সব নষ্টের মূলে প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতা

রবিবার, জুন ২১, ২০২০ ৫:৩৩ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে তাকে সৃজনশীল ও মননশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তোলা। এই ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে মানুষের সার্বজনীন মানসিকতা ও উদার দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে। অর্থাৎ যাদের মধ্যে প্রগতির চেতনা কাজ করে। কিন্তু রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল মানুষের মধ্যে এই বিষয়গুলো অনুপস্থিত। এদের বেশিরভাগই প্রচলিত শিক্ষার সঙ্গে স্বশিক্ষা, নিজের সংস্কৃতির চর্চা ও নিজ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্বন্ধে সম্যক ধারণা রাখে না। আজকের এই সময়ে রক্ষণশীলতার কোনো জায়গা নেই। রক্ষণশীলতা মানুষের মধ্যে এক ধরণের পশ্চাৎমুখিতা ও প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতা তৈরি করে। মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মানুষ যখন প্রগতিশীল চিন্তাধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে প্রতিক্রিয়াশীল ধারণাকে লালন করে, তখন তার চিন্তাধারার স্বকীয়তা হারিয়ে যায়। মানুষের মধ্যে নিজস্বতা বলে কিছু থাকে না, তার দৃষ্টিভঙ্গি বিকশিত হতে পারে না। ফলে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে বেশি।

আমার এক কবি বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এতো এতো মানুষ হতে বলো, আসলে মানুষ কীভাবে হয়!? প্রথমে সে বললো, মনুষ্যজ্ঞান লাভ করলেই মানুষ হওয়া যায়। আমি আবারো প্রশ্ন রাখলাম তার কাছে, মনুষ্যজ্ঞান লাভের পথটি কী? তখন সে বললো, মনুষ্যজ্ঞান লাভটা হলো একটি ক্রমাগত প্রক্রিয়া। নির্দিষ্ট কোনো বই পড়ে তা অর্জন করা সম্ভব নয়, যা সম্ভব শুধু ধর্মের বই পড়ে ধার্মিক হওয়ার জন্যে। আসলে মানুষ হবার পন্থা হচ্ছে সত্যের অনুসন্ধান। একদম ঠিক, সত্যের অনুসন্ধানই হলো মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার মূলমন্ত্র। এখন সেটা কি সত্য, কেমন সত্য; মনে প্রশ্ন জাগতে পারে। অবশ্যই তা মানবতার স্বার্থে সত্যানুষন্ধান।

পৃথিবী গড়িয়ে যাচ্ছে কাল থেকে কালান্তরে। প্রতিদিন নতুন সকাল নতুন বার্তা বয়ে নিয়ে আসে। আজকের পৃথিবী কী হাজার বছরের পুরনো পৃথিবী! সত্যের অনুসন্ধান করেই তো মানুষ আজ সভ্যতার চরম শিখরে পৌঁছেছে! না হলে মানুষ আজো গুহা জীবনেই বসবাস করতো। জীবনের যদি এতো পরিবর্তন তাহলে মানসিকতার কেনো পরিবর্তন হবে না! বিশ্বাস তো আপেক্ষিক, সময়ে সময়ে তা পরিবর্তন হচ্ছে। অথচ বিশ্বাস আর সত্যানুসন্ধান যেনো শুধু ধর্মের বইতেই আটকে আছে। হ্যাঁ এটা ঠিক, ধর্ম মানুষকে সংযমী, বিনয়ী, শ্রদ্ধাশীল, সৎ ও পরোপকারী করে তুলতে সচেষ্ট। এসব মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনের সহায়ক হতে পারে, কিন্ত মনস্তাত্ত্বিক চিন্তা চেতনার বিকাশ ঘটাতে পারে কি? শুধু একমুখী ধর্মচর্চা করলেই তো জীবনের সর্বাংশে পরিপূর্ণতা আসছে না! আজকের এই একবিংশ শতাব্দী যেখানে নানামুখী জ্ঞান, বিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ছুটে বেড়াচ্ছে, নিয়ে আসছে মানব সভ্যতার জন্য মানবিক জীবন, সেখানে শুধু ধর্ম আগলে বসে থাকলে কি সম্ভব উন্নত জীবনযাপন করা!

ধর্ম শুধু সংযমের বাতাবরণ। ধর্মকে বৈষয়িক, সামাজিক ও রাজনৈতিকক বিষয়ে গুলিয়ে জীবনকে এমন জটিল করার অর্থ কী! অবশ্য বাস্তবে ধার্মিকদের অনেকেই উন্নত জীবনযাপন করছেন, নিচ্ছেন বিশ্বায়নের সকল রকমের সুযোগ সুবিধা, কিন্তু মস্তিষ্কে বয়ে নিয়ে চলেছেন সেই অন্ধকার যুগের ধ্যান ধারণা। ফলে এদের মানসিক বিকাশ তো দূরের কথা, বোধের এবং ভাবের গভীরতাও আটকে থাকে ধর্মের বেড়াজালে। শিল্পের নন্দনতত্ত্ব বোঝা তখন তাদের কাছে কঠিন বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। মূলতঃ এদেরকেই আমি প্রতিক্রিয়াশীল বলি। যারা প্রগতির পথে বিরাট অন্তরায়।

ধর্মের কথা বলবো, কিন্তু ধর্ম পালন করবো না এমন মানসিকতার মানুষদের সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থানও থাকে দোটানায়। এরা সর্বোবস্থায় সবজায়গায় বহাল তবিয়তে থাকার পায়তারা করে। এরা না ঘরকা, না ঘাটকা অবস্থায় বিরাজ করে। অর্থাৎ ধরি মাছ না ছুঁই পানির মতো। লাভ বা স্বার্থের অংশটা ঠিক আছে কিনা ভেবে এরা আলোতে যত দ্রুত ছোটে ঠিক ততোধিক দ্রুত অন্ধকারেও ছোটে। সব অবস্থায় লাভ পাওয়া বা লাভের অংশীদার হওয়াই এদের মোক্ষম উদ্দেশ্য। এমন প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতাই সমগ্র উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এরা যেমন সমাজের কীট, তেমন দেশেরও শত্রু।

প্রতিক্রিয়াশীল মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিষয় বিশ্লেষণ করা বেশ দূরহ ব্যাপার। অনেকদিন কাছে থেকে উঠাবসা করলে কিছুটা আঁচ করা যায়, কিন্তু এদের চাতুরতার কাছে সবসময় ধরাশায়ী হতে হয়। নিজস্ব স্বকীয়তার অভাব বলে এরা কোথায়, কখন কী বলছে বা কী লিখছে বুঝতে পারে না। যখনই যুক্তি তর্কের কাছে ধরা পড়ে যায় তখনই আক্রমণাত্মক আচরণ শুরু করে। একেবারে হেরে যেতে দেখলে মুখের উপর দরজায় খীল লাগিয়ে দেয়। এরা যতটা ধুরন্ধর ঠিক ততটাই এদের অহমিকা। এরা আকাশে পা আর মাটিতে মাথা রেখে চলে। এমন মানুষের সংখ্যাই বেশি। এসব মানুষের আসলে নির্দিষ্ট কোনো রূপ নেই। যখন যেভাবে যে পাত্রে যায় তখন সেভাবে সেই পাত্রের রূপ ধারণ করে। এদেরকে চিহ্নিত করে দূরে সরিয়ে দিয়েও কোনো নিস্তার নেই। যদি বুঝতে পারে তার স্বরূপ ধরা পড়াগেছে তখনই সে উদ্যত ভূমিকায় নেমে ক্ষতি করার চেষ্টা করবে কিম্বা সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করবে। এরা যে কতোবড়ো মারাত্মক তা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানে। এসব মানুষ সম্পর্কে অন্যকে সাবধান করতে যাওয়াও একটা বিপদ, কারণ এই শ্রেণীর মানুষ সমাজে দ্বৈত ভূমিকা পালন করে চলে। একটা হলো মধু মিশ্রিত মিহিদানার মতো নরম ব্যবহার আরেকটা হলো অন্তরের কদর্য রূপ, বুঝা বড় মুশকিল। এদের দ্বারাই প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়া মানুষগুলো প্রতি পদেপদে বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সীমিত জ্ঞান আর লোকমুখে শোনা কথা দিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল মানুষগুলো শুধু আস্ফালনই করে থাকে। এদের আস্ফালন দেখে হতবাক হয়ে চেয়ে থাকতে হয়। নিরবে সবকিছু এড়িয়ে যাওয়ার নাম পরাজয় নয়। নিরবতার মধ্য দিয়ে যে বীজ বপন হয় আস্ফালনকারী তা কখনো বুঝতেই পারেনা। কারণ, তারা সরগোলে মত্ত থাকে। যেখানে কোনোকিছুর গভীরতা নেই সেখানে তার স্থায়ীত্বও নেই। আজকের দিনই শেষ দিন নয়। প্রগতির পথে পৃথিবী এগুচ্ছে , প্রগতির পথে পৃথিবী এগিয়েই যাবে। যে সত্য সুন্দর দিয়ে পৃথিবীর শুরু সেই পৃথিবী তার পথ ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে। কিছু রক্ষণশীল, প্রতিক্রিয়াশীল মানুষের দ্বারা ক্ষণিক সময় আক্রান্ত হচ্ছে , ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানব সমাজ। এর অর্থ একটাই, প্রগতির পথ থেকে আবর্জনা দূর হচ্ছে। এর মধ্য দিয়েই পৃথিবী এগিয়ে যাবে, যেভাবে এগিয়ে এসেছে যুগযুগ ধরে। প্রতিক্রিয়াশীলরা আস্তাকুড়ে যাবে, কারণ, এদের তো আত্মবিশ্বাস নেই!


  • ৩৮৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি