নাই নারীর!
 
তৃতীয়ত ট্রান্সজেন্ডার বা ইন্টারসেক্স যারা আছেন তাদের জন্য কোনো আইন নাই৷ তারা যে প্রতিনিয়ত ধর্ষণের শিকার হইতেছে সেই বিষয়ে কারো মাথাব্যথা নাই। এবং পুরুষেরাও যে যৌন নির্যাতনের শিকার হন কিংবা ম্যারিটাল রেইপের শিকার হন, সেই বিষয় সকলের হাসির খোরাক জোগায়। এইটাতেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
 
চতুর্থত এই আইনে এখন অনেকে "বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন" উল্লেখ কইরা ধর্ষণ মামলা দিতাছে। হাউ স্টুপিড! ধর্ষণের সঙ্গে প্রলোভনের সম্পর্ক হইতে পারে! দুইটা প্রচন্ড বিপরীতমুখী। ধর্ষণ হইলো ইচ্ছার বিরুদ্ধে হইছে আর প্রলোভন অর্থাৎ লোভে পইড়া আপস করছেন। কি দিয়া কি মিলাইলেন আপনারা!
 
এগুলো হইলো শুধুমাত্র ধর্ষণের সংজ্ঞার ফাঁকফোকর। এই আইনে শাস্তির বিধান আরো যা তাই অবস্থা। তারপর এখন সরকার পক্ষ থেকে ঘোষণা আসছে, ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড! জনগণ আবার চায় ক্রসফায়ার, প্রকাশ্যে উপযুক্ত শাস্তি, ফাঁসি ইত্যাদি ভয়ংকর টার্ম তারা ইউজ করতেছে। এগুলো ভাবতেই শরীর শিউরে উঠে আমার, ঠিক যেমনটা হয় ধর্ষণের ঘটনা শুনে।
 
আমরা এতোই অশিক্ষিত, বর্বর যার ফলে আমরা ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চাই অথচ আমরা ধর্ষক তৈরির কারিগর সমাজকে সংস্কার করতে চাই না। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায়, ধর্ষণকে বলা হয় ব্লু কলার ক্রাইম যেইটা সমাজের প্রতিচ্ছবি, সমাজের সৃষ্টি। যেইটাকে সমাজ লালন করে। এই ধর্ষণের সঙ্গে যতোটা যৌনতার সম্পর্ক আছে ঠিক ততোটাই পাওয়ার প্রাকটিসের সম্পর্ক আছে। আমার বাপ-মামা ক্ষমতাসীন, বিত্তবান ফলে আই কান ডু হোয়াট আই ওয়ান্ট টু ডু এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্কেলে নিম্নবর্গের মানুষরে শোষণ করা হইতেছে, এই দৃশ্য চর্চা সমাজে ধর্ষকের জন্ম দেয়। তথাপি "যৌনতায় নারীর সম্মতি প্রয়োজন" এই বিষয়ের সঙ্গে খুব বেশি পরিচিত না থাকা ধর্ষক তৈরিতে সাহয্য করে।
 
সুতরাং মৃত্যুদণ্ড বা কঠোর শাস্তি দিয়ে অপরাধ রোধ বা নির্মূল সম্ভব হয় না। তবে অপরাধ সাময়িক সময়ের জন্য কমানো সম্ভব। আপনারা ধর্ষকের লিঙ্গ কর্তন করতে চেয়ে এইদিকে আইসা ফেসবুক সেলিব্রেটি নারীদের ছবিতে 'বেশ্যা, খানকি' কয়া দ্বীনের দাওয়াত দেন! কোনো মাইয়া রাস্তায় বিড়ি খাইলে ১০০ বার ঘুইরা ঘুইরা তাকান অথচ রাস্তার মধ্যে তারে হ্যারেস করলে কন, মাইয়ার পোশাকে দোষ। ফেমনিজম নিয়া মিম বানান, জোক করেন। সুতরাং বুঝতে পারতেছেন শাস্তির বিধানে কঠোরতা আইনা খুব বেশি লাভ কিংবা লোকসান হবে না কারণ ধর্ষণ মামলার রায় ৯০ দিনে হবে না, ধর্ষিতা কেইস ফাইল করতে যাবে না সামাজিক অবস্থানের কারণে। এক্ষেত্রে একমাত্র করণীয়- বাংলাদেশে সরকারের ধর্ষণ আইন সংশোধন এবং অতি জরুরি সমাজ সংস্কারের কাজে হাত দেওয়া।
 

2218 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।