নারীবাদী সাহিত্যতত্ব: লুপ্ত অতলান্তিক ও ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ - ০৬

বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ২৩, ২০২০ ৩:৫৪ AM | বিভাগ : সাহিত্য


(পূর্ব প্রকাশিতের পর) ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে, ১৭৮০-১৮৮০ খ্রীঃ -এ নারী লেখকদের বা স্পষ্ট করে বললে, নারী ঔপন্যাসিকের সংখ্যা হু হু করে বেড়ে যায়। এর কারণ তৎকালীন ইউরোপের সামাজিক-অর্থনৈতিক বিশেষ প্রেক্ষিতটিতে নিহিত। সপ্তদশ শতকের শুরু থেকেই সামন্তবাদের বিনাশ ও নতুন পুঁজির অস্থিরতা গোটা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সমাজ ও পারিবারিক জীবনে এক ভাঙনের সূচনা করে। যা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ করেছিলো, “ভদ্র, মধ্যবিত্ত ও বনেদি” পরিবারের মেয়েদের। একদিকে সামন্তবাদের বিনাশ তাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যদের জমিভিত্তিক নিশ্চিত উপার্জন কেড়ে নিয়েছিলো। অন্যদিকে যন্ত্রসভ্যতার উত্থান তাঁতবোনা, রুটি, বিয়ার, মোম বা সাবান তৈরির মতো ভদ্রস্থ কুটির শিল্প তথা রোজগারের উপায়সমূহও মেয়েদের হাত হতে সরিয়ে নিলো। অসহ এ আর্থনীতিক পরিস্থিতিতে বাঁচার জন্য দলে দলে মহিলারা আগ্রহী হলেন ঘরে বসে কিছু লিখে আয় করতে; বইয়ের বাজার দখল করতে। আর সাহিত্যের নবতম আঙ্গিক হিসেবে উপন্যাসের তখন ছিলো বিপুল পাঠক প্রিয়তা। কাজেই, উপন্যাসের উপরই মহিলাদের আগ্রহ কেন্দ্রীভূত হলো। উনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপে, র্শাট ব্রন্টির চিঠি থেকে জানা যাচ্ছে, এক বছর গর্ভনেসের কাজ করে যেখানে ২০ পাউন্ড পাওয়া যায়, সেখানে একটি উপন্যাস লিখে ১০০ পাউন্ড পাওয়া যেতো। ১৭৮৪ সালে সুইডিশ পর্যটক Perhkalm ইংল্যান্ডে এসে দেখেন যে, যন্ত্র বিপ্লবের কারণে ব্রিটিশ মেয়েদের হাতে অবসর অনেক বেশি। আবার মেয়েরা তখনো পর্যন্ত জড়িত হতে পারতো না ব্যবসা, প্রশাসন, রাজনীতিমূলক কর্মে আবার শিকার বা মদ্যপানের মতো প্রমোদও তাদের জন্য ছিল নিষিদ্ধ। ১৯১৩ সালে গার্ডিয়ান পত্রিকায় এন্ডারসন নামী জনৈক কলামিষ্ট লিখছেন; “মেয়েরা ঘরে থাকে বলে লেখা-পড়া, পত্র-পত্রিকার প্রতি তাদের ঝোঁক বেশি। ইত্যকার নানা কারণে আফ্রা বেন, ফেনি বার্নি, এলিজা কার্টারদের মতো সাধারণ গৃহিনীদের রচিত ‘পপুলার’ প্রণয়মূরক নভেলেটে বাজার ছেয়ে গেলো। অবশ্য তাদের এসব “Silly Novel” লেখালিখিই পরবর্তী পশ্চিমা মেয়েদের মনে নিজস্ব মেধার উপর আস্থা গড়ে তোলে, যার পরিপ্রেক্ষিতে উনিশ শতকের শেষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মেয়েদের জন্য দরজা খুলে নেয়। শুরু হয় ভোটাধিকার। উল্ফের মতে : ‘এ সময়ের ইতিহাস মেয়েদের জন্য ক্রুসেড ও গোলাপ যুদ্ধের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

IAN WATT তাঁর The Rise of the Novel’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, আজো সারা বিশ্বেই মেয়েরা তাদের লেখার ফর্ম হিসেবে উপন্যাসই যে বেশি লেখে, নাটক বা কবিতা নয়, তার প্রধান কারণ হচ্ছে উপন্যাস ঘরে বসেই লেখা যায়। নাটকের মতো তার Public Involvement দরকার নেই। বাংলাদেশের মতো সামন্ত মূল্যবোধ শাসিত দেশে, যেখানে আজো মেয়েদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে ‘পর্দা’ বা নারী নিঃসঙ্গতা, সেখানে এ তথ্য ভীষণ সত্য। আমাদের দেশে খুব কম মেয়েই মঞ্চ নাটক কী বস্তু তা জানে। কারণ বেইলি রোডে নাটক শুরুই হয় সন্ধ্যে সাতটার পর। এছাড়াও ‘Public Involvement’-এর ব্যাপারটি বাদ দিলেও নারী লেখকরা আরো কিছু কারণে উপন্যাস লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। যেমন, সাহিত্যের প্রচলিত ফর্মগুলোর মধ্যে উপন্যাসই সবচেয়ে নতুন। অনেকটা নতুন জমির মতো। যেখানে সদ্য বর্ণপরিচয়প্রাপ্ত নারী পা রাখতে পেরেছে। সাহিত্যের অন্যান্য সব চত্বের যেমন, কবিতা, নাটক কিম্বা দর্শগ্রন্থের মতো উপন্যাস তখনো পর্যন্ত পুরুষের হাতে ছাঁচে-ঢালা হয়ে ওঠেনি। এছাড়া উপন্যাসের আঙ্গিকটিও অনেকটাই মেয়েদের আয়াস-সাধ্য। গ্রীক ও ল্যাটিন শব্দানুষঙ্গে গড়া কবিতা বা নাটকের ধ্রুপদী বিস্তার নয়,... বরঞ্চ দিনপঞ্জী, জার্ণাল বা চিঠির ঢঙে অতিপরিচিত অলস দুপুরের কাহিনীও উপন্যাসে পায় আলেখ্যর মর্যাদা। পরিবার, পাশের বাড়ি, নিকট রাস্তার ঘটনা নিয়েও মেয়েরা লিখতে পারে... এ জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার দরকার পড়ে না। Julliet Micheal অবশ্য তাঁর “Femininity, Narrative and Psychoanalysis” রচনাকর্মে ফরাসীতাত্বিক জাঁক লাঁকার ‘সাইকোএ্যানালিটিক’ পদ্ধতি অনুসরণ করে দেখিয়েছেন যে কিভাবে সতেরো শতকে আত্মজীবনী লেখার মাধ্যমে মেয়েদের উপন্যাস লেখা শুরু হয়েছিলো (দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও আজো আমাদের দেশে ভাল-মন্দ-মাঝারী নির্বিশেষ মানের নারীলেখকরা উপন্যাস লিখতে যেয়ে আত্মজীবনী লিখে বসছেন। মহাশ্বেতা দেবী, ইসমত চুগতাই, জয়া মিত্র কিম্বা মীনাক্ষী সেনের মতো আদিবাসী....জেলজীবনে বন্দী নারী-ধোপা-নাপিত-কামার-মেথর-পতিতা... প্রভৃতি বিচিত্র স্তরের চরিত্র মেয়েদের কলমে কমই আসছে)। একটি নতুন বুর্জোয়া সমাজে গার্হস্থ্য ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক, ব্যক্তির অন্তরঙ্গতা পুঁজিবাদের অধীনে যে কাঠামো পায়... নারী লেখকদের হাতে তাই পেলো প্রাণ। উপন্যাসে প্রাণ পেলো নারীর গার্হস্থ্য, গৃহে নির্বাসিত তার বন্দী জীবন এবং সেই বন্দী জীবনের সম্ভাব্যতা ও অসম্ভাব্যতাসমূহ। জুলিয়া ক্রিস্তেভাঁ একেই আখ্যায়িত করেছেন “Discourse of Hysteria” বলে। বস্তুতঃ হিস্টিরিয়া হলো পুঁজিবাদী পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো নির্দ্ধারিত যৌনতার বিরুদ্ধে নারীর স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ কিম্বা ভণিতামূলক মেনে নেয়া। একজন নারী লেখককে হিস্টিরিক হতেই হয়। কেননা, তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা তাকে বলতে হয় পুরুষের ভাষায়। স্বভাবতঃই তাকে তাই “দ্বিবিধ যৌনতা” (পুরুষ ও নারীর) উপর জোর দিতে হয়।

এহেন নানাবিধ প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতেই মেয়েদের উপন্যাস লেখা শুরু। ১৮০০-১৯৩৫ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর মোট ঔপন্যাসিকের ২০% ভাগই ছিল মহিলা। উপন্যাসের ভেতর আবার মেয়েদের ভেতর “প্রণয়োপাখ্যাণ (Romantic Fiction)” পঠন ও লিখন, উভয়েরই প্রবণতা বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হলগুলোতে ‘বার্ষিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা’-য় ধারাবাহিক গল্প বলার প্রতিযোগীতা দেখবার অভিজ্ঞতা যাদের একবার হয়েছে, তারা সবাই দেখতে পাবেন যেকোনো জটিল সামাজিক বা রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে গল্পের সূত্র ধরিয়ে দেয়া হলেও (সাধারণতঃ সূচনাটি করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সাহিত্যামোদী শিক্ষক) প্রতিযোগী মেয়েরা গল্পটির ন্যাজা-কান-মুড়ো দলে-মুচড়ে সেটাকে একটি ভয়ঙ্কর-রকম প্যানপেনে প্রেমের গল্পে পর্যবসিত করে ফ্যালে। বিচিত্র নানা ধরণের প্রেমের সংলাপ গল্পের পর্যবসিত করে ফ্যালে। বিচিত্র নানা ধরণের প্রেমের সংলাপ গল্পের অংশ হিসেবে মেয়েরা আওড়ায়।

যেমন, ‘জামিল... জামিল, কতোদিন তোমায় দেখি না জামিল’, কিম্বা ‘আদিল তাকে বলতো.... সেইসব পুরনোদিনে আদিল তাকে বলতো... নার্গিস, তুমি নার্গিস ফুলের মতোই সুন্দর!, আপাতঃ দৃষ্টে হাস্যকর মনে হলেও প্রেম-জনিত বিষয়াদির প্রতি মেয়েদের এই আত্যন্তিক নির্ভরতার একটি গভীর রাজনৈতিক দিকও আছে। যেহেতু নারীর নেই ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ক্ষমতার ন্যূনতম অংশীদারিত্ব, প্রেমই হলো ক্ষমতাশালী পুরষের সাথে তার ‘bargain’- এর একমাত্র স্থান। সেটি সে তাই হাতছাড়া করতে চায় না। ফিরে আসা যাক নারীর রচনার বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকের সাধারণ প্রবণতা-প্রসঙ্গে। সমালোচক কে, কে রুথভেন করছেনঃ “মেয়েদের মধ্যে কবির সংখ্যা কেনো এত কম? গ্রীক-ল্যাটিনের জ্ঞান না থাকার দরুন ব্যালাড বা গাঁথা-কাব্যের সংরক্ষক হয়েছে মেয়েরাই। ডেভিন বুখান সংগৃহীত গাঁথাগুলোর অধিকাংশ কবিই ছিলেন মেয়েরা, যাদের মধ্যে আন্না গর্ডনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু আঠারো শতক থেকেই পুরুষ কবিরা ব্যালাডের ব্যাকরণগত ভুল সংশোধনে তৎপর হয়ে ওঠেন।“

এলিজাবেথ ব্যারেট ব্রাউনিং (১৯৪৫), এমিলি ডিকিনসন (১৮৬২) এবং ভার্জিনিয়া উল্ফ-ইংরেজি সাহিত্যের তিন প্রধান নারীলেখক যাদের প্রথম দু’জনই কবি, নারী কবির অবিশ্বাস্য সংখ্যাল্পতায় কাতরোক্তি করেছেন। আমাদের বাংলা সাহিত্যের দিকেও যদি তাকাই, দেখব, ঐপন্যাসিক বা গল্পকার দু’একজন মহিলা যাও বা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন কবিতার ক্ষেত্রে গভীর নিশ্চিদ্র অন্ধকার। প্রকৃতপক্ষে, ভারতবর্ষে যেমন তেমন ইউরোপেও বিংশ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত কবিকে গণ্য করা হতো Priest বলে। ভারতের কবিযশপ্রার্থী পুরুষকে এই সেদিন পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে আয়ত্ব হতো ‘দেবভাষা’ সংস্কৃত। অথচ নারীর জন্য সংস্কৃত শেখা ছিলো ভয়ানক অপরাধ। একই নাটকে রাজা ও তার অমাত্য, ণ্ডিত ও কবিবর্গ যখন সংস্কৃতে সংলাপ পড়তেন, নারী ও ভৃত্যকূলকে আওড়াতে হতো প্রাকৃত। ইউরোপেও কবিতা লেখার জন্য প্রয়োজন হতো অভিজাত গ্রীক ও ল্যাটিন শিক্ষা। যে সমাজ শারীরবৃত্তিয় কারণে নারীকে কোনোদিন পৌঁরহিত্যের অধিকার দ্যায় নি, সে সমাজে মন্ত্রোচচারণের মতোই সমান দূরূহ কাজ কবিতা লেখা মেয়েদের জন্য অবাস্তব ব্যাপার। (চলমান... )

(পঞ্চম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

(চতুর্থ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

(তৃতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

(দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

(প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)


  • ১৬৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অদিতি ফাল্গুনী

লেখক ও কলামিস্ট

ফেসবুকে আমরা