মহুয়া ভট্টাচার্য

চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদী পত্রিকার 'খোলা হাওয়া' পাতায় লেখালেখির শুরু। এবারের বইমেলায় একটি ছোটগল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। বইয়ের নাম - " মহুয়ার গল্প।"

বীথি সপ্তর্ষির জন্য শুভকামনা

ফেসবুকে বিথীর সাথে আমার পরিচয় খুব বেশিদিনের নয়। অল্প ক'দিনের পরিচয়ে  কাছের জন হয়ে উঠেছে সে আমার। আমি খুব স্পষ্ট কথা বলা, নারীর মনে সাহস যোগানো এই নারীদের সাথে গা ঘেঁষে ঘেঁষে থাকি, তাদের পোস্টে লেপ্টে থাকি নিজেও পোড় খাওয়া মানুষ বলে। সুপ্রীতি দি কিংবা চৈতী দি কিংবা মুনমুন আপা এদের মনে হয় কতদিনের চেনা। ফেসবুকের শত সহস্র খারাপ দিক থাকলেও, ফেসবুকের মাধ্যমে আমি বাঁচার পথ খুঁজে পেয়েছি এটা আমাকে বলতেই হবে। না, এরা কেউ আমাকে আমার সমস্যা থেকে বের করে আনতে কোনো প্রত্যক্ষ পদক্ষেপ নেননি, কিংবা আমিও ব্যক্তিগতভাবে তাদের কাছে গিয়ে কখনো বলিনি। তাঁরা তাঁদের জোরালো লেখনীতে মনে সাহস জুগিয়েছেন। নিজের লড়াইটুকু তো নিজেকেই লড়তে হয়। বিথী সপ্তর্ষি সেই লড়াই এতদিন লড়ে গেছে, তার হাস্যোজ্জ্বল মুখে সেই লড়াইয়ের তাপ উত্তাপের আভাস পাইনি আমরা। অবশেষে সে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। জীবনের চরম দুঃসময় ও তিক্ত অভিজ্ঞতার দায় দেনা শোধ করে সে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। 
 
কিন্তু আজ বিথীর এই ঘটনা আমাকে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, আমি আমার অতীত দেখতে পাচ্ছি স্পষ্ট। কোনো নারী শারীরিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছে, তাতে সংবেদনশীল মানুষের অনেক ভূমিকা  থাকে। বিশেষ করে নারীটি যখন এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সাহায্য চান, তাকে কোনভাবেই পারিবারিক কিংবা ব্যক্তিগত বিষয় বলে সমাজ তার দায় এড়াতে পারে না। যে ঘটনার প্রত্যক্ষ স্বীকার হয়েছিলাম আমি নিজে।
 
আমি আহত হওয়ার এক পর্যায়ে বাড়ির মালিকের শরণাপন্ন হয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি। আমি শারীরিক নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে প্রথম আকুতি জানিয়েছিলাম বাড়ির মালিকের কাছেই। তিনি এটিকে পারিবারিক বিষয় বলে এগিয়ে আসেন নি। পরে সাড়াশব্দ না পেয়ে তাঁর স্ত্রী আমার ঘরের জানলা ফাঁক করে মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে দেখছিলেন আমি কতটা আহত হয়েছি।
 
আমার প্রতিবেশী মহিলা আইনজীবী যিনি চট্টগ্রামের সুপরিচিত মুখ, আমাকে কোনো প্রত্যক্ষ আইনি সহায়তা করেননি কারণ তিনি মোটিভেটেড হয়েছিলেন -সংসার ভেঙে দেওয়া পাপ, এতে আমার বাচ্চাদের গজব পরতে পারে তাঁর উপর। আমি এনেক্স ভবনের দুয়ারে দুয়ারে ইতরের মত দৌড়েছি। কেউ তখন বলেনি, সঙ্গীর প্রতি শারীরিক নির্যাতন কখনো ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক বিষয় হতে পারে না। আমি মনে করি যারা এসব বলে দায়িত্ব এড়িয়ে ভালো মানুষ সাজতে চান, তারাও সমান অপরাধী।
 
তাদের এড়িয়ে যাওয়াতে অন্যায়কারী প্রশ্রয় পেয়েছে, নিজেকে চূড়ান্ত শক্তিশালী ভেবে আরও দ্বিগুণ বলীয়ান হয়েছে। কোনো অসহায় নারী শারীরিক কিংবা মানসিকভাবে অত্যাচারিত হওয়ার ঘটনায় যারা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, পারস্পরিক বিষয় বলে চুপ করে থাকে তাদের প্রতি নিন্দা জানাই। অত্যাচারকারী যেমন ঘৃণা ও শাস্তির যোগ্য, যারা অত্যাচার দেখেও নিঃশ্চুপ থাকে, তারাও সমান অপরাধী। অপরাধীর বিচার করবে আইন, প্রশাসন। তাতে তার ফাঁসি হোক কিংবা জেল। কারো অধিকার নেই অন্যের গায়ে হাত তোলার। সঙ্গীর গায়ে হাত তোলার অপরাধ জঘন্য, ন্যাক্যারজনক। এদের কোনো সামাজিক প্রশ্রয়ের ছায়া দেওয়া উচিত নয়।
 
সবশেষে, বীথির তোমার জন্য ভালোবাসা ও শুভকামনা। দেরীতে হলেও তুমি পেরেছো। তুমি পারবে। তোমাকে পারতেই হবে। নারী স্পষ্ট হোক, প্রতিবাদী হোক। সমাজের কর্ণকূহরে প্রবেশ করুক এই চিৎকার, অচলায়তন ভাঙ্গুক।
 

1077 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।