আঞ্জুমান রোজী

লেখক

মনন চর্চায় শিল্পের ভূমিকা

কোয়ারেন্টিন সময়ে নেটফ্লিক্স ও ইউটিউবে অনেক মুভি দেখি। বেশিরভাগই ভারতীয় মুভি দেখি। ভারতীয় মুভিতে কিছু বিশেষত্ব খুঁজে পাই। বিশেষ করে নারী বিষয়ে। নারীর অগ্রগামী ভূমিকা নিয়ে বেশক'টি মুভির ঘটনা আবর্তিত হয়েছে। যে ঘটনায় নারী জাগরণের কথা বলা হচ্ছে, বলা হচ্ছে নারী অধিকারের কথা। যদিও ভারতে আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মৌলবাদী চিন্তা-চেতনার অবস্থান, যেখানে নারীর কোনো স্বাধীনতাই নেই। তারপরও বলবো, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি হচ্ছে প্রগতির দিক নির্দেশক। সেই কাজটি করছে ভারতীয় অনেক বোদ্ধা চলচ্চিত্রকার।

যেমন, বুলবুল, সেকশন ৩৭৫, শকুন্তলা এমন অনেক মুভিতে লক্ষ্য করেছি নারীকে মূখ্য ভূমিকায় রেখে সমাজের প্রতিকুল অবস্থাকে তুলে ধরতে। বুলবুল এবং সেকশন ৩৭৫ মুভিতে নারীর অস্তিত্বের লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট, সেই সাথে সেই প্রতিকুল প্রেক্ষাপট থেকে উঠে আসার যুদ্ধ বিধৃত হয়েছে। যা নারীকে নিজ সত্তায় বেঁচে থাকতে উজ্জীবিত করে। বিশেষ করে সেকশন ৩৭৫ মুভিতে পুরুষের প্রতারণা আর ব্যাভিচারের বিরুদ্ধে এক নারীর রুখে দাঁড়াবার প্রতিশ্রুতি বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। যেখানে নারী নিজের জীবনকে বাজী রেখে একাই আইনের আশ্রয় নেয় এবং আসামী পক্ষের উকিল, যে নাকি শহরের নামকরা উকিল, সেও সেই নারীর দ্রোহের কাছে কুপোকাত হয়ে যায়। আত্মসম্মানবোধ নারী এখন বোঝে পুরুষের থেকে আঘাতটা কিভাবে আসে এবং সেটা প্রতিহতের জন্যও প্রস্তুত থাকে। মুভিতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, বর্তমান সময়ে কোনো পুরুষ কোনো নারীকে  ইমোশনালি এবিউজ করে পার পেতে পারবে না। সময় বদলেছে, নারীও এখন জেগে উঠেছে। 

ভারতীয় মুভিতে যেখানে  প্রগতির কথা বলে, বলে নতুন জীবনের কথা, সেইসাথে নারীকেও দিচ্ছে আলোর দিশা; সেখানে বাংলাদেশের মুভি, নাটক সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী ভূমিকা রেখে যাচ্ছে; যা পশ্চাতমুখী  এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন। নারী জাগরণের কথা তো বলেই না। খুবই দুঃখজনক হলেও এটাই সত্য। বাংলাদেশের কিছু সিনেমা, নাটক দেখেছিলাম। যার অনেকগুলোই পুরোপুরি দেখি নি। তবে একটা টেলিফিল্ম দেখেছিলাম শেষ পর্যন্ত। কাহিনীর শুরুতে টান টান উত্তেজনা ছিল। কিন্তু শেষে এসে সেই গৎবাঁধা সমাধান দিয়ে দিলো নাট্যকার। যেখানে পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে নিত্য নতুন ধারায়, আর বাংলাদেশের নাট্যকাররা পড়ে আছে সেই মান্ধাতার আমলে। নাটকের নামধাম মনে নেই। তবে কাহিনীটা গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে, তাই এভাবে লিখতে বসেছি। কারণ,  মুভি দেখি, নাটক দেখি, বই পড়ি আর যা-ই করি না কেনো আমি এসবের মধ্যে দর্শন খুঁজি, খুঁজি এ থেকে দর্শক, পাঠক, সমাজ কি পেলো!

নাটকের কাহিনীতে স্বামী এক প্রতিষ্ঠানের বস। বস-স্বামীর অধীনে এক নারী কাজ করে। সেই নারীর কাজ ছিলো বস-স্বামীর সব কাজ আপডেট করে রাখা। এভাবে চলতে চলতে বস-স্বামী নারীকর্মীটির কাছে ঘেষতে থাকে। একদিন অনভিপ্রেত কোনো ঘটনার কারণে নারীকর্মীটি বাধ্যতামূলক কাজ থেকে অব্যাহতি নেয়।সেই ঘটনার রেশ ধরে চার বছর পর নারীকর্মীটি বিবেক যন্ত্রণায় জর্জরিত হয়ে বসের বিরুদ্ধে সেক্সচুয়াল হেরাসমেন্টের জন্য মামলা করে দেয়। যার প্রেক্ষিতে বস-স্বামীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং বলা হয় ইনভেস্টিগেশনের পর তাকে ডাকা হবে। বিষয়টা বসের পরিবারের জন্য লজ্জাকর এবং অপমানজনক । প্রথম দিকে বউ স্বামীর কথা বিশ্বাস করে এবং ইনভেস্টিগেশনের রেজাল্টের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু ইতোমধ্যে স্বামীর কিছু আচরণে বউয়ের মধ্যে সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে। তখন বউ উকিল বন্ধুর কাছে যায় একটা ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। কিন্তু উকিল বন্ধুটি তাকে নিরুৎসাহিত করে ফিরিয়ে দেয় এবং বলে  স্বামীকে বিশ্বাস করতে। যা হয় আর কি। পুরুষ সবসময় পুরুষের পক্ষেই থাকে। এর মধ্যে সেই ভিক্টিম নারীকর্মীটি বউয়ের সঙ্গে দেখা করে বিস্তারিত সব বলে দেয়। কারণ, নারীটি বুঝতে পেরেছিলো যে সে সঠিক বিচার পাবে না। তারপর স্বামীটি মিথ্যা অপবাদ থেকে মুক্তি পায়। সে আবার কাজে যোগ দেয়। পরিবারে সকলের মুখে হাসি ফোটে। বউটিও সকলের সঙ্গে হাসি শেয়ার করে। কিন্তু বুকে তার দাউদাউ আগুন। এভাবেই শেষ হয় নাটকটি। আর আমার মাথায় কাজ করে, আর্কিটেক বউটি কি পারবে আর কোনোদিন তার স্বামীর সঙ্গে মিলিত হতে! পাহাড় সমান চাপা কষ্ট নিয়ে এভাবেই কি নারীকুল যুগ যুগ ধুকতে থাকবে? নাটকটি থেকে নারী সমাজ কি পেলো? সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী দু'টো নারী চরিত্র নতুন কি বক্তব্য তুলে ধরলো নারীদের জন্য? নাট্যকার কি পারতো না নারীদের জন্য কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে?এভাবেই ভেবে চলেছি। 

বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা যে পশ্চাতমুখী, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এর জন্য সচেতন নাগরিকরা অনেকাংশে দায়ী। আমি লক্ষ্য করেছি বাংলাদেশে অনেক নারী শিক্ষা দীক্ষায় বলিষ্ঠ এবং তারা অর্থনৈতিক মুক্তিও অর্জন করেছে। কিন্তু তাদের মানসিক মুক্তি মেলেনি। তারা এখনো প্রথা মেনে জীবন চালায়। ধর্মীয় গোঁড়ামিতে আবদ্ধ হয়ে আছে। স্বামীর সবরকম অন্যায় অত্যাচার মুখ বুঝে সহ্য করে জীবন ধারণ করছে। এমন মানসিকতার কি কারণ জানি না। মাথা উচুঁ করে চলার সবরকম সরঞ্জাম এবং জোগান তার আছে, তাহলে কেনো একটা পুরুষের অধীনে সেই নারীকে থাকতে হবে, যেখানে নারীকে প্রতিমুহূর্ত পুরুষের এবিউজের শিকার হতে হচ্ছে! আসলে, শুধু অর্থনৈতিক মুক্তি মিললেই হয় না। মননের মুক্তির জন্য চাই শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা। এর জন্য যারা এই দায়িত্বে আছেন তাদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।

ভারতীয় মুভির প্রেক্ষাপট দিয়ে শুরু করেছিলাম। কারণ, মুভিগুলো শিক্ষণীয়। প্রগতিশীল মানসিকতার প্রতিফলন এভাবেই দেখাতে হয়। বিশেষ করে পশ্চাৎপদ সমাজে নারী যেখানে পিছিয়ে আছে। তাদেরকে আলোর পথ দেখাতে হলে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চার মধ্য দিয়ে দেখাতে হবে। কারণ, যে দেশ শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে যত উন্নত সে জাতি তত উন্নত। বিশ্বের বুকে দৃষ্টান্ত শিল্প-সংস্কৃতির চর্চার মাধ্যমেই তুলে ধরতে হয়। আর, যেখানে অর্ধেক জনসংখ্যার বেশি নারী, সেখানে নারীকে সামাজিকভাবে অবদমনের মুখে রাখার মানসিকতা দূর করার সবরকম শৈল্পিক চর্চা অব্যাহত রাখা উচিৎ। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চার মাধ্যমে মানুষের মননে যতটা ধাক্কা দেওয়া যায় আর কোনো মাধ্যমে তা সম্ভব নয়।

937 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।