বাংলাদেশের পতাকার রক্তক্ষরণ ও ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল

রবিবার, মার্চ ৪, ২০১৮ ৪:৫২ PM | বিভাগ : দেশ/রাজনীতি


(ক)

মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে আমি কিছু লিখার দ্বায়িত্ব রাখি। মধ্যপ্রাচ্য ও ভূরাজনীতি আমার গবেষনার জায়গা বা ক্ষেত্র। সেকারণে আমি লিখেছিলাম "পারস্য কিংবা সিরিয়া সংকটে আমি মুছলমান।" সংকটের ব্যথা বুঝতে হলে আপনাকে মুছলমানিত্ব অনুভব করতে হবে বিশ্বাস করুন না করুন। ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক রিপোর্টার রবার্ট ফিস্ক সেটা আমাকে শিখালেন। এই সংকট জিননূরাইন মানে দুই নূরের মাঝখানের পুরুষ যে ছিলো তারই সৃষ্ট। খন্ড খন্ড মুছলমান গোত্রের দ্বন্দ সৃষ্টির ক্ষেত্রে তিনি দোষী, এয়াজিদ বনাম হাসান, হোসেন যুদ্ধ। এখানে পশ্চিমারা শুধুই প্রভাবক।

মধ্যপ্রাচ্য সংকট মন্থর হলে এই ভূরাজনীতি দাঙ্গা চলে আসবে দক্ষিন-পূর্ব এশিয়াতে, এই দক্ষিন পূর্ব এশিয়ার দাঙ্গার রসদ ইতিমধ্যে তৈয়ার হয়ে গেছে। রোহিঙ্গা সংকট, মালদ্বীপ অস্থিরতা কিম্বা চীনের গোগ্রাসে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোকে গিলে ফেলা, নেপালকে ঋণে ডুবিয়ে রাখা, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কাকে ঋণে ডুবানো, বাংলাদেশের সাথে বানিজ্যিক চুক্তি দৃঢ় করা, এবং রোহিঙ্গা সংকটে মধ্যস্থতার ভূমিকা রাখার মধ্য দিয়ে চীনের গায়েল কুচকাওয়াজ শুরু হয়ে গেছে। ভারতেরও মান অভিমান বেড়েছে সে কারণে, কিছুদিন আগের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি দিয়েছেন ভারত নিয়ে এবং মান অভিমান চলছে বলেই ভারতের সেনাপ্রধানও উল্টো কথা বার্তা বলছেন।

এই সংকটের আগে যদি বাংলাদেশীরা ইতিহাস, ঐতিহ্য সংস্কৃতি পালনে একমত, একমন দিয়ে না দিই। আগামীর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে উড়ে যেতে পারে বাংলাদেশ নামের ভূ-খন্ডের স্বকীয় চিহ্ন। ৪৭ বছরের একটা রাষ্ট্রকে আমি শিশু বলতে পারবো না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ৪৭ বছরের হলে এতোটা পুরাতন না, একটা বালিকা বয়সী রাষ্ট্র হিশেবে আখ্যা দিতে পারবো না। সে কারণে এই দেশে যে ঐতিহাসিক একতা কে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেওয়ার জন্য, সংঘর্ষের রাজনীতির একটা শক্তি হলো মৌলবাদ। মৌলবাদ শব্দটা ব্যবহার করতে কয়েকদিন ধরে বেশ ভয় পাই কারণ এটা অতোটা নষ্ট শব্দ নয়; আবার তাও না। কিন্তু বাংলাদেশ ইতিহাসে, জাগরণে আদর্শে যে ধর্মের মতো আত্মিক বিষয়টিকে ক্রমান্বয়ে আদর্শের মুখ্য হাতিয়ার হিশেবে দাঁড় করাচ্ছে বা চাইছে তা দিন দিন বিপর্যয় ডেকে আনবে। রাষ্ট্রের নাগরিক কখনো সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু দিয়ে গুনা হয় না। যদি তা দিয়ে গুণা হয় এটাও হবে বাংলাদেশের মতো উদার গণতান্ত্রিক চর্চাকারী রাষ্ট্রের জন্য চরম বিপর্যয়।

নাগরিক মানেই মানুষ। রাষ্ট্র যদি ধর্মের পরিচয়ে বড় হতে থাকে তার জীবৎকালের দর্শনের অভাব পড়েছে সেটার মানে বহন করবে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক দর্শন খুবই অনুসরণীয়, সে অনুসরণটা বাঙালিরা করতে পারছে কি না? না পারছে না। এই না পারাটা দ্বন্দ সৃষ্টি করতে সুযোগ করে দেওয়ার মতো ফাক ফোকর রাখাটায় অযোগ্যতা, রাজনৈতিক দর্শনকে সঠিক ভাবে চর্চা না করা।

(খ)

আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য যদি সঠিক উদ্দেশ্য না থাকে তার কারণে বাংলাদেশ বারে বারে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। তখন গ্রাম্য প্রবাদটাই মুলমন্ত্র ও চিরসত্য হিশেবে মেনে নিতে হবে "ঘরের ইদুরই ঘরের বেড়া কাটলে সেখানে ঘর ধসে পড়বে সুনিশ্চিত।" প্রতিদিন বিশ্রী ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

কিছুদিন আগে বেগম জিয়ার একটা মামলার রায়কে কেন্দ্র করে জাতির পিতার ছবি নিয়ে যে লজ্জা জনক ঘটনা হয়েছে সেটির জন্য দোষী কারা? আগামীতে বিশাল সুযোগ যে রয়েছে সেটা হয়তো হারাবো আমাদের দু-ভাগ হওয়ার কারণে। ইতিহাস কেনো দু-ভাগ এবং বিকৃত হবে? জাতির পিতাকে কেনো কটাক্ষ, ছবি বিকৃতি, তাকে নিয়ে কেনো কুরুচিপূর্ণ কথা বলা হবে? এই ঘটনা গুলো আমাদের দ্বন্দের দিকে নিয়ে যাওয়ার কারণে আজ ড.মুহম্মদ জাফর ইকবালের মতো ব্যক্তিদের, ড. হুমায়ূন আজাদ, কিংবা শামসুর রাহমানদের মতো ব্যক্তিত্বদের খুন করার জন্য মৌলবাদীরা মাথাচাড়া দিয়ে গা ঝাঁকিয়ে খুন করার সাহস পায়।

সুতরাং আগামীর বিশ্ব শক্তিধর বাংলাদেশ বিনির্মাণে মৌলবাদী শক্তিদের ভোটের রাজনীতি বা ক্ষমতায়নের রাজনীতির লোভে যদি পশ্রয় দেওয়া হয়। বাংলাদেশ আজীবনই নিজস্ব নেতৃত্বে বলীয়ান হতে পারবে না। নয়তো ভারতের সাহায্যে নির্বাচনে জিততে হবে, নয়তো আমেরিকান হস্তক্ষেপে নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে যার ফলশ্রুতিতে আজীবন গোলাম থেকে যেতে হবে। সুতরাং আমাদের খুব বেশি সময় একটা রাষ্ট্রে গনতন্ত্র কাঠামো ৪৭ বছরের হলে সেটা খুশির কিছু নয়, এখানে ৪৭ বছরের গনতন্ত্র এতো পুরাতন নয় যে রাষ্ট্রীয় নেতাদের মাঝে রাষ্ট্রানুভূতি কাজ করবে! কিন্তু শিশুর বুকেও মায়ের প্রতি একটা আবেগীয় শূন্যতা থাকে যেটা প্রখর, সেটা কাজে লাগাক আমাদের রাজনীতিবিদেরা। অন্তত দেশের বুদ্ধিজীবিদের নিরাপত্তার দিক দিয়ে একটু এগিয়ে আসুক। বুদ্ধিজীবিদের নিরপেক্ষ ভাবতে হয় কারণ তারা কোনো কিছুকে বাংলাদেশের আগে, বাঙালি সত্বার আগে ভাবেন না। ড.মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের প্রতি যে জখম করা হয়েছে সেটা বাংলাদেশের পতাকার মাঝখানে করা হয়েছে। যিনি কলম যুদ্ধ না করলে হয়তো বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের বিজ্ঞান প্রেমটা জেগে উঠতো না। যদি অন্য কেউ সে জায়গায় কাজ করতো, সেখানে হয়তো কোনো না কোনো তলোয়ারের মাধ্যমে জয়ের কথা বলা হতো। বিজ্ঞানের কথা ঠিক সঠিকটা তুলে ধরতো কিনা সন্দেহ আছে।

(গ)

বাংলাদেশকে অনেক কিছুর মাশুল গুনতে হচ্ছে, ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে আজকের ড.মুহম্মদ জাফর ইকবাল পর্যন্ত, বিষয়টা এতো হালকা করে নেবার মতো নয়-তবে এটি রাষ্ট্রের অপরিপক্বতা। এবং ভোট দখলের ক্ষমতার কারবাল্লা মৌলবাদী শক্তিগুলো জেগে উঠছে। তখন বাঙালি সত্বাটা হয়তো প্রকাশ করাটাও বিপদ জনক হবে। জেগে উঠতে দিতে হবে বাংলাদেশকে। এই সময়ের প্রজন্মকে ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা শুনানো হয়েছিলো, পড়ানো হয়ছিলো বিকৃত ইতিহাস, ১৯৭৮ থেকে মেজর জিয়া ক্ষমতা দখল করে ব্রিটিশের সৃষ্ট বীজ ধর্মীয় উগ্র সংগঠনের রাজনীতিকে আশ্রয় পশ্রয় দিয়েছিলো। স্বাধীনতা বিরোধী নীতি-দর্শনকে প্রচার এবং প্রসারে মেজর জিয়ার ভূমিকা যেমন ছিলো। বাংলা ভাষাকে অপমানে, অবমাননায় মেজরা জিয়া ছিলেন আরেক খলনায়ক। রাজনীতিক ইতিহাসে বাংলার হিটলার-এই মেজর জিয়ার কারণে বাংলাদেশে দ্বন্দ সৃষ্টি হয়েছে। প্রজন্মকে, জাতিকে ইতিহাসের স্থানে করেছে দ্বন্দগ্রস্থ। যার ফলে এই তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রকে ভোটের জন্য আদর্শ বা দর্শনকে ভুলে যেতে হয়, এই ভুলে যেতে হয় বাংলাদেশকে হায়েনার কবল থেকে বারবার বাঁচাতে। স্বৈরাচার জিয়া এবং এরশাদের ভুলের মাসুল গুনতে হয় স্বপক্ষের রাজনীতি দলের।

(ঘ)

বাংলাদেশ শক্তিধর রাজনীতির বলয়ে প্রবেশ করছে ধীরে ধীরে কিন্তু রাষ্ট্রের মূল চিন্তা শক্তিকে যদি ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়, রাষ্ট্র তখন কেনো সামনে যাবে? বাংলাদেশের গৌরবান্বিত ইতিহাস আছে যেটি বিশ্বকে ভয়ংকর রকম তাক লাগিয়ে দেই। মৌলবাদ এবং মৌলবাদী মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র কথিত কথায় এগুবে কিন্তু এটি বিপর্যয়ের মুখে বেশি নিয়ে যাবে-নিয়ে যাবে গোলামির পথে।

(ঙ)

আমাদের সমাজ কাঠামোকে বদল করতে হবে। বাঙালির নিজস্ব সমাজ কাঠামো এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে পরিবর্তন করতে হবে। এই পরিবর্তন ঘটানোর দ্বায়িত্ব প্রজন্মের কিন্তু প্রজন্মকে দ্বায়িত্ব সম্পর্কে অবগত করার দ্বায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের সচেতনদের। এখানে ইসলাম বা সনাতনি মুখ্য ছিলো না, সংবিধানে বহুদিন আগেও ১৯৭২ সালে জাতির পিতা চার স্তম্ভের একটি করেছেন, এখানে সকল মত প্রকাশ নির্ভয়ে করা যাবে, সকল কথা নির্ভয়ে বলা যাবে। কিন্তু বলা যাচ্ছে কি? "এথনিক মেল্টিং পট" সার্বজাতিক, সকল মতের মানুষের মিলনকেন্দ্র তো আগে থেকে ছিলো। পাকিস্তানি শাসনামলে এই দেশের সাধারন মানুষেরাইতো দাড়িয়েছিলো রবীন্দ্র সঙ্গীত তারা শুনবে সে জোর দাবি নিয়ে; তারা মঙ্গল শোভা যাত্রা করবে এই দাবি নিয়ে। তখনের মতো বাংলাদেশী মুছলিমদের কাছে বৈশাখ উদযাপন একটা খুশির ও সম্মানের উৎসব ছিল। এখন কেনো সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠে? দ্বন্দ হয়? তাহলে আমরা অবকাঠামো গত উন্নয়নের কারণে কি ফল পাচ্ছি। শিক্ষাক্ষেত্রে পাঠ্যসূচিতে মৌলবাদ ঢুকিয়ে কি ফল পাচ্ছি আদতে?

বাংলাদেশ সুস্থধারায় ফিরে আসুক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালের প্রতি হামলার নীল ছক সাজিয়েদের শিক্ষা দিয়ে জানানো হোক, আমরা আজো স্মৃতির মিনারে মাথা নোয়াই গৌরবে, ইতিহাসের নেতাদের বাঙ্গালি সত্বার আচারের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানাই। যার কারণে এই ঘটনার সমাধানের মাধ্যমে স্যার জাফর ইকবাল এর শারীরি সুস্থতা চিন্তার উর্বরতা বাড়ুক, প্রগতি চিন্তা ছড়িয়ে পড়ুক এবং বাংলাদেশও সুস্থ ধারায় ফিরে আসুক।


  • ২৫২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

ফেসবুকে আমরা