ফাতিমা মেরনিসি: আরব বিশ্বের নারীবাদী বহ্নিশিখা

শনিবার, জুন ৬, ২০২০ ১২:১৩ AM | বিভাগ : সীমানা পেরিয়ে


৩০ নভেম্বর ২০১৫ মরক্কোর রাজধানী রাবাতের একটি ক্লিনিকে ক্যান্সারে ভুগে পরলোকগত হয়েছেন বিশিষ্ট ইসলামী নারীবাদী এবং সমাজবিজ্ঞানী ফাতিমা মেরনিসি। ১৯৪০ সালে মরক্কোর ফেজ টুপিখ্যাত ফেজ শহরে জন্ম। ধনাঢ্য ভূস্বামী পরিবারে জন্ম হওয়ার কারণে মরক্কোর অধিকাংশ নাগরিকের মতো দারিদ্র্যকে হয়তো শৈশব থেকে চিনতে হয় নি ফাতিমার, তবে কন্যাশিশু হিসেবে ছোটবেলা কেটেছে হারেমে। ফেজ নগরীতে বাবার বাসার হারেম (অন্তঃপুর যেখানে পরিবারের মেয়েরা থাকে) বা গ্রামে মাতামহীর বাড়ির হারেম... আরব দেশের বা বৃহত্তর অর্থে প্রাচ্যের কন্যাশিশুর জায়গা তো বরাবরই হারেম বা অন্তঃপুর। অবশ্য পশ্চিমের চোখে হারেম বলতেই যেমন পূর্বের কামুক রাজা-বাদশার জন্য অসংখ্য নারী ভোগের বন্দোবস্তি মনে করা হয়, মেরনিসি যে হারেমে বাস করেছেন তা পূর্বের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই চেনেন। এই হারেম হলো সাধারণ গৃহস্থ বাড়ির অন্তঃপুর, যেখানে সনাতনী কায়দায় যৌথ পরিবারগুলো বাস করে এবং সেখানে নারীরা মূলত বাড়ির বাইরের অনাত্মীয় পুরুষের সামনে বের হয় না। কখনও কখনও পর্দার এই কড়াকড়ি শিশু ফাতিমাকে ব্যথিত করেছে, আবার কখনও তারই মতো অসংখ্য অবরোধবাসিনীর প্রতি নারীবাদী ভগি্নত্ববোধে উজ্জীবিত করেছে। হয়তো শৈশবের এই আবহই পরবর্তী জীবনে প্রাচ্য বিশেষত আরব এবং ইসলামী জীবনে নারীর অবস্থান নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ, গবেষণা এবং মূল্যায়নের জীবনভর কাজে ফাতিমাকে উদ্বুদ্ধ করেছিলো।

শৈশবের একটি বড় সময় ফাতিমার মাতামহীর বাসায় কেটেছে, যে মাতামহী ছিলেন তার মাতামহের নয় স্ত্রীর একজন। তবে ফাতিমার বাবা একনিষ্ঠ স্বামী ছিলেন, ফাতিমার মা ব্যতীত অন্য কোনো নারীর পাণি গ্রহণ করেন নি। মজার বিষয় হলো, ফাতিমার প্রাথমিক শিক্ষা কিন্তু মাদ্রাসায়। তবে প্রগতিশীল এবং জাতীয়তাবাদী পিতা পরে মেয়েকে জাতীয়তাবাদী এবং সেক্যুলার স্কুলে ভর্তি করেন। মরক্কোর পঞ্চম মোহাম্মদ বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডিগ্রি নেওয়ার পর প্যারিসের সরবোর্ণে বৃত্তি পেলেন। সেখান থেকে গেলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রান্দেইস বিশ্ববিদ্যালয়ে। ব্রান্দেইসেই সমাজবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন ফাতিমা। উচ্চতর শিক্ষার শেষে ফাতিমা মরক্কোতে ফিরে রাবাতের পঞ্চম মোহাম্মদ বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানে অধ্যাপনা শুরু করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৪-৮১ অবধি পরিবার সমাজবিদ্যা, মনোসমাজবিদ্যা এবং গবেষণা মেথোডলজি পড়িয়েছিন তিনি। এ ছাড়া হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায় ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর দশজন শিক্ষকের মতো শুধু ছাত্র পড়িয়ে দায়িত্ব শেষ করেন নি ফাতিমা। দু'হাতে লিখেছেন আরবি, ফরাসি এবং ইংরেজি ভাষায়, বক্তৃতা দিয়েছেন পৃথিবীর নানা দেশে। ফাতিমার লেখা এজন্যই বিশিষ্ট বা অনন্য যে, গভীর প্রাজ্ঞতার সঙ্গে তিনি ইসলামী শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছেন এবং কোরান-হাদিসের নিবিষ্ট পাঠের মাধ্যমে ইসলাম এবং গোটা আরব বিশ্বে নারীর অবস্থান নিয়ে নিরন্তর লিখে গেছেন।

প্রথম গ্রন্থ বিয়ন্ড দ্য ভেইল : মেল-ফিমেল ডাইন্যামিক্স ইন আ মডার্ন মুসলিম সোসাইটি (১৯৭৫), মেরনিসি নারীর যৌনতা বিষয়ে সনাতনী পশ্চিমা এবং মুসলিম মূল্যবোধের পার্থক্যগুলো পরখ করেছেন, প্রাচ্যে নারীর প্রতি নিপীড়নের সাংস্কৃতিক শেকড়গুলোর প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

এর পরের আরও দুটো বই লা হারেম পলিতিক : লো প্রফেট এ লেইস ফামস (১৯৮৭), সুলতানেস উবলিয়েস : ফামস শেফস দেতাত অ ইসলাম (দ্য ফরগটেন ক্যুইনস অব ইসলাম, ১৯৯০) নাম্নী গ্রন্থ দুটোয় ফাতিমা ইসলাম ধর্মের ঐতিহাসিক নানা সূত্র, বর্তমানে নানা মুসলিম রাষ্ট্রে বিদ্যমান গণতন্ত্রের সংকট এবং নারীর প্রতি বিদ্যমান সামাজিক নিপীড়নের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। আদি ইসলাম কি এমন ছিলো আজ যেমনটা দেখা যাচ্ছে? নাকি নারীর অনেক বেশি পরিসর স্বীকৃত ছিলো সেখানে? কারা বিকৃত করলো সেই স্বাধীনতা এমন নানা প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

শৈশবে অবরোধে থাকার অভিজ্ঞতা বিধৃত করেছেন ড্রিমস অব ট্রেসপাস : টেলস অব আ হারেম গার্লহুড (১৯৯৪)-এ। মুসলিম বিশ্বের নারী অধিকারের প্রধান প্রবক্তাদের একজন মেরনিসি ইসলামী সংস্কৃতির নানা জটিল সামাজিক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা বিষয়ে গভীর অন্তর্দৃষ্টিমূলক মন্তব্যের জন্য সুপরিচিত।

মেরনিসির প্রথম গ্রন্থ বিয়ন্ড দ্য ভেইলের কথাই ধরা যাক। নারীর যৌনতা এবং জেন্ডার বিষয়ে পশ্চিমা এবং ইসলামী মূল্যবোধের পার্থক্য এখানে পরীক্ষা করেছেন তিনি। অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে ফাতিমা বলেন যে পশ্চিমে যেখানে নারীকে যৌনতার ক্ষেত্রে অধঃস্তন এবং নিষ্ক্রিয় মনে করা হয়, ইতিহাসের পাতা অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে বরং ইসলামী শাস্ত্রের পণ্ডিতরাই নারীকে সক্রিয় এবং এক ধরনের আগ্রাসী যৌনতার অধিকারী বলে দেখছেন। পর্দা বা হারেম কি অন্তঃপুরের বিচ্ছিন্নতায় নারীকে ঠেলে দেওয়াটা মূলত নারীর যৌনতা দ্বারা সামাজিক শৃঙ্খলা যেন চূর্ণ না হয় সেই ভয়ে পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রবণতা থেকে সৃষ্ট হয়েছে।

গবেষণা কর্ম লো মাহোক হ্যাকন্তে পাহ সেস ফামস (ডুয়িঙ ডেইলি ব্যাটল : ইন্টারভিউজ উইথ মরোক্কান উইমেন-১৯৮৪)-এ ফাতিমা মরক্কোর এগারোজন নারীর সঙ্গে বিস্তারিত আলাপচারিতা ট্রান্সক্রাইব এবং সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছেন। এই এগারোজন নারী তাদের প্রতিদিনের গার্হস্থ্য জীবনের নানা সমস্যার মাঝে পরিবারের জন্য বাইরে গৃহপরিচারিকার কাজ করে হোক আর শিক্ষিকার কাজ করে হোক কীভাবে নিজেকে ক্ষমতায়িত বোধ করছেন, সে বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।

ফাতিমার দ্য ভেইল অ্যান্ড দ্য মেল এলিট গ্রন্থটি এ কারণে সবিশেষ আলোচিত যে এই বইয়ে ফাতিমা কোরান এবং হাদিস পাতার পর পাতা পড়ে এবং উদ্ধৃত করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে ইসলামের শুরুর বছরগুলোয় মহানবীর স্ত্রীগণ বা অন্য নারীরা ইসলাম এবং মুসলিমদের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ নানা কৌশলগত ভূমিকা পালন করেছেন এবং এ সময় নারীকে সম্পত্তির অধিকার বা এমনকি নৈতিক সাম্যের অধিকার পর্যন্ত দেওয়া হয়। তবে মহানবীর মৃত্যুর পর ইসলামের আদি সাম্যবাদ মুছে গিয়ে ক্ষমতা আবার আরব অভিজাততন্ত্রের হাতে সংহত হয় যে অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাই ছিলো ইসলামের আদি এজেন্ডাগুলোর মাঝে খুবই বড় একটি এজেন্ডা। এই আরব অভিজাতরাই পুনরায় ইসলাম ধর্মের মাঝে সাম্যবাদের যাবতীয় উপকরণ সফলতার সঙ্গে মুছে দিতে সক্ষম হলেন, ইসলামে নারীকে সক্রিয় সত্ত্বা হিসেবে স্বীকার করে প্রদত্ত নব অবস্থানের ফলে যে সামাজিক পরিবর্তন দেখা দিচ্ছিলো, মহানবীর মৃত্যুর পরে তা প্রতিরোধ করে নারীকে পুনরায় পর্দার অভ্যন্তরে ঠেলে পাঠানো হলো।

সুচিন্তিত এবং কঠোর পরিশ্রমী সব গবেষণা গ্রন্থের পাশাপাশি ড্রিমস অব ট্রেসপাস : টেলস অব আ হারেম গার্লহুড (১৯৯৪)-এ মেরনিসি বরং পর্দার অভ্যন্তরে যাপিত এক কন্যাশিশুর জীবনের কথা বলেছেন। তার এ গ্রন্থে হারেমকে একটি আচ্ছাদিত এবং নীরস পরিসর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে হতাশা কাটাতে তার মা এবং অন্য নারীরা কখনও নিষিদ্ধ বেতারের অনুষ্ঠান শোনেন বা বাড়ির পাহারাদারের চোখ এড়িয়ে ছাদে বেড়াতে যান। অবশ্য পরবর্তী জীবনে মেরনিসি অন্তঃপুরের বন্দিত্ব কাটাতে সফল হন। তবু শৈশবের পর্দার জীবন তার বাকি জীবনযাপন এবং রচনাকর্মকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে সে বিষয়ে এই বইয়ে তিনি বিশদ বলেছেন।

মেরনিসি প্রাচ্য বা ইসলামী সমাজের জরুরি নানা আত্ম-সমালোচনা যেমন করেছেন, তেমন পশ্চিমকে কি ছেড়ে কথা বলেছেন? নাহ্। শেহেরজাদে পশ্চিমে যায় : ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন হারেম (২০০১) গ্রন্থে মেরনিসি দেখান যে কীভাবে পশ্চিমের সমাজে নারীর মূল্য তার যৌনাবেদনেই কেন্দ্রীভূত। এটা কি এক ধরনের হারেম নয়? নারীবাদী বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক পার্থক্যকে গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

ফাতিমা মেরনিসির লেখা প্রসঙ্গে ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান ১৯৯২ সালে এই অভিমত ব্যক্ত করে যে, বর্তমান বিশ্বে প্রকাশিত নারীবাদী রচনাকর্মের ভেতর মুসলিম নারীরা সবচেয়ে বেশি চিত্তাকর্ষক লেখাগুলো লিখছে এবং এদের ভেতর অধ্যাপক মেরনিসি সর্বাগ্রগণ্য।

আজীবন ইসলামের উদারপন্থি ধারারই অনুশীলন করেছেন মেরনিসি। সমাজে নারীর ওপর লিঙ্গবাদী আধিপত্য বজায় রাখতে পুরুষ নেতারা কীভাবে ইসলামী শাস্ত্রের নানা অপব্যাখ্যা করে গেছেন মূলত সে বিষয়েই জীবনভর কাজ করেছেন ফাতিমা।

'ইসলামের পবিত্র গ্রন্থগুলোর শুধু অপব্যাখ্যাই হয় নি, বরং মুসলিম সমাজে ক্ষমতা চর্চার ক্ষেত্রে রীতিমতো কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য হিসেবে এই অপব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। যেহেতু সপ্তম শতাব্দী থেকেই যাবতীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক শক্তি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থকে সুরক্ষার জন্য ধর্মের নামে প্রচুর ভিত্তিহীন হাদিসের অবতারণা করা হয়,' মেরনিসি লিখেছেন দ্য ভেইল অ্যান্ড দ্য মেল এলিট বইটিতে।

মুসলিম নারীকে তার নিজের সমাজ যেমন বোঝে নি, আবার পশ্চিম কি খুব বুঝেছে? যেমন হারেম বলতেই পশ্চিমা সিনেমা আর চলচ্চিত্রে সিল্কের পর্দার আড়ালে রাজা-বাদশাদের প্রেমলীলা বোঝায়। অথচ সাধারণ আরব মধ্যবিত্তের জীবনে হারেম হলো আসলে অন্তঃপুর, যেখানে একটি বড় বা যৌথ পরিবারের সব নারী পর্দার নিভৃতিতে বাস করেন। এর মাধ্যমেই পূর্বের গৃহকর্তা তার স্ত্রী এবং মেয়েদের বাইরের পুরুষের নজর থেকে রক্ষা করেন।

অটোমান সাম্রাজ্যের হারেমের গল্প গোটা পশ্চিমকে মোহাচ্ছন্ন করেছে অথচ আরবের সাধারণ ঘরের হারেমগুলো মোটেই অত প্রেমলীলার কোনো জায়গা না। নারীর জন্য সেটা বরং এক নীরস পর্দার জীবন বলেই মেরনিসি মনে করেন। পর্দার কড়াকড়িতে থাকা নারীদের বাইরে বের হতে হলে বোরখা পরে এবং সঙ্গে কোনো পুরুষ আত্মীয়কে নিয়ে বের হতে হতো বলে মেরনিসি তার শৈশবের স্মৃতিচারণায় বলেছেন।

সত্যি বলতে পশ্চিমের শ্বেতাঙ্গ, ক্রিশ্চিয়ান নারীবাদীদের তুলনায় ফাতিমা মেরনিসির লেখা পূর্বের নারী হিসেবে আমাদের পক্ষে দ্রুততার সঙ্গে বোঝা সম্ভব হয়। তিনি যখন বলেন যে, হারেম হলো নারীর প্রতি নানা বিধি-নিষেধের সমষ্টি এবং একজন নারী যখন জানে যে তার জন্য কী কী করা নিষেধ তখন সে ঘরের বাইরে যাক আর না যাক, সে তার সঙ্গে সঙ্গে বহন করছে একটি হারেম, সেটা বুঝতে আমার কোনো সমস্যা হয় না। বাঙালি নারী হিসেবে শৈশব থেকে আমরা শিখে যাই যে, বাইরে বের হই বা না হই, কী কী নিয়ম আমাদের মেনে চলতে হবে। কাজেই পূর্বের নারী হিসেবে এক ধরনের হারেম আমি কি বহন করি না? ফেইজ নগরীতে ফাতিমার শৈশবের অবরোধ স্মৃতি ছিলো যেন রীতিমতো একটি কিল্লার নানা কঠোর নিয়ম-কানুনে মোড়া। অবরোধবাসিনী মা'কে নিয়ে আক্ষেপ ছিলো মেরনিসির যে মা কখনও সকালবেলার রাস্তার রঙটা কেমন হয়, নীল না গোলাপি, জানতেন না।

সহস্র এক আরব্য রজনীর নায়িকা শেহেরজাদির নতুন বিশ্লেষণ করেছেন মেরনিসি। শেহেরজাদি যেন এক নারীবাদী নায়িকা যে সেই যুগে তার গল্প বলার অমোঘ দক্ষতা দিয়ে নিজের এবং রাজ্যের সব নারীর জীবন রক্ষা করেছিলো।

মেরনিসির নিজের মা এবং মাতামহী নিরক্ষর ছিলেন। তবে ১৯৩০ সালে মরক্কোয় ফরাসি আধিপত্য শেষ হলে জাতীয়তাবাদী জাগরণ ঘটে। এই আন্দোলন প্রগতিশীল আন্দোলন ছিলো, যার সুবাদে ছেলে সহপাঠীদের সঙ্গে জুনিয়র লেভেল থেকে পড়ার সুযোগ পেলেন। ১৯৫৬ সালে মরক্কোর স্বাধীনতার পর দেশজুড়ে মেয়েদের প্রতি বৈষম্যমূলক হারেম তথা পর্দাব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়।

মুক্তচিন্তার প্রবক্তা মেরনিসি মাঝে মাঝে মৌলবাদীদের কাছ থেকে হুমকি পেয়েছেন, তবে ইসলামী শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য এবং বুদ্ধিদীপ্ত শব্দচয়নের জোরে বারবার রক্ষা পেয়েছেন। মরক্কোতে অন্তত আরবের অন্য দেশগুলোর মতো কিছু লেখার জন্য কাউকে জেলে যেতে হয় না বলে মজা করেছেন তিনি।

লিঙ্গবাদী রাজনীতি কি শুধু পূর্বেই আছে, পশ্চিমে নেই? পূর্বের পুরুষ নারীকে হারেম বা অন্তঃপুরে ঢুকিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। কিন্তু পশ্চিমের পুরুষ? সে কি নারীর সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না? পশ্চিমা পুরুষের মতে, নারীকে সুন্দরী দেখাতে হলে তাকে সবসময় দেখাতে হবে চৌদ্দ বছরের কিশোরীর মতো। তেমন হাল্কা-পাতলা। কোনো নারী যদি কখনও পঞ্চাশ বছর বা এমন কি ষাট বছরের মতো দেখায়, তবে সেসব বিবেচনার বাইরে। নারীর কিশোরীতুল্য রূপের ওপর যাবতীয় স্পট লাইট ফেলে পশ্চিম পরিণত নারীকে অদৃশ্য করে তুলতে চায়, এটাই ফাতিমার সাহসী উচ্চারণ।

উত্তর আফ্রিকার সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত অধ্যাপক মেরনিসি লা ক্যারাভান সিভিক নামে একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। এই সংগঠনটি গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, গ্রামীণ স্কুল এবং কারাগারের নারী সেলে শিক্ষিত নারীদের বক্তৃতা দিতে নিয়ে যেত।

অধ্যাপক মেরনিসি আজীবন অবিবাহিত ছিলেন। ভাই মোহামেদ এবং বোন রাতিদা মেরনিসি মৃত্যুর সময় তার কাছে ছিলেন। ২০০৩ সালে মেরনিসি সুসান সনট্যাগের সঙ্গে যৌথভাবে সাহিত্যের জন্য স্পেন সরকার প্রদত্ত দ্য প্রিন্স অব অস্ট্রিয়াস পুরস্কার অর্জন করেন।

একটি গোটা জীবন ইসলাম এবং নারীবাদ নিয়ে কাজ করে মেরনিসির উপলব্ধি ছিলো যে, কোরান বা মহানবীর জন্য নয় কিম্বা হাদিসের জন্য নয়, কিছু পুরুষের জন্য নারী অধিকার সমস্যা হলো শুধুমাত্র তাদের স্বার্থহানি হবে বলে।

ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতো নানা প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করেছেন মেরনিসি।


  • ৪৩৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অদিতি ফাল্গুনী

লেখক ও কলামিস্ট