বিকাশ মজুমদার

কবি, অনুবাদক, ব্লগার

মাননীয়, এই পরিস্থিতির দায় আপনার

বাঘা যতিনের ভাষ্কর্য ভাঙলেও বাঘা যতিনের কিছু যায় আসে না। ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দিলেও মৃত যতীন্দ্রনাথ মুখার্জি তার নাম ফিরিয়ে আনার জন্য বাঘ হয়ে তাড়া করবে না। তার নাম বা ভাষ্কর্য থাকলো না গোল্লায় গেলো তা নিয়ে বাঘা যতিনের নিজের আর কোনো দায় নেই, তার ব্যক্তিত্বেরও কোনো ক্ষতিবৃ্দ্ধি হবে না। যার মাথা ও পাছা পরকালে লিজ দেয়া তার খবর জানি না কিন্তু ক্ষতি হবে আমার, আপনার ও আপামর বাংলাদেশের, একটুখানি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন জনগণের যাদের কাছে এখনো স্বাভাবিক বলে মনে হয় মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা তাদের জন্য দুশ্চিন্তা। কারণ এই ভাষ্কর্য ভাঙাভাঙি চলবে নাকি বন্ধ হবে তার উপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি এবং আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

বহু দেনদরবার করে ও দরকষাকষির ফলে হয়তো সাময়িকভাবে বঙ্গবন্ধুর ভাষ্কর্য রক্ষা পেলেও শেষরক্ষা হবে না। সেই পরিস্থিতি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ নিজেরাই সৃষ্টি করছে। ক্ষমতা আঁকড়ে ধরতে যে ফ্রাংকেনস্টাইনের জন্ম দিয়েছে তার চরিত্র আমরা জানি। সিরিয়া থেকে শুরু করে আফগানিস্তান বা পাকিস্তান পর্যন্ত সেই দানবের ধ্বংসাত্মক চেহারার সাথে আমরা পরিচিত এবং এখানে এই প্রসঙ্গে মাত্র দুইটা উদাহরণ সংযুক্ত করতে চাই।

২০১৪ সালে আইসিস সারা বিশ্বে খেলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়ার পরে ২০১৫ এর মে মাসে সিরিয়ার পালমিরা দখল করে। এরপর বিভিন্ন সময়ে ওরা বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ ছাড়ে যেখানে দেখা যায় ওরা হাজার হাজার বছর পুরনো নিদর্শনগুলো ধ্বংস করছে। মিউজিয়ামটাকে ওরা ব্যবহার করেছে আদালত আর কারাগার হিসেবে, প্রাচীন রোমান অ্যাম্ফিথিয়েটারটাকে (ওখানে নাটক, যাত্রা হতো, সেটাকে) ব্যবহার করেছে জনসম্মুখে হত্যা করার জন্য। ব্যাপারটা অনেকটা এমন। আজ যেখানে শাহবাগ জাদুঘর, সেটার সদর দরজাকে ব্যবহার করা হবে সর্বসম্মুখে আমাদেরকেই হত্যা করার জন্য। এই নিদর্শনগুলোর কেয়ারটেকার খালিদ আল আসাদকে এরা ঐ মিউজিয়ামের দরজার সামনেই শিরচ্ছেদ করে হত্যা করেছে।

আফগানিস্তানের বামিয়ান উপত্যকায় বুদ্ধের ভাষ্কর্য ছিলো পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ শিল্পকলার নিদর্শন। ২০০১ সালের মার্চ মাসে তালিবান নেতা মোল্লা ওমরের নির্দেশে ডিনামাইট বিষ্ফোরণে ধ্বংস হয়ে যায় ষষ্ঠ শতাব্দীতে নির্মিত প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরনো ঐতিহাসিক দুটো বুদ্ধের ভাষ্কর্য। বামিয়ান উপত্যকায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৫০০ মিটার বা ৮২০০ ফুট উচ্চতায় একটি আস্ত পর্বতকে খোদাই করে বানানো হয়েছিলো শিল্পকর্মগুলো। বড় মূর্তিটির উচ্চতা ছিলো ৫৫ মিটার আর ছোটোটির উচ্চতা ছিলো ৩৫ মিটার। এছাড়াও ঐ অঞ্চলের পর্বতগাত্রে আরও অনেক অপেক্ষাকৃত ছোটো ছোটো বুদ্ধমূর্তিও খোদাই দেখতে পাওয়া যায় যেগুলো প্রাচীন গান্ধার শিল্পকর্মের নিদর্শন। ইউনেস্কো এই মূর্তিগুলিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা দিলেও শরিয়ার ডিনামাইট থেকে রক্ষা করতে পারে নাই। এমনকি জাপান, সুইৎজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের অনুরোধেও শান্তিপূর্ণ আক্রমণ থেকে বুদ্ধ রক্ষা পায় নাই। এমনকি জাপান নিজ খরচে বুদ্ধের মূর্তি জাপানে সরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব পর্যন্ত দিয়েছিলো।

বাঘা যতিন ভাঙার অপরাধে যুবলীগের লোক ধরা পড়ছে। ইতিপুর্বে হিন্দুদের মন্দির, মূর্তি ভাঙা গেলে পাগল ধরা পড়তো। উন্নয়নের রাজনীতির খেলায় জিডিপির গ্রাফ দিয়ে সিরিয়া, আফগানিস্তান ঢুকে পড়ছে বাংলাদেশে আওয়ামীলীগের হাত ধরে। পদ্মাসেতুর এই সুন্দর সড়কপথে সুড়ুৎ করে শান্তিবাহিনী এক জায়গা আক্রমণ করে ভাষ্কর্য ভেঙে, সংস্কৃতি ভেঙে দ্রুত আরেক জায়গায় আক্রমণে চলে যাবে। পুলিশ যেভাবে জড়ো হয়ে চান্দের সাইদি হুজুরকে প্রিজন ভ্যানে সালাম দিয়ে বিদায় দেয় সেভাবে সম্মান দিয়ে একদিন ক্ষমতাতেও বসাবে। শুধু অপেক্ষা করেন গণতন্ত্রের মানসকণ্যা। আপনিই এই পরিবেশ তৈরি করছেন যেখানে আপনার বিক্রয়যোগ্য প্রোডাক্ট বঙ্গবন্ধু আর চেতনার বাণিজ্য মুক্তিযুদ্ধকেও রক্ষা করতে পারবেন না। আপনাদের কোনো সমস্যা হবে না, বিভিন্ন দেশে বিলাসবহুল সেকেন্ড হোম আছে। মরবো শুধু আমরা যখন ভাষ্কর্য ভাঙা হয়ে গেলে বোমা বিষ্ফোরিত হবে চলন্ত বাসে, শপিংমলে। কিছুদিন পর ঘরের বাইরে বেরোনোর আগে পকেটের ডায়রিতে লিখে রাখবো রক্তের গ্রুপ আর বাসার ঠিকানা যাতে বোমার আঘাতে বেঁচে গেলে দ্রুত রক্ত দিতে পারে আর মরে গেলে বাসায় লাশ পৌছে দিতে পারে।

সম্প্রতি উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ পিছনে ফেলেছে প্রতিবেশি বিভিন্ন দেশকে। দ্রুত মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হচ্ছে সোনার বাংলা। একই সাথে জ্ঞানের সূচকে তলানিতে আছে সোনার বাংলা শ্মশান হওয়ার অপেক্ষায়। এই দায় আপনার।

635 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।