রেণু, আমি অথবা বহি:স্থ অনুষঙ্গের কাছে কিছু হেরে যাওয়া মানুষ

বুধবার, জুলাই ২৪, ২০১৯ ৩:২৯ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


গণপিটুনীতে নিহত রেণুর ভাইয়ের পোস্ট পড়ে তিনি প্রকৃতই কতটা সুশিক্ষিত ও রেণু কতটা শিক্ষিত পরিবারের মেয়ে সেটা বুঝলাম। এমন ভাল ও হৃদয় দ্রবীভূত করা বাংলা আমাদের চারপাশের অনেক ‘স্বীকৃত’ লেখকেরও নেই। গতকাল রাতে একবার কেঁদেছি পোস্টটি পড়ে।

আজ সকালে কবি সেযুঁতি বড়–য়ার ওয়্যাল থেকে কপি পেস্ট করার সময় আবার কাঁদলাম। রেনুর চরিত্র নিয়ে তাঁর দশ বছরের বড় ভাইয়ের কিছু পর্যবেক্ষণ পড়ে কি আমি কাঁদছি? হ্যাঁ, ফেসবুকে আমার প্রায় সাড়ে পনেরো হাজার অনুসারী। লেখক হিসেবে সামান্য পরিচিত। তবু কোথায় যেনো রেনুর সাথে আমার মিল? শৈশবে অন্যায় না করেও মা’র কাছে বকা খাওয়া? আমিই ত’! আমার যে খানিকটা বড়, চির সপ্রতিভ বোনটি দুষ্টুমি বা খেলার ছলেই আমি তাকে না মারলেও জোরে চেঁচিয়ে বলতো আমি তাকে মেরেছি আর তারপর মা এসে আমাকে মারত- এটা খেলা আর দুষ্টুমিই ছিল- শৈশবে এমন খেলা আর দুষ্টুমি ভাই-বোনদের ভেতর থাকেই- তবু আমি ত’ তেমন খেলা আর দুষ্টুমিতে কখনো জিতিনি। কখনো পারিনি। সেই পরাজয়ের ধারাবাহিকতায় আমি কি জীবনের কাছে আজো হেরেই চলেছি?

রেনু যেমন আজীবন ফার্স্ট গার্ল হয়েও চাকরির মত বাইরের অনুষঙ্গ আত্মস্থ করতে পারেনি- আমি স্কুল জীবনে অঙ্কে কাঁচা ছিলাম বলে সেকেন্ড হতাম বেশি- ফার্স্ট গার্ল ছিলাম না- ওপারের এক ওয়েব সাইটে এক যুবক একবার বললো যে আমি বাংলা বা ইংরেজি কোনোটাই পারি না- আসলেই পারি না- না পেরে পেরেই তবু আমি স্প্যানীশ থেকে না হোক, ইংরেজি থেকেই মার্কেজের দূরূহতম উপন্যাস অনুবাদ করেছিলাম আরো অনেক অল্প বয়সে- সামান্য মায়াকোভস্কি বা সামান্য মার্ক শাগাল অনুবাদ করেছি। সামান্য ফরাসী থেকেও অনুবাদ করি মাঝে-মাঝে। তবু, তিন লাইন ইংরেজিতে একটি ই-মেইল লিখতে গিয়ে ছয়টি ভুল করা, বাংলা দশ পংক্তি গুছিয়ে লিখতে না পারা নানা নর-নারী নানা অফিস থেকে আমাকে ঠিক দলবদ্ধভাবে তাড়াতে পেরেছে।

এমন বিকট ও দলবদ্ধ অসহযোগিতা করে যে নিজেই পদত্যাগপত্র দিয়েছি নানা জায়গায়। দু/তিনবার আক্ষরিক অর্থেই কাজ থাকে নি। মানি আমারই যোগ্যতা নেই। গত দু/আড়াই মাস ঘরে বসে। তবু একদিন ফেসবুকে ক্লিক করে তীব্র হতাশা থেকে একটি ডাচ অন লাইন কোর্সে আবেদন করে ও ছোট একটি সামারি পাঠিয়ে ত্রিশটি দেশের ছেলে-মেয়েদের ভেতর থেকে নির্বাচিত কিন্ত হতে পেরেছি। তবে ব্যর্থতা কার? রেনুরই ত’ ছিলো। আমার যেমন। এখন ভাগ্যই মানতে হয় যে সিঙ্গল আমি। বিবাহিতা হলে গর্ভাবস্থার কঠিন সময়ে আমার জীবনসঙ্গীও কি পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়তো রেনুর জীবনসঙ্গীর মতো? বাবা-মা-ভাইয়ের সংসারে ফিরে আসা? সে জীবনই কি খুব সহজ? তবু রেনু ভাইয়ের সংসারে থেকে ছোট একটি চাকরি করেও সন্তানদের মানুষ করতে চেয়েছিলো। সেটাও হলো না। বিয়ে করবেন? সন্তান আনবেন? কেনো? কিসের জন্য? কী ফাঁকা আর অসহ শুণ্যতা চারপাশে!

আমি হয়তো রেনুর তুলনায় খানিকটা ভাগ্যবতী যে সৃজনশীল একটি প্রকাশ মাধ্যম পেয়ে গেছিলাম অল্প বয়স থেকেই। তবু এই ঢাকার সাহিত্য ভুবনের নানা রাজনীতি, নানা নিষ্ঠুরতা কি দেখি নি সেই প্রথম পা রাখার মূহুর্ত থেকে? এখানে কি জেন্ডার নিগ্রহ নেই? ক্ষমতাবানদের সাথে নিরাপদ দূরত্ব রক্ষার কারণে যোগ্যতার তুলনায় অনেক অপ্রাপ্তি, অনেক বঞ্চণা নেই? এক মাস আগে একটা ইন্টারভিউ দিলাম। রিটেনের পরই কর্তৃপক্ষ খুব খুশি হয়ে আমার ভাইভা সবার আগে নিল। তবে সেখানে ছিলেন এক প্রাক্তন নারী সহকর্মী যিনি আমাকে ‘আপনি ত’ ম্যাম সাহেবগো মত কইলকেতার বাংলায় কথা কন’ বলে টন্ট করতেন। গ্রাম্য রাজনীতির ক্ষমতা তার কম ছিল না। কাজটি পরে হয়নি আমার। বেতন স্কেলও আমার শেষ বেতনের তুলনায় অনেক কম ছিল। হয়ত নিয়োগকর্তারা সব কিছু বিবেচনা করেই আর ডাকেন নি। আজকাল এমন হয়েছে যে কোথাও আবেদন করার পর অবচেতন ডিজায়ার হয় যে ইন্টারভিউ কল না আসুক- এলেও কাজটি না হোক- সেই ত’ একই দুর্দ্ধর্ষ শয়তানি আর বদমায়েশি দেখতে হবে নানা মানুষের।

এই যে ফেসবুকে দেশ উদ্ধার করি- সে ত’ দিনের পর দিন নিজেকে সব সামাজিকতা থেকে শামুক খোলে গুটিয়ে নেয়ার দু:খ ভুলতেই। দেশের সবচেয়ে বড় কাগজ আমার কবিতা-গল্প-অনুবাদ গল্প বা অনুবাদ কবিতা কিছুই প্রকাশ না করুক, দিনশেষে ফেসবুকে একটি ফরাসী হাইকু অনুবাদই না হয় হোক আমার টিঁকে থাকা! জাকারবার্গ নামের ইহুদি ছেলেটি এই ধরিত্রীতে না জন্মালে আমাকেও আত্মহত্যা করতে হতো আরো বহু দিন আগেই।

রেনু- আমি জানি না আমি কতোদিন বাঁচব! আমাদের মত মানুষেরা যারা ছোটবেলায় মা’র কাছে নি:শব্দে ধমক খাওয়া থেকে বড় হয়ে চাকরির মত বহিস্থ অনুষঙ্গ কিছুতেই আত্মস্থ করতে পারে না- সে তুমি ফার্স্ট গার্ল হও আর আমি মার্কেজ অনুবাদ করি- আমাদের শেষ পরিণতি যেনো মৃত্যুই!


  • ২৬৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অদিতি ফাল্গুনী

লেখক ও কলামিস্ট

ফেসবুকে আমরা