বারোজন নোবেল বিজয়ী নারী -জীবন ও সাহিত্য: সালেহা চৌধুরী

মঙ্গলবার, জানুয়ারী ১, ২০১৯ ১:৫৫ PM | বিভাগ : সাহিত্য


নারী ও নারীর জীবন যে নিজেই এক বিমূর্ত শিল্প। যাকে ঘষে ঘষে জীবন আলোকিত হয়। ভেঙেচুরে হয় শিল্পময়। এটাই যেন প্রকৃতি যাকে আমরা বলি নিয়তি। সে নারী কি প্রকৃতিকে ভাঙতে পারে? আলো বিলাতে বিলাতে প্রদীপ কি আলো হতে পারে? শিল্প কি হয়ে উঠতে পারে শিল্পী স্বয়ং?

সাহিত্যিক, কবি, অনুবাদক, আলোচক সালেহা চৌধুরী। এ প্রবাসে শত বৈরীতার মাঝে আমার অতি প্রিয়জন সালেহা চৌধুরী। সঙ্গত কারণেই তার সাহিত্যে বারোজন নোবেল বিজয়ী নারী: জীবন ও সাহিত্য বইটি নিয়ে আমি আগ্রহান্বিত হই। বইটি সংগ্রহ করি। কিন্তু বইটি পড়তে গিয়ে আমি আবেগাপ্লুত হয়ে উঠি। বিশ্ব সাহিত্যের অপার রহস্যের সাথে নিজেকে যুক্ত করি। জানতে পারি অনেক অজানা কথা।

নারীর সাহিত্য মানে দূর্বল সাহিত্য, নারী কবিতা মানে দূর্বল কবিতা। আবৃত্তিকারদের সাধারনতঃ নারী কবিদের কবিতা আবৃত্তি করতে দেখা যায় না। এসব দেখতে বুঝতে অভ্যস্ত চোখ ও মন কিছুটা মুক্তির শ্বাস ফেলে। যদিও এ বইটি আমার জন্য পিঁপড়ের সাগরে সাঁতার। আমি সাঁতার কাটছি, হাবুডুবু খাচ্ছি আবার ভেসে উঠছি। নারীদের নোবেল বিজয় এও কি সম্ভব! সালেহা চৌধুরী বইটিতে ‘আমার কথা’ শিরোনামে বলেছেন, একশতছয়জন সাহিত্যে নোবেল পাওয়া সাহিত্যিকের ভেতরে মাত্র বারোজন নারী। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে এ বারোজন কি বারোশত জন পুরুষের সমান নয়! কতটুকু প্রতিভা থাকলে সংসার ও সমাজের জটিল কাঁটা জালের উর্ধ্বে উঠে নারী বের করতে পারে নিজের জন্য একটু সময়? যে সময়ে সে একা একা সাহিত্যে মনোনিবেশ করতে পারে?

যে জটিল আবর্তে পড়ে অনেক সাহিত্যিককে আমরা সরে যেতে দেখি, কর্মজীবীকে দেখি কর্ম ছেড়ে দিতে। কেননা নারীকে সংগ্রাম করতে হয় ঘরে এবং বাইরে, শরীরে এবং হৃদয়ে। কাকে আমরা দোষ দেবো? জীবনের গতিকে না বংশগতিকে, প্রকৃতিকে না সমাজকে? যতক্ষণ না সমাজ মানবিক হয়ে ওঠে। আর মানবিকতাই জন্ম দেয় বিবেক ও ঔদার্য। উইসলোয়া সিমব্রসকার ভাষায় বলা যায়, সূর্য থেকে দূরের তৃতীয় গ্রহ বিভিন্ন পাশবিকতার মাঝখানে যখন জানো তোমার বিবেক, এই মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ।

সৃষ্টি প্রক্রিয়ার পথ পরিক্রমাই সংগ্রাম। সংগ্রামে যে জয়ী হবে সেই টিকে থাকবে। সালেহা চৌধুরীর জীবনও কি এমনই এক সংসার চক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়ে নি? তিনি মা কিংবা গৃহিণী হিসেবে কৃতিত্বের দাবী করতে পারেন কিন্তু সাহিত্য তার কাছ থেকে বিশটি বছর বঞ্চিত হয়েছে। তিনি যখন জ্বলে উঠতে চাইছেন তখন জীবন কেটে রেখেছে অনেক সময়।

আজো তার কর্মস্পৃহা, তার সংগ্রাম আমাদের সাহস জোগায়। এ বইটি করতে যেয়ে তার অসীম পরিশ্রম আমাদের নাড়া দেয়। অন্তত সহায়ক গ্রন্থ হিসাবে বিয়াল্লিশটি বইয়ের তালিকা দেখতে পাওয়া যায়। এরপরও নানা ওয়েব সাইট সার্চিং তো রয়েছেই। অবশ্য তার ‘আমার কথা’ শিরোনাম থেকে আমরা জানতে পারি না বইটি লিখতে তার কত বছর লেগেছিলো। এটি একটি দূর্লভ বই নিঃসন্দেহে আর তার অপরিসীম নিষ্ঠায় বইটি বাংলা সাহিত্যের এক অসাধারণ সংগ্রহ হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করবে তাতে কোনো সন্দেহ নাই। এ গ্রন্থে আমরা দেখতে পাই স্যালমা ল্যাগারলফ(১৯০৯) থেকে হার্টা মুলার (২০০৯) এই একশত বছরের মধ্যে বারোজন সাহিত্যিক। যাদের জীবন ও সাহিত্য বিধৃত আছে। এ নোবেল বিজয়ীদের একজনও এশিয়া তথা দক্ষিণ এশিয়ার ধর্ম ও সমাজ আক্রান্ত নারী নয়। তাদের ভাষা, তাদের জীবন যাপন, অধিকার, মৌলিক ভাবনা-চিন্তার অগ্রসরমানতা সর্বোপরি তাদের প্রতি নোবেল কমিটির সহায়তাসম্পন্ন মনোভাব এসব তাদের অনুকূলে। তাই তাদের সৃষ্টি গতিপ্রাপ্ত ও পুরস্কৃত। এখানে আমার এশীয় কারো নাম নেই। না থাকলেও ভবিষ্যতে থাকবে না তা বলা যায় না, কেননা আজকের বর্তমান শিক্ষিত ও সংগ্রামী নারীরা জেনেটিক্যালী এগিয়ে দিচ্ছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। অবশ্য সবকিছুর জন্য প্রয়োজন আমাদের ভাষাকে আন্তর্জাতিকীকরণ করার প্রচেষ্টা। ভালো সাহিত্যকে অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা। আর আমরা দেখছি উল্লেখিত সাহিত্যিকের সাহিত্যও এভাবে উঠে এসেছে। সে যাক, এ দূরবিশ্বের নারীদের নোবেল বিজয় আমাদের আনন্দিত করে, গর্বিতও করে। কেননা এরা আমাদের মা ও বোন। সাংসারিক ঘটি-বাটি বহনের ভার এদের উপরই ছিলো বেশী আর ছিল সন্তান জন্মদান ও প্রতিপালনের মতো কঠিন ও দূরুহ ভার। তাই এ বই আমাকে আলাদা এক আগ্রহে আগ্রহান্বিত করে-কি লিখেছেন এ নারীরা?

প্রথমে এই সাহিত্যিকদের নাম, জন্ম-মৃত্যু, নোবেল প্রাপ্তির সাল, দেশ ও উল্লেখযোগ্য সাহিত্য একনজরে দেখে নেয়া যাক:

১. সেলমা ল্যাগারলফ: (জন্ম ২০ নভেম্বর, ১৮৫৮,মৃত্যু ১৬ মার্চ ১৯৪০), নোবেলÑ ১৯০৯। দেশ: সুইডেন, উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ- গোষ্টা বারলিংগা সাগা, ইনভিজিবল লিংকস, দি মিরাকল অফ অ্যান্টিক্রাইস্ট, জেরুজালেম, অ্যাডভেঞ্চার অফ নিলধ, সেলমা ল্যাগারলফের ডায়েরী।

২. গ্রাজিয়া দেলেদ্দা: (জন্ম ২৭ সেপ্টেম্বর ১৮৭১, মৃত্যু ১৫ আগষ্ট, ১৯৩৬), নোবেল- ১৯২৬, দেশ: ইতালী উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: ফ্লাওয়ার ফর্ম সার্ডিনিয়া, দি ওয়ে অফ ইভিল, সার্ডিনিয়ার স্টোরি, দি অনেস্ট সোল, সিনেরি, আইভি, রিডস ইন দ্যা উইডস, মারিয়না সিরকা, দি মাদার, দি ফ্লাইট ইনটু ইজিপ্ট, দি সিট অফ লাভ।

৩. সিগরিট উন্ডসেট: (জন্ম ২০ মে ১৮৮২ মৃত্যু ১৯৪৯), নোবেল প্রাপ্তি-১৯২৮, দেশ: নরওয়ে (জন্ম: ডেনমার্ক)। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: ক্রিস্টিন লারভানসডাট্রার, ম্যান ওম্যান এন্ড প্লেসেস, দি মাস্টার অফ হাস্টাভাইকেন, গানারস ডটার, জেনি, বসন্ত, ইডা এলিজাবেথ, হ্যাপি টাইমস ইন নরওয়ে। ৪. পার্ল এস বাক: (জন্ম-২৬ জুন ১৮৯২ মৃত্যু-১৯৭৩), নোবেল-১৯৩৮, দেশ: আমেরিকা (বড় হয়েছেন চীনে), উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: দি গুড আর্থ, দি সান, দি মাদার, কাম মাই বিলাভেড, সাটান নেভার স্লিপ্স, ইমপেরুয়াল ওম্যান।

৫. গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল: (জন্ম-৭ এপ্রিল ১৮৮৯ মৃত্যু-১০ জানুয়ারী ১৯৫৭), নোবেল-১৯৪৫, দেশ: চিলি, দক্ষিণ আমেরিকা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: মৃতের সনেট, ডেসোলেসন, নারীদের জন্য বক্তৃতা, তালা, লাগার, চিলির কবিতা।

৬. নেলী সাক্স: (জন্ম-১০ ডিসেম্বর ১৮৯১ মৃত্যু-১২ মে ১৯৭০), নোবেল-১৯৬৬, দেশ: জার্মানী(পরবর্তীতে দেশ ত্যাগ করে সুইডেনে বসবাস করেন)। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: লেজান্ড এ্যান্ড স্টোরিস, এলি, ইন দ্য হাউজ অফ দ্য ডেথ, একলিপ্স অফ স্টার, ও দ্য চিমনি, ফ্লাইট এন্ড মেটামরফসিস

৭. নাদিন গর্ডিমার: (জন্ম-১৯২৩), নোবেল-১৯৯১, দেশ: ইংল্যান্ড, (জন্ম ও বড় হওয়া দক্ষিণ আফ্রিকা) উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: দি লাইং ডেজ, বারজের্স ডটার, দি হাউজ গান, সিলেক্টেড স্টোরিজ, অন দ্য মাইনারস, লাইফটাইম আন্ডার আপারথেড, দি লুট এন্ড আদার স্টোরিজ, বিথোফেন ওয়াজ ওয়ান সিক্সথ ব্লাক।

৮. টনি মরিসন:(জন্ম-১৮ ফেব্রুয়ারী ১৯৩১) নোবেল-১৯৯৩, দেশ:আফ্রিকা(জন্ম-আমেরিকা) উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: দি ব্লুয়েস্ট আই, সুলা, সং অফ সলোমন, টার বেবি, বিলাভেড, জ্যাজ।

৯. উইসলোয়া সিমব্রসকা: (জন্ম- ২জুলাই ১৯২৩), নোবেল প্রাপ্তি-১৯৯৬, দেশ: পোল্যান্ড, উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: এই জন্যই আমরা বেঁচে আছি, নিজেকে প্রশ্ন কর, কলিং আউট টু ইয়েটি, লবণ, মজার শেষ নেই, হতে পারতো, একটা বড় সংখ্যা।

১০. এলফ্রিড জেলিনেক: (জন্ম-২০ অক্টোবর ১৯৪৬), নোবেল জয়-২০০৪, দেশ: জেকোস্লোভাকিয়া, সিরিয়া (বড় হয়েছেন অস্ট্রিয়ায়)। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: উই আর ডিকোয় বেবী, ওম্যান এজ লাভার, পিয়ানো টিচার,লাস্ট, চিলড্রেন অফ দ্যা ডেড, গ্রিড, নাটকের ভেতর, ক্লারা এন্ড মিউজিক্যাল টিচার, ফার্স উইথ সং, ডিজায়ার পামিশন টু ড্রাইভ, ক্লাউডস হোম।

১১. ডোরিস লেসিং:(১৯১৯ - ) নোবেল: ২০০৭, দেশ: ব্রিটেন, জন্ম: পারসিয়া (বর্তমান ইরান), বড় হয়েছেন আফ্রিকায়। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: সিকাস্তা, দি গোল্ডেন নোটবুক, গ্রাস ইজ সিংগিং, ব্রিফিং ফর এ ডিসেন্ট ইনটু হেল, দি গুড টেরোটিস্ট, কানুপুস ইন আরগোস এবং ক্লেফট

১২. হার্টা মুলার:(১৭ আগষ্ট, ১৯৫৩- ) ২০০৯, দেশ: জার্মান, (জন্ম-রোমানিয়ায়) উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: দি পাশপোর্ট, দি ডেভিল ইজ সিটিং অন দ্যা মিরর, ইভেন ব্যাক দেন দি ফক্স ওয়াজ হান্টার, এ ওয়ার্মর পোটাটো ইজ এ ওয়ার্ম বেড, দি ল্যান্ড অপ গ্রিন প্লাম্প, হাঙ্গার এন্ড সিল্ক

নারী সাহিত্যিকদের জীবন পাঠে নানা চড়াই উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে এগোতে থাকলে সমস্যা ও রোগে আকীর্ণ জীবন সংগ্রামে কারো বা সহিংসতার চিত্র ভেসে ওঠে। মর্মস্পর্শী দুঃখ ও দৈন্যতার ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছে অনেককে। এর ভেতর তারা নিজেদের নিয়োজিত করেছেন লেখায়। তবে পারিবেশিকতার কারণেই অধিকাংশ কোনো না কোনোভাবে উচ্চ শিক্ষা’র (সবার ক্ষেত্রে এটা অবশ্যই প্রাতিষ্ঠানিক নয়) সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছেন, সাংস্কৃতিক জীবনের আস্বাদ লাভ করেছেন; গ্রহণ করেছেন জীবনমুখী শিক্ষা। অতীতের গল্প ও উপকথা তাদের লেখার ভান্ডার সমৃদ্ধ করেছে। স্যালমা ল্যাগারলফ, গ্রাজিয়া দিলেদ্দা, উইচলোয়া সিমব্রসকা ব্যতীত বাঁকি সব সাহিত্যিকই তার নিজ দেশের বাইরে ভিন্ন দেশে, ভিন্ন পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেছেন ও বড় হয়েছেন। আমরা ধরে নিতে পারি, এ রকম পরিস্থিতিতে যে মিশ্র জীবনের স্বাদ তাও কখনো কখনো সাহিত্যিক হতে অনুপ্রাণিত করে থাকবে। নারী মুক্তি ও নারীর অধিকারের জন্য সংগ্রাম করতে দেখা যায় অধিকাংশ সাহিত্যিককে। অনেকে সরাসরি রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েছেন। রাজনীতি না করেও শুধু লেখার কারণে সরকারের কোপানলে পড়েছেন, পড়েছেন সামাজিক রোষানলেও। অর্থাৎ নানা প্রতিকূল জীবনের মুখোমুখি হয়েছেন। আদর্শ বদলেছেন। জীবনের প্রয়োজনে জীবন ভেঙেছেন। অনেকেই ভুগেছেন মানসিক ব্যাধিতে। কেউ বা আজীবন একা থেকেছেন। এভাবেই তারা সৃষ্টি করে গেছেন প্রেম ও মানবতার গ্রন্থিকতা।

দু’একজন সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন সমসঙ্গী যা নিয়ে অনেকে কটাক্ষ করে থাকে। আজকের সমাজে সমবিয়ে ও সমবাস আইনগতভাবে সিদ্ধ হয়েছে আধুনিক বিশ্বে। সাহিত্য পাঠ করতে যেয়ে আমরা হারিয়ে যাই থেম্বির ভালোবাসা পাবার আকুলতা ও সংগ্রামের কাছে। তেমনি হাটো নামের তপস্বী যে পৃথিবী কদর্য হয়ে গেছে বলে তা ধ্বংস হয়ে যাবার প্রার্থনা করতো তারই অসহায় প্রাণীর প্রতি মমত্ববোধ জেগে উঠতে দেখে। যে বোন কবিতা পড়ে না তার সাধারণ কথার ভেতর কবিতাকে জেগে উঠতে দেখে আমরা মুগ্ধ হই। আমরা শিশুদের নানা বিকৃতি ও জটিল অবস্থার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে নিজেদের হাস্যকর করে তুলি- হার্টা মুলার’র ‘পঁচা পেয়ার’ গল্প ভাবের গভীরতা ও ভাষার মাধুর্যতা দিয়ে আমাদের দেখিয়ে দিয়ে যায়। তেমনি টনি মরিসনের গল্পে উঠতি কৈশোর কালে মনের নানা দ্বান্দ্বিকতা ও জটিলতা আমাদের স্পর্শ করে। উঠে এসেছে এলফ্রিক জেলেনিকের লেখায় মেয়েদের জীবনের ক্ষুদ্রতা ও চাওয়ার সীমাবদ্ধতার কথা: যে জীবন শুধু আরাধনা করে স্বামী ও প্রেমিক।

উইসলোয়া সিমব্রসকার পাথরের সঙ্গে কথা বলা কি কঠিন সমাজ জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয় না? নেলি সাক্সের কবিতা আমাদের মহাজাগতিক চিন্তা ভাবের পথে তাড়িত করে। নারীমুক্তি ও নারীর যাতনার কথা গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল যেভাবে বলেন, আমার ভেতরের সেই নারী যাকে আমি হত্যা করেছি/কারণ?/ওকে আমি ভালোবাসতে পারি নি। /ও ছিলো জ্বলন্ত আগুন/ পাহাড়ের ক্যাকটাস ফুল/সে খরা ও আগুন/ কখনো ওর শরীর শীতল হয় নি/।

পার্ল এস বাকের মা’ গ্রন্থটি একসময় আমাকে মায়ের প্রতি সাধারণ মনোভাবটাই পাল্টে দেয়। তার জীবনস্পর্শী লেখা নাড়িয়ে দিয়ে যায় সনাতন ভাবনাক্রান্ত জীবন ও আবিষ্ট সমাজ ব্যবস্থাকে।

আমরা পড়ি। ভাষার ও ভাবের আধুনিকত্ব আমাদের টেনে নিয়ে যায়; সাবলিল অনুবাদের কারণেও বলা চলে আমরা আরও জানতে আগ্রহী হয়ে উঠি এ বিশ্ব বরেণ্যদের জীবন ও সাহিত্য। আসলে এ গ্রন্থে একটি দু’টি গল্প বা কবিতা যা সাহিত্য মানে যেটুকু অনেকটা বলা যায় তরকারীর লবন চাখার মতো। এ শুধু আগ্রহ বাড়াতে পারে। এত বিষদতা এ ক্ষুদ্র কলেবরে সম্ভবও নয়। আমরাও অশ্রুসিক্ত হই সালেহা চৌধুরীর মতো সালমা ল্যাগারলফের ঋণ ও তা পরিশোধের কাল্পনিক চিন্তা দেখে। হার্টা মুলার তার মায়ের রুমাল নেয়ার ঘটনার ভেতর এক মর্মস্পর্শী জীবনের গল্প বলে গেছেন তার নোবেল বক্তৃতায়। বিখ্যাত মানুষদের জীবনী পড়লে অনেক সময়ই দেখা যায় তারা জীবনের বৈরিতা ও কদর্যতায় ক্রুদ্ধ হয়ে আত্মহত্যার শিকার হন। কিন্তু আমাদের এ বারো জন সাহিত্যিকের মধ্যে তা দেখতে না পেয়ে আশান্বিত হই। সংগ্রাম ও সাহসে নিজেকে সম্পৃক্ত করার অনুপ্রেরণা পাই। সালেহা চৌধুরী’র বদান্যতায় বারোজন বিশ্ব সাহিত্যিক এক মলাটবন্দি।

যে সাহিত্য ছিলো আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে, যে দেশ ও সংস্কৃতি আমাদের অজানা তা-ই আজ দৈনন্দিনতার অংশ হয়ে মুক্ত করছে মনের আকাশ। আমরা অভিভূত, আমি অভিভূত! যতই পড়ছি গল্প, কবিতা আর তাদের বৈচিত্রময় জীবন আকর্ষণ করছে, অভিজ্ঞতা সঞ্চিত করছে মনের তৃষিত পটভূমি। সাথে সাথে মনে পড়ছে সালেহা চৌধুরীর কথা। নিজের দেশ সমাজ থেকে দূরে থেকে তিনি হয়ে উঠছেন বিশ্বজনের। তাইতো তার প্রাণের টান বিশ্বকে বাঙ্গালি পাঠকের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়া; সাথে জ্ঞানের পরিধি ব্যাপ্তির তাড়নায়ও হয়তো এ কর্ম প্রয়াস। যিনি দিনের পর দিন রাতের পর রাত পরিশ্রম ও সংগ্রাম করে সংগ্রহ করেছেন, বিশ্ব সাহিত্য কুড়িয়ে তোলা ফুল গ্রন্থিত করেছেন। যা আমাদের এবং আগামী প্রজন্মকে সমৃদ্ধ করবে তা বলারই অপেক্ষা রাখে না। বইয়ের সম্পাদনার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি আমার মনে হয়েছে বা বই পাঠে কিছুটা বাধাগ্রস্ত করেছে তা হলো সর্বশেষ সাহিত্যিকের নাম প্রথমে লেখা। যে কারণে আমাকে বইয়ের শেষের দিক থেকে প্রথম দিকে আসতে হয়েছে। কেননা আমার আগ্রহ প্রথম নারীকে দেখা বা তার ধারাবাহিকতাটুকু। আবার সেখানেও আরেকটি বাধা নোবেল ভাষণ পড়তে গিয়ে শেষে যাওয়া। মনে হয়েছে নোবেল বক্তৃতাটা সাথে আসলে কি হত? একইসাথে জীবন, সাহিত্য ও নোবেল ভাষণ। বার বার ১০০১টি বই এর কথা বলা এবং সাহিত্যিকের জীবনী বলতে গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি প্রকাশ যেন পাঠে কিছুটা ছন্দ পতন এনেছে। যা তিনি ভূমিকায় বলতে পারতেন বলে আমার মনে হয়েছে। যাইহোক, সালেহা চৌধুরী যা ভাল মনে করেছেন সেভাবে লিখেছেন। এটা ব্যক্তি বিশেষের রুচি ও পছন্দের ব্যাপার। সবশেষে বলা যায় সালেহা চৌধুরীর এ গ্রন্থ এক আলোকবার্তিকা হয়ে সব মহলের সকল পাঠকের মনকে আলোকিত করুক আর সালেহা চৌধুরীকে দিক আরও দীর্ঘ জীবন যেন তিনি বিশ্বনন্দিত হয়ে উঠতে পারেন তার শৈল্পিক কাজের জন্য।


  • ৩২৮ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

খাতুনে জান্নাত

কবি, প্রাক্তন শিক্ষক ও প্রশিক্ষক।

ফেসবুকে আমরা