মো. আব্দুল মতিন

প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, শাহজালাল মহাবিদ্যালয়, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলার শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ ২০১৭।

এত ব্যথা! সংবাদপত্রে নারী সাংবাদিকতা

সংবাদপত্রে মানুষের সুখ- দুঃখ, সংস্কৃতির সার্থক প্রতিফলন ঘটে। মানবতার সংকটে আলো দিয়ে পথ দেখিয়ে ভরসা দেখায় সংবাদপত্র। বিশেষভাবে নারীদের অধিকার, বৈষম্য, কৃতিত্ব ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে নির্দয় পৃথিবীর দয়ার বন্ধু সংবাদপত্র। কিন্তু সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল, এফএম রেডিও, কমিউনিটি রেডিও, অনলাইন মিডিয়া সবখানে নারীদের দৃপ্ত পদচারণা। এর ভেতরে কিছু নারী সংবাদ কর্মীর সহাস্য উপস্থিতি যে সংবাদপত্রে বিভিন্ন ভাবে জড়িত নারীদের সুন্দর অবস্থান বুঝায় না তার একটি বাস্তব চিত্র পেলাম; জীবনের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা চরম ক্ষোভ, বৈষম্য, নিষ্ঠুর চাকরিচ্যুতির ১৭ বছরের অভিজ্ঞতার বাস্তব কথনে ভরে দিয়েছেন লেখক ও সাংবাদিক সানজিদা তাঁর 'সাংবাদিকতায় ১৭ বছর' বইয়ের পাতায় পাতায়।একজন নারী সংবাদকর্মীর কাছে প্রতিনিয়ত মনে হয়েছে পুরুষ হচ্ছে মানুষ আর নারীরা হচ্ছে মেয়ে মানুষ। সংবাদপত্র নামক আলোর নিচের অন্ধকারের স্বরূপ ভেদ করে দাম্পত্য ভালোবাসার ক্ষীণ আলোয় অন্ধকারের বিশালতায় দূর্বীসহ জীবনকে পঁচা গর্ত থেকে উদ্ধার করে পাঠকের মুখোমুখি দাঁড় করান লেখিকা। এ যেন আফ্রিকার এপিক ড্রামা 'ক্রাই ফ্রিডম'। একদেশ, এক আকাশ,  এক ভাষা হলেও পেশা ভিত্তিক সংগ্রাম ভিন্ন; আবার সংগ্রামে, বৈষম্য এক হলেও জেন্ডার ভেদে তার  আর্তনাদও ভিন্ন হয়। গতবার জনপ্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল পত্নী ইয়াসমিন হকের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় জড়িত জীবন নিয়ে লেখা 'সাস্টে ২২বছর' বইটির মতো এখানে 'সাংবাদিকতা পেশায় ১৭ বছর' এ জীবনের জোয়ার- ভাটায় আছড়ে পড়া জীবন দিয়ে পাঠককে নতুন জীবনের সন্ধান দিতে চেয়েছেন তারুণ্যদীপ্ত এই লেখিকা; যা এই পেশায় যারা আসবেন তাদের দারুণ কাজে লাগবে। লেখিকা সানজিদা সুলতানা জীবনের বাস্তবতায় কেনিয়ার মাসাই উপজাতির লোকদের মতো বুঝতে পারেন, 'যা তুমি তোমার মায়ের কাছ থেকে শিখো নি, সেটা পৃথিবী থেকে শিখো' কিংবা 'অগণন নারী অসংখ্য দেশে, অভিন্ন ভাষায় কথা বলে নিরবতা'। 

রবি ঠাকুরের কথা, 'একগ্লাস জল পান করা যায়, কিন্তু একটা আস্ত সমুদ্র পান করা যায় না’। ২০০০ সালের ১২ জুন আজকের কাগজ পত্রিকায় সহ সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়ে সংবাদকর্মী হিসেবে জীবন শুরু করেন। এখানে সাত বছর পার করে কর্মজীবনে বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেন। নারী সাংবাদিক হিসেবে বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করতে গিয়ে অন্যায়, অবিচার, চাকরিচ্যুতি, জীবনের অনিশ্চয়তার হাহাকার, সাংবাদিক রাজনীতি, বিজয়, বিড়ম্বনা, বকেয়া বেতনের জন্য আন্দোলন- সংগ্রাম, সংসারে চাকরির ক্ষেত্রে সৃষ্ট বাধা- ভয়ভীতি, সহকর্মীদের সহযোগিতা-অসহযোগিতা, লিঙ্গবৈষম্য, আর্থিক সংকটের দিনগুলো, প্রেসক্লাবে  সদস্যপদ রাজনীতি শেষে বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশের পরবর্তী নারী সাংবাদিকতার পথিকৃত আখতারুজ্জামান বেবী, নাদিরা মজুমদার, তাসমিমা হোসেনের স্মৃতিধন্য দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় সততাও নিষ্টার সাথে কর্মরত।প্রথম চাকরির বেতনের অংক শুনার পর বড় ভাই বলেছিলেন, 'এই কয়টা টাকার জন্য মহাখালি যাবার কোনো দরকার নেই। প্রতিমাসে এই টাকা আমার কাছ থেকে নিও'। তারপর মাকে বুঝিয়ে রাজি করিয়ে পত্রিকায় কাজ করার ইচ্ছে পূরণ শুরু করলেন। তাঁর কাছে বেতনটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না; স্বপ্ন পূরণের আনন্দ ছিলো বড়। এখান থেকে বড় বড় সাংবাদিকদের সাথে থেকে তাঁর শেখার শুরু। 

স্বভাবে স্বল্পভাষী কিন্তু প্রখর অন্তর্দৃষ্টির এই লেখকের কাছে দায়িত্বপালন সবসময়ই ছিলো গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকে  প্রথম চাকরির প্রস্তাব পেলে তিনি তা ফিরিয়ে দিয়ে 'আজকের কাগজ' ছেড়ে যাবার কথা ভাবতে চান না। সংবাদকর্মী হিসেবে তাঁর নেশায় তিনি বিভোর। এর মধ্যে আমেরিকান পাত্রের সুখী দাম্পত্য জীবনের স্বপ্নের প্রস্তাব আসে বাংলায় অনার্সসহ মাস্টার্সধারী এই লেখিকের জীবনে। তাঁর উত্তর 'দেশ ছেড়ে আমি কোথাও যেতে চাই না'।

একদিন তিনি অফিসে গিয়ে প্রথম ভয় পেলেন; আগের রাতে একসঙ্গে ৮৫ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে দেখে। চাকরিচ্যুত অনেক সহকর্মীর অবস্থা সেদিন নিজ চোখে দেখে ভবিষ্যত চিন্তা করেন নি; পথ হারান নি সাংবাদিকতা জীবনের। দৈনিক যুগান্তরের তৎকালিন সাবএডিটর, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতককোত্তর ডিগ্রিধারী মুস্তফা মনওয়ার সুজনের সাথে ২০০৫ সালের ২০ মে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই সুত্রে তাঁরা সাংবাদিক দম্পতি। লেখককে একারণেও এক কর্মক্ষেত্রে অহেতুক যন্ত্রণা পোহাতে হয়েছে। আজকের কাগজে থাকা কালে অনবদ্য এক স্মৃতিচারণ করেছেন লেখক। সম্পূর্ণ অকারণে তিনি তাঁর ইনচার্জ এর কাছ থেকে কোনো এক সময় রূঢ় আচরনের শিকার হন। তখন উপ সম্পাদক বিষয়টি জেনে তাঁকে যখন বলেন, "তোর কী এই মুহূর্তে কাউকে চড় মারতে ইচ্ছে করছে"? তারপরও তিনি তাঁর ইনচার্জ এর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না না করে ক্ষমা করে দেন সর্বংসহা ধরিত্রীর মতো। গল্পে, চলচ্চিত্রে হাজার বছর ধরে নারীর চোখের জল দেখেছি। কিন্তু জীবনের বাস্তবতায় স্পর্শ করা কষ্টের রঙ-রূপ দেখার ১৭ বছরের অভিজ্ঞতা আমি এই প্রথম পড়লাম; যেখানে অতি কথন দেখি নি; দগদগে মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে ব্যক্তিগত জীবনকে বই আকারে বাজারে বিক্রির করার অপচেষ্টাও মনে হয় নি ৬৪ পৃষ্টার বইয়ের কোথাও। নারী-পুরুষ মানুষ হলেও পেশাভেদে যান্ত্রিক হয়ে যাওয়া মানুষের কষ্টের ভিন্নতা এই সমাজে  যেমন পৌঁছায় না; তেমনি প্রতিষ্ঠানভেদে মালিকদের সেসব দেখার বা শোনার আগ্রহও নেই। অথচ কারো সেই না দেখা কষ্টগুলো ব্যক্তি বয়ে বেড়ান বয়সের কাঁধে নিয়ে; লিখতে বসলে হয়ে ওঠে কয়েক ফর্মার একেকটি বই; কষ্টের জরায়ুর বেদনা প্রসবের প্রসূতি।যারা সাংবাদিকতার মতো মহান পেশায় জড়িত; যাদের কলমের খোঁচায় মানুষ বিখ্যাত, কুখ্যাত হয়ে ওঠেন; তাঁদের ভেতরের জীবন-জগৎকে প্রকাশ তাঁরা না ছেপে হৃদয়ে লুকিয়ে রাখেন দিনের পর দিন; যারা জেন্ডার নিয়ে জাতির সামনে মেসেজ পৌঁছানোর কাজ করেন সযতনে, তাঁদের খোপে বাস করা লিঙ্গবৈষম্য চলে নিরব ঘাতকের মতো। 

সারা দেশ ও বিশ্বে সবখানে নারীর জয়-জয়কারের মধ্যে একজন নারীসংবাদকর্মী খবর তৈরি করা সংবাদের ভেতরের জীবনের খবর আমাদের শুনিয়ে দেন অন্য শিরোনামে। তিনি রূপকে গল্প, উপন্যাস না লিখে একদিকে কর্মক্ষেত্রের সুখ- দু:খ, বেদনা- বৈষম্যের ভীড়ে নিজের জীবনী সুক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। পুরুষতান্ত্রিকতার তাবিজ কবজের দোহাই ছিন্ন করে একজন নারী সাংবাদিক মানুষের মতো মাথা উঁচু করে এগিয়ে যান কর্মক্ষেত্রে। তাঁর চলার পথে যারা সহযোগিতায় কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করেছেন প্রয়াত সাংবাদিক নেতা আলতাফ মাহমুদ, বাংলাদেশ জার্ণাল পত্রিকার সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান সরদারসহ আত্মীয়, শুভাকাঙ্খীদের নাম তিনি সগর্বে বলেছেন। সাংবাদিক স্বামী সুজনের দেয়া সাহসে তিনি কলম ধরেন 'সাংবাদিকতায় ১৭ বছর' লিখতে। অনেক কষ্টের মুখোমুখির ভিড়ে  সন্তান 'অমিয়া' পৃথিবীতে সুখের বার্তা নিয়ে আসে। যদিও অমিয়াকে টাকার অভাবে ভালো খেলনা কিনে দেবার অক্ষমতার দিনগুলোর স্মৃতি পীড়িত করেছে হৃদয়ে। 

তিনি এবং তাঁর সাংবাদিক স্বামীকে রাজনীতি করার অপরাধে স্বামী-স্ত্রী দু’জনকে চাকরিচ্যুত করে নিষ্ঠুর আনন্দে মেতে ওঠেন কিছু সংবাদকর্মী। দু’জনের জীবন যাপনের পথরুদ্ধ করে দেয়ার মতো অমানবিক ঘটনায় পাঠকের চোখে অল্প সময়ের জন্য হলেও কষ্টের জল এনে দেয় অজান্তে। লেখক তাঁর বইয়ে জীবনের উচ্ছ্বাস, আনন্দ-বেদনার নেপথ্যে  চাচা বীর মুক্তিযোদ্ধা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এম মালেক এর ঋণ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেছেন। সানজিদা সুলতানার 'সংবাদপত্রে ১৭ বছর' বইটির শেষ তিনটি অধ্যায় 'প্রেসক্লাবে সদস্যপদ নাটক, 'সাংবাদিক দম্পতির ভালো মন্দ', 'আলতাফ মাহমুদ  স্মরণ' এর মাধ্যমে বইটি শেষ করেছেন। বইটি সংবাদপত্রে কর্মরত নারীদের জন্য একটি দলিল হিসেবে গৃহীত হবে; সাথে সাংবাদিক দম্পতির জীবন ও পরিবার সম্পর্কে একটি প্রাক কথন পাঠককে সমৃদ্ধ করবে। পুরাতন সংবাদপত্রের পাতার মতো জীবনে কর্মরত পত্রিকাগুলোর নামে হলুদের প্রাধান্যের প্রচ্ছদ করেছেন রফিক উল্লাহ এবং প্রকাশনা করেছে 'উৎস  প্রকাশন'। লেখক-সাংবাদিক সানজিদা সুলতানা’র বইটির মূল্য ১০০ টাকা। 

1417 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।