আরবে ইসলাম আসার আগে নারীদের যথেষ্ঠ স্বাধীনতা ছিলো

বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ১৭, ২০১৯ ২:২৪ PM | বিভাগ : মুক্তচিন্তা


বিশেষত অমুসলিম ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা সেক্যুলার বামপন্থি প্রগতিশীলদের ইসলাম ধর্ম ও হযরত মুহাম্মদ সম্পর্কে কিছু ভ্রান্ত ধারণা কাজ করে। ইনারা মুহাম্মদকে যুক্তির খাতিরে তাকে ঐশ্বরিক শক্তিকৃত নিয়োগপ্রাপ্ত নবী হিসেবে বিশ্বাস করেন না ঠিক আছে, তবে এটা বলে দাবি করেন ইসলাম আরবকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। মুহাম্মদ তার সময়কালে যথেষ্ঠ আধুনিক ছিলেন। ইসলামের মধ্যে এমন কিছু ছিলো যা আসলে আরবের পুরোনো সমাজ ব্যবস্থার বদলে ওটা ছিলো সময়ের দাবি… ইত্যাদি।

তারা আরো দাবি করেন মুহাম্মদকে নবী হিসেবে নয়, একজন শাসক হিসেবে বিবেচনা করে এবং তাকে তার সময়কালে বিচার করলে তার প্রতি পজেটিভ মনোভাবই আমাদের ফুটে উঠবে…।

এরকম কথা শুনলে গা জ্বলে যাবে মুফতি মাওলানা অধ্যায়ন করতে করতে নাস্তিক হয়ে উঠা মানুষজনদের। ইসলামের অথেনটিক সব সোর্স থেকে মুহাম্মদকে জেনে তার প্রতি বিরূপ হয়ে উঠা মানুষ এরকম বক্তব্য শুনলে আপনাকে নিয়ে বিদ্রুপও করতে পারে।

প্রথম কথা হচ্ছে শেষতক ইসলাম আরবে বিজয়ী হয়েছিলো এবং তারাই ইতিহাস রচনা করেছিলো। সেই ইতিহাস তারা তাদের মন মতো করে সাজিয়েছে। অতিতের সমস্ত গৌরব, কীর্তিকে মুছে দিয়ে নতুন ইতিহাস লেখা হয়েছিলো। তবু ইসলামের আদি সোর্সগুলো থেকে যতটুকু চিহ্ন রয়ে গেছে তা থেকেই জানা যায় আরবে ইসলাম আসার আগে নারীদের যথেষ্ঠ স্বাধীনতা ছিলো।

হযরত খাদিজা বিধবা ছিলেন এবং স্বাধীন ব্যবসায়ী ছিলেন। তার মাল বোঝাই উটের কাফেলায় মুহাম্মদ ছিলেন স্রেফ একজন কর্মচারী। একজন নারীর অধীনে মুহাম্মদ চাকরি করতেন। সেই মুহাম্মদ তার নিজের বিধানে নারীকে পুরুষের অর্ধেক বলে ঘোষণা করে তাকে ঘরের ভেতর থাকার নিয়ম করেন। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ ছিলেন ইসলামের বিজয়ের আগে কুরাইশদের মধ্যে প্রভাবশালী মহিলা যার মতামত ও মুখরা স্বভাবকে সবাই ভয় পেতো। আবু সুফিয়ানকে ত্যাগ করে তিনি শেষ বয়েসে একাই জীবন কাটান। এখানেও দেখা যাচ্ছে ইসলামের আগে আরবে নারীর একটা স্বাধীন সত্ত্বা ছিলো। তাহলে কেমন করে ইসলাম আরবকে নতুন বসন্ত এনে দিয়েছিলো? কেনোই বা শরীয়া শাসিত আরব কাতার থেকে আজো মেয়েরা পালাতে পারলে বাঁচে?

আবার কেউ কেউ বলেন, ইসলামের মধ্যে এমন একটা ভ্রাতৃত্ববোধ, জাতপাতহীনতা ছিলো যে মুহাম্মদ যখন ইসলামের এই বাণী ছড়াতে লাগলেন তখন আরবে একটা হৈ চৈ পড়ে গেলো। এমনকি পরবর্তীকালে যখন ভারতবর্ষে সুফিরা আসতে লাগলো তখন জাতপাতে অতিষ্ঠ হিন্দুরা ইসলামের উদারতা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলো…।

শ্যামাপ্রসাদ বসুর লেখা একটা বই আছে ‘ওয়াহাবী থেকে খিলাফত- একটি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অধ্যায়’। বামপন্থি এই লেখক মুসলমানদের এই সমস্ত জিহাদী আন্দোলনকে পক্ষান্তরে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন। প্রকৃত তথ্য হচ্ছে ইসলাম প্রচারের প্রথম ১৩ বছর মুহাম্মদের ডাকে আরবে কোনো সাড়াই পড়ে নি। ১৩ বছরে মাত্র শ’খানেক লোক তার আনুগত্যা মেনে নিয়েছিলো। এরা সবাই ছিলো সমাজচ্যুত ভবঘুরে গরীব অনাথ লোক। চরম হতাশায় মুহাম্মদ ডুবে গিয়েছিলো এই সময়ে।

তাহলে কিসের টানে পরবর্তী দশ বছরে লোকজন বাড়তে লাগলো মুহাম্মদের দলে? মক্কায় মুহাম্মদের অনুসারীদের জীবন অভাব-অনটনে প্রায় স্থবির। সিদ্ধান্ত হলো মক্কার মুসলমানরা (মুহাম্মদের অনুসারীরা) মদিনায় গিয়ে আশ্রয় নিবেন এবং এতে তাদের নব দীক্ষিত ভাইরা তাদের সহযোগিতা করবেন। এরপরই শুরু হবে কুরাইশদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা। এ কারণেই এই বায়য়াতকে “বায়য়াতুল হারব” বা “সামরিক অঙ্গীকার” বলে ডাকা হয়।

মদিনার পূর্ব নাম ইয়াসরিব। এই দেশ মূলত ইহুদীদের হাতে গড়া। তাদের প্রতিবেশী আরব যারা ধর্মে পৌত্তলিক তাদের দেশ ছিলো আসলে ইয়ামানে। ইয়ামানের ইতিহাসে ভয়াবহ বন্যায় যে ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছিলো তাতে তারা শরণার্থী হয়ে আশেপাশের দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। মদিনায় ইহুদিদের প্রতিবেশীরা তাদেরই বংশধর। তাদেরকেই ইসলামের ইতিহাসে ‘আনসার’ বলা হয় যার অর্থ সাহায্যকারী অর্থ্যাৎ তারা নবী মুহাম্মদকে সাহায্য করেছিলো। অন্যদিকে ইহুদিরা গোটা আরব ভূখন্ডে এসে জড়ো হয়েছিলো মূলত তাওরাতে ঈশ্বরকৃত তাদের দানকৃত দেশে বসবাস করতে (বাইবেল দেখুন: http://biblehub.com/deuteronomy/1-8.htm)।

এই তাওরাতের ঈশ্বরই নাকি মুহাম্মদকে নবী মনোনীত করেছেন। যদিও আরবদের কাছে ‘আল্লাহ’ নামের যে ঈশ্বর পুজিত হতো তার সঙ্গে ইহুদী-খ্রিস্টানদের ঈশ্বরের কোনো সম্পর্ক ছিলো না। বরং ওজ্জা দেবীর বাবা আল্লাহ তাওরাতের জিহোবার চেয়ে অনেক শান্তিপ্রিয়। ইহুদীরা তাওরাতের নির্দেশ পেয়ে অত্যন্ত নির্মমভাবে আজকের ইজরাইল ও আশেপাশের অঞ্চলগুলো দখল করে নেয় স্থানীয়দের তাড়িয়ে এবং কাজটি ঘটে নবী ইব্রাহিম, দাউদ, ইসহাকের ঈশ্বরের রক্তলোলুপ উশকানিতে। যাই হোক, ধর্মীয় কিতাবের সার্টিফিকেট দেখিয়ে ইহুদীদের শক্ত অবস্থান এই অঞ্চলে থাকলেও তারা কখনই পরবর্তীকালে অন্যের জন্য হুমকি ছিলো না। কৃষিজীবী ইহুদীরা তাদের প্রতিবেশীদের উচ্ছেদ করেছে কয়েক শতাব্দীতে এরকম কোনো নজির নেই। বরং নবী মুহাম্মদ যখন মদিনায় পৌছান তখন আনসারদের মতো ইহুদীরাও তাকে স্বাগত জানিয়েছিলো। তখন ইহুদীদের যে প্রভাব ছিলো তারা বৈরী হলে আনসারদের পক্ষে একজন বিদেশীকে তার শ’খানেক অনুসারীসহ আশ্রয় দিতে পারতো না। মদিনায় নবী মুহাম্মদ নিজের জন্য ঘর ও মসজিদ বানাতে যে জমি ব্যবহার করেন সেটিও ইহুদীদের দানকৃত। এর জন্য ইহুদীরা কোনো অর্থ নেয় নি।

শুরুতে মুহাম্মদকে ইহুদীরা পছন্দই করতো। মুহাম্মদও ইহুদীদের অনেক প্রশংসা করতেন। মদিনার ইহুদীরা মহরম মাসের ১০ তারিখ রোজা রাখে জেনে তিনিও সেই মোতাবেক রোজা রাখা শুরু করেন। কিন্তু মক্কার ক্ষমতা ও সমগ্র অঞ্চলের শাসন দখল করতে প্রতিনিয়ত তাকে কঠোর হতে হয়। তাবলিগি ধর্মপ্রচারকের খোলস ছেড়ে দ্রুতই একজন সেনাপতি হয়ে উঠেন মুহাম্মদ।

মদিনায় পাকাপাকি চলে আসার পর নবী মুহাম্মদ যে বড় সমস্যা পড়েছিলেন তার অন্যতম ছিলো মক্কা থেকে আগত শ’দেড়েক অনুসারীর খাওয়া-পরা নিয়ে। মক্কা থেকে এরা এসেছিল খালি হাতে। অবশ্য মক্কাতেই এদের শোচনীয় অবস্থা ছিলো। শুরুতে মদিনার ‘আনসারা’ এইসব ‘মোহাজেরদের’ থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করলেও আজীবন এদের ভারণপোষণ করা সম্ভব ছিলো না। নিজদের কোনো সম্পদ ছিলো না যা দিয়ে নিজের পায়ে এরা দাঁড়াতে পারে। পরাশ্রয়ী এইসব লোকের মদিনায় আসার স্রোতও দিনকে দিন বাড়ছিলো। যারাই খবর পাচ্ছিলো মদিনায় গিয়ে মুহাম্মদের দলে নাম লেখালেই খাওয়া পরা নিশ্চিত -তখন মক্কা থেকে এই সকল লোকদের আসা দিনকে দিনই বাড়ছিলো। এর দরুণ মদিনায় শরণার্থীদের চাপে অথনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হবার পথে চলে গিয়েছিলো। এরকম সময়ে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ (রা.) যিনি মক্কা থেকে এসেছিলেন হিযরত করে, তিনি নাখলাহ নামক জায়গায় গিয়ে শোনেন এই পথ দিয়ে মক্কায় একটি বাণিজ্য বহর যাবে। জাহাশ তার দলবল নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন এই বাণিজ্য কাফেলায় হামলা করে লুট করা হবে। কিন্তু কুরাইশদের বিশ্বাস ছিলো রজব মাস হচ্ছে হারাম মাস -এ মাসে কোনো রকম যুদ্ধ বা হানাহানি করা নিষেধ। এ নিয়ে একটা দ্বিধা কাজ করছিলো জাহশদের। কিন্তু এই বাণিজ্য বহর হামলা চালিয়ে নিজেদের কব্জায় নিতে পারলে বিপুল পরিমাণ সম্পদ তাদের হাতে চলে আসবে। এই লোভ সামলানো কঠিন। যারা খেতে পাচ্ছে না, সহায় সম্বল নেই, অন্যের দয়ায় জীবন চালাতে হয় তাদের পক্ষে চুরি-ডাকাতির সহজ সুযোগ চলে আসছে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া কঠিন। শেষে হামলা চালানোই সিদ্ধান্ত হলো। সিদ্ধান্ত মতে আগে থেকে ওঁত পেতে থেকে মুসলমান বাহিনী বাণিজ্য কাফেলায় হামলা চালিয়ে একজনকে হত্যা করে মালামাল লুটপাট করে মদিনায় চলে আসে। এটাই ইসলামের ইতিহাসে প্রথম ‘গণিমতের মাল’ এবং মুসলমানদের হাতে প্রথম হত্যা ও আটকের ঘটনা। নবীর কাছে মালামাল নিয়ে আসার পর তিনি বলেন, আমি তো নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ (?) করতে বলি নি। কিন্তু মালামাল ফিরিয়ে দেয়া বা গ্রহণ না করার কোনো ব্যবস্থা না করে তিনি নিজেদের মধ্যে তা বন্টন করে দেন। এখানে যে বিষয়টা লক্ষ্য করার যে, নবী কিন্তু পৌত্তলিকদের নিষিদ্ধ মাসের মতো একটা কুসংস্কারকে মান্য করে চলছেন। শুধু তাই নয় যখন মক্কার পৌত্তলিকরা নিষিদ্ধ মাসে মুহাম্মদের লোকজন হামলা চালিয়েছে বলে চরম সমালোচনা শুরু করেছিলো তখন কুরআনে আয়াত নাযিল হয় -“পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে লোকে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে। বলো, তাতে যুদ্ধ করা ভীষণ অন্যায়। কিন্তু আল্লাহর পথে বাধা দান করা, আল্লাহকে অস্বীকার করা, মসজিদুল হারামে বাধা দেয়া এবং তার বাসিন্দাকে তা থেকে বহিস্কার করা আল্লাহর কাছে তদপেক্ষা বড় অন্যায়। ফেতনা হত্যা অপেক্ষা ভীষণ অন্যায়” ( সূরা বাকারা, আয়াত ২১৭ )।

অর্থ্যাৎ খোদ আল্লাহই কথিত নিষিদ্ধ মাসকে মান্য করছেন যা পৌত্তলিকদের বিশ্বাস ছিলো এবং বলছেন এ মাসে যুদ্ধ করা ভীষণ অন্যায়। কিন্তু এই আয়াতে যে অনৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ নিষিদ্ধ মাসে হামলা করার অন্যায়কে জাস্টিফাই করছেন কুরাইশদের করা একটা অন্যায়কে দিয়ে! এ কেমন কথা! এ কেমন ঈশ্বর যিনি একটা অন্যায় হয়েছে স্বীকার করে বলছেন তারচেয়ে বেশি অন্যায় অন্যরা করেছে? এরকম যুক্তি তো কেবল মানুষের পক্ষেই সম্ভব। মানুষই একটা অন্যায় করে নিজের অন্যায়কে অন্যের অন্যায় দিয়ে তুলনা করে নিজের অপরাধকে লঘু করার চেষ্টা করে। সেটাই এখানে ঘটেছে আসলে। কিন্তু এসব যুক্তি যদি আল্লাহ তার আয়াত দ্বারা প্রতিষ্ঠা করেন তাহলে আর যুক্তিতর্কের কোনো প্রশ্ন আসে না। বিশ্বাসীরা সেটাকেই সর্বোচ্চ নৈতিকতা বলে মনে করে। তাই মদিনার এই হামলাকে একটা নৈতিকতার সার্টিফিকেট দিয়ে মুসলমানদের লুটপাটে উৎসাহিত করা হলো।

মদিনার এই ছোট্ট হামলাটি ছিলো ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম মাইলফলক। এর মধ্য দিয়ে দাওয়াতি ইসলামের পরিবর্তে গায়ের জোরে ইসলাম প্রচারের সূচনা ঘটে।

আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ (রা.) এই হামলার পর মুসলমানদের জন্য দ্বিতীয় হিজরীর শাবান মাসে জিহাদ ফরজ বা অবশ্যই পালনীয় করা হয় কুরআনের সূরা বাকারা ১৯০-৯৩ আয়াত দ্বারা। বস্তুত ধর্ম প্রচারের পরিবর্তে মক্কার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ইসলাম আর কোনো ধর্ম থাকে নি, পুরোটাই রাজনৈতিক একটি সশস্ত্র অভিযানে পরিণত হয়। মক্কার কুরাইশরা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ভীত হয়ে উঠেছিলো। সিরিয়া থেকে বাণিজ্য কাফেলা মক্কায় যাবার একমাত্র পথ মদিনার পাশ দিয়েই যেতে হবে। সেখানে মুহাম্মদের বাহিনী তাদের জন্য নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠলো। এই লুটপাট বেড়ে যাবার পেক্ষাপটই বদর যুদ্ধের একমাত্র কারণ ছিলো। মুসলমানরা বাণিজ্য কাফেলায় হামলা করাকেও জিহাদ বলতো। আর এই জিহাদ যখন প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ হয়ে গেলো তখন মদিনার অবস্থাসম্পন্ন লোকজন একে অপছন্দ করতে শুরু করলো। আড়ালে কেউ কেউ এইসব হামলার সমালাচনা শুরু করেছিলো। মদিনার আনসাররা অভাবী ছিলো না। কৃষিকাজ ও ব্যবসা বাণিজ্য করে অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থ মদিনাবাসী রাতের আঁধারে মক্কার বাণিজ্য কাফেলায় হামলাকে মেনে নিতে পারছিলো না। মদিনার স্থানীয় অধিবাসীদের এই হামলা-লুটতরাজে অনিহা দেখে কুরআনে আয়াত নাযিল হয়- “অতঃপর যদি দ্ব্যর্থহীন কোনো সূরা অবতীর্ণ হয় এবং ওতে জেহাদের কোনো নির্দেশ থাকে, তুমি দেখবে যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, তারা মৃত্যু ভয়ে বিহ্বল মানুষের মতো তোমার দিকে তাকাচ্ছে। শোচনীয় পরিণাম ওদের” (সূরা মোহাম্মদ, আয়াত ২০ )।

মুহাম্মদ তখন আর কোনো নবী নন। আগে তিনি মক্কা থাকাকালে নিজেকে কেবল একজন সতর্ককারী বলে দাবী করতেন। তার দ্বিন গ্রহণের জন্য কাউকে জোরাজোরি করতেন না। কেউ তাকে অপমান করলে পরকালে আল্লার কাছে তার সাজা চাইতেন। কিন্তু এখন তিনি মুসলমানদের সশস্ত্র জিহাদ (হামলা) করতে নির্দেশ দিচ্ছেন।

এ সময়ে ৬১৪ হিজরীতে হঠাৎ করে নামাজের কিবলা বাইতুল মোকাদ্দেস থেকে সরিয়ে মক্কার কাবাঘর বরাবর করা ছিলো নবীর রাজনৈতিক অভিলাষের পরিস্কার ইশারা। এতদিনে ইহুদীরা তাকে নবী হিসেবে মেনে না নেওয়ায় তিনি বুঝে গিয়েছিলেন ইহুদী-খ্রিস্টানরা একজন আরব পৌত্তলিককে কখনো নবী হিসেবে মেনে নিবে না। বাইতুল মোকাদ্দেস ইহুদীদের পবিত্র মন্দির। সেখান থেকে মক্কার পৌত্তলিকদের মন্দির কাবাঘর বা বাইতুল্লাহকে কিবলা করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তার লক্ষ্য মক্কা দখল করা। ঘটনা প্রবাহ তাই দ্রুত ঘটে যাচ্ছিলো।

আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে কুরাইশদের বিরাট বাণিজ্য কাফেলা হামলার চেষ্টা বদর যুদ্ধকে অবধারিত করে তোলে। শুরু হয় আরবের বুকে এক ভ্রাতৃঘাতি রক্তপাতের ইতিহাস। পিতা তার পুত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। স্বজনের হাতে স্বজনের রক্তে লাগে। মক্কার অলিতে গলিতে নারীদের বুক চাপড়ে আহাজারি ক্রমশ ভারী হতে থাকে। মদিনার ইহুদীরা যারা একদা নবীকে জমি দান করেছিলেন বসবাস করতে তাদের নির্মম পরিণতি অনেকটাই চাপা পড়ে যায় মক্কার কথিত সাধারণ ঘোষণার আড়ালে। বস্তুত মক্কা দখল রক্তপাতহীন ছিলো না। খালিদ বিন ওয়ালীদের তলোয়ার রক্ত পিপাসু পিশাচের মতো মক্কার অলিগলি চষে বেড়ায়। রক্তপাত ও সাধারণ ঘোষণা (ইসলাম গ্রহণের শর্তে) দ্বৈত নীতিতে মক্কা দখল হয় মুসলমানদের হাতে। শুরু হয় ইসলামী শাসনের এক নয়া যুগ।

লুটপাট বা ডাকাতির মালের ভাগ পাওয়া যে ছিলো জিহাদে যোগ দেয়ার আরো একটি প্রধান কারণ সেটি জানা যায় ইবনু উমারের বর্ণনা থেকে। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ (সঃ) এবং সাহাবীগণ (রধিঃ) এক বেদুইনের তাঁবু অতিক্রম করছিলেন। বেদুইন তাঁবুর এক পাশ উঠিয়ে বললেন, “এ লোকেরা কারা?” কেউ একজন বললো, “রসুলুল্লহ (সঃ) এবং তাঁর সাথিরা যুদ্ধের জন্য যাচ্ছেন।” সে প্রশ্ন করলো ‘তারা কি সম্পদ পাবে?’ কেউ একজন বললো ‘হ্যাঁ তারা যুদ্ধলব্দ সম্পদ লাভ করে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। ‘সে তৎক্ষণাৎ তাঁর শক্তিশালী উটের কাছে গেলো, এর পায়ের সাথে রশি বাঁধলো এবং রসুলুল্লহ (সঃ) ও তাঁর সাথীদের সাথে যোগ দিলো। সে চেষ্টা করছিলো তাঁর উটটি রসুলুল্লাহ (সঃ) এর নিকটে আনার। কিন্তু সাহাবিরা বাঁধা দিচ্ছিলেন। এরপর রসুলুল্লাহ (সঃ) বললেন নিজেদের ব্যক্তিকে আমার নিকট আসার অনুমতি দাও। আল্লাহর শপথ এ ব্যক্তি জান্নাতের রাজাদের মাঝে একজন।

এই হচ্ছে কাহিনী। এ কাহিনী ইসলামের নিজের লেখা ইতিহাস। এখান থেকে ইসলাম ও মুহাম্মদকে পজেটিভ মনে হলে হিটলারকেও নানা ধানাই পানাই করে পজেটিভ হিসেবে কেউ না কেউ দেখাতেই পারবে!


  • ৯৭৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সুষুপ্ত পাঠক

বাংলা অন্তর্জালে পরিচিত "সুষুপ্ত পাঠক" একজন সমাজ সচেতন অনলাইন একটিভিস্ট ও ব্লগার।

ফেসবুকে আমরা