আরিফা আক্তার

দুই সন্তানের জননী আরিফা পেশাগত জীবনে স্কুল শিক্ষক।

বৈষম্যহীন সমতার পৃথিবী যারা চান -লেখাটা তাদের জন্য

আগের লেখায় লিখেছিলাম যে, সন্তান জন্ম দিতে হবে ভালোবেসে। শুধু মাত্র দায়িত্ববোধ থেকে সন্তান জন্ম দিলে সেই সন্তান কেবল পৃথিবীতে জঞ্জাল সৃষ্টি করবে, আর কিছু নয়। পরিবার মিলে সমাজ, সমাজ মিলে রাষ্ট্র। একটা পরিবারের মূল ভিত্তি কিন্তু নারীকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। যত অবজ্ঞা, অবহেলা, অপমানসুচক কথাই বলা হোক না কেনো পরিবারে নারীর ভূমিকা মুখ্য। তাহলে কি দাঁড়ায়? সুন্দর রাষ্ট্র, সমাজ গঠন করতে হলে সুশিক্ষা, সুন্দর মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ প্রয়োজন। আর মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ পরিবার থেকেই আসে। পরিবারের মূল ভিত্তি কিন্তু নারী!

এইবেলা ধর্ষক, নির্যাতক, নোংরা মানুষ তৈরির জন্য কি আমরা তবে নারীকে দায়ী করবো? দাড়াঁন, একটু ভাবুন। পরিবারের চালিকাশক্তি হিসেবে আমি নারীকে প্রাধান্য দিয়েছি বটে, নারীকে কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের মালিক বা সহযোগীও বলি নাই! নারী সন্তানের কাজ করে তাকে বড় করতে পারে কিন্তু তার ভালোমন্দ নির্ধারণের অধিকার সেই পুরুষতন্ত্রের হাতেই রয়ে গেছে। তথাকথিত যতটুকু ক্ষমতা নারীর হাতে আছে তাতে সমাজের খুব একটা উপকার হয় না। শিক্ষা, সচেতনতার অভাবে নারীর ক্ষমতার অপব্যবহার ই বেশি হয়। কখনো কখনো নারীই হয়ে উঠে ধর্ষকের, অন্যায়কারীর প্রধান আশ্রয়দাতা। সকল ক্ষেত্রে অবহেলিত নারী ক্ষমতার জন্য একসময় লালায়িত হয়, যে কোনো মূল্যে নিজের অস্তিত্ব জাহির করতে উঠে পড়ে লাগে। নিজের জীবনের অপ্রাপ্তি, অবেহলা, নির্যাতনগুলোকে স্বাভাবিক ধরে নিয়ে একসময় সে নিজেও নির্যাতক হয়ে উঠে। তাইতো আমরা দেখি সন্তানের জীবনের প্রথম পাঠ, পরিবার থেকেই সে হয়ে উঠে নষ্ট বীজ। নারীর প্রতি বৈষম্য, পুরুষ লিঙ্গ নিয়ে জন্ম নেয়ায় আলাদা প্রভাবের চর্চা পরিবারেই প্রথম আয়ত্ত করে।

এইক্ষেত্রে নারীকে হতে হবে সচেতন, শিক্ষিত, কঠোর। কোনভাবেই যেন নিজের উপর ঘটে চলা অন্যায়ের ধারাবাহিকতা সন্তানের মধ্যে দিয়ে চলমান না হয়। সন্তানকে শেখানোর গুরু দায়িত্ব নারীর উপর অর্পিত। নারী যেন কোনভাবেই পুরুষতন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়ে বৈষম্যের বীজ সন্তানের মধ্যে জন্ম না দেয়।

যত কথাই বলুন না কেনো, একটা পরিবার যে মূল্যবোধে সন্তানকে বড় করে তার বাইরে শিক্ষায় সচেতন হয়ে কম মানুষ ই ব্যতিক্রমী চিন্তার মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। একেবারেই যে হয় না, তা নয়। তবে সেটা সংখ্যায় নগন্য। তাহলে চিন্তার জগতের গোড়াপত্তন তো পরিবারেই সূচনা হয়। এখানেই যদি আমরা শেখাতে পারি, সুস্থ সুন্দর সম্পর্কের চর্চা, তাহলে পরবর্তী ধাপে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণযোগ্য হতে পারে সন্তান। সন্তানকে সময় দেয়া, তার সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করা, শৈশব কৈশোরের সহজ পরিবর্তনগুলো মেনে নিয়ে তাকে বুঝতে উৎসাহিত করা, এগুলো তো পরিবারের দায়িত্ব। নারী পুরুষের সহজ সম্পর্ক মেনে নেয়া, আচমকা হরমোনের পরিবর্তনের যে প্রভাব, তাতে জোড়ালো বাধ না সেধে সহজ সম্পর্কের দিকে আগানো, এগুলো তো পরিবারের উচিত খেয়াল রাখা। তো, পরিবারের নারী যদি নিজে ভালো মন্দের সংজ্ঞা না জানে তবে কে শেখাবে সন্তান কে? নারীর গর্ভে জন্ম নেয়ায় নারীকেই শেখানোর দায়িত্ব নিতে হয় প্রাকৃতিক ভাবে। নারী শিক্ষা সচেতনায় সমৃদ্ধ হলে তবেই প্রতিটি মানুষ একসময় সুনাগরিক হয়ে গড়ে উঠবে।

নারীর প্রতি অন্যায়ে নারীকেই কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে, কারণ, নিজের যুদ্ধটা অন্য কেউ করে দেয় না।

আমরা চাই সন্তান লালন পালনে পুরুষ ও অংশগ্রহণ করুক, এই নিয়ে জোড়ালো অনেক কথাই বলা হয়ে থাকে। কিন্তু চিন্তার পরিবর্তন যদি বেড়ে উঠার সাথে সাথে না ঘটে তবে স্বামী, ভাই, পিতা বা অন্য যে ভূমিকাতেই পুরুষ থাকুক না কেনো, নারীকে সাহায্য কেউ করে না। তো চিন্তার পরিবর্তন এর সূচনাতে তো নারীর ভূমিকা মূখ্য। তাই ভালো মন্দ যাই ঘটুক, নারীর প্রত্যক্ষ পরোক্ষ মনোভাবেের প্রভাব সন্তানের উপর থাকেই। একারণেই নারীকে দায়ী করে সমাজ, বাজে ঘটনার জন্য। আদতে ঘটনাচক্রে নারী নিজেই ভিকটিম! তার নিজের মানসই তো নিয়ন্ত্রিত হয় পুরুরষতন্ত্রের বানানো নিয়মে। তাই সবার আগে সুদ্ধি অভিযান শুরু করতে হবে নারীর চেতনার ঘর থেকে। সকল প্রতিকূলতা ভেঙে নারীকে সচেতন হতে হবে শিক্ষা, মননে, মগজে। কোনো চাপে, প্রভাবে যেন নারীর মগজ পুরুষতন্ত্র দখল করতে না পারে, নারীর প্রতি সম্মান, তার ইচ্ছেকে মূল্যায়ন করার মনোভাব যেন নারীর হাত ধরেই সন্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সূচনা হয় বৈষম্য নির্যাতনহীন সমাজের, এই চাওয়া মনেপ্রাণে। সমতার লড়াইয়ে অন্যের মুখ না চেয়ে নারী হয়ে উঠুক একক অদম্য শক্তির উৎস।

450 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।