আমার #metoo: পুরুষকে নিপীড়নে না দেখলে অপরিচিত লাগে

শনিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৮ ৪:০০ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


খুব ছোটবেলায়ই আমাকে চারপাশ বুঝতে শিখিয়েছে কিছু নরপশুর কাছে আমার এই শরীর বেশ উপাদেয় মাংসপিণ্ড। তারা খুব আপন হয়ে আশেপাশে বিচরণ করে কিন্তু পরিবেশের সাথে বদলে যেতো তাদের আচরণ। #metoo আমার বহু বছর জমে থাকা কিছু ক্রোধ কিছু অস্থিরতা কিংবা আমাদের অসহায়ত্বের গল্প। আমার এই খণ্ডগল্পগুলো প্রায় মেয়েরই জীবনে ঘটে যাওয়া গল্প।

তখন খুব ছোট, স্কুলে যাই কি যাই না। আমার এক প্রতিবেশী ভাইয়া খুব আদর করতো আমায়। একদিন কোলে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলে চল তোকে চকলেট কিনে দেই। ফেরার সময় এক নির্মাণাধীন বাড়ির মধ্যে নিয়ে খুব জোরে আমাকে চিপে ব্যথা দিতে শুরু করে। ভয়ে চিৎকার করে কাঁদতে থাকি। মিস্ত্রি নীচে নেমে আসলে সে বলতে থাকে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়ে কাঁদছে। সে আমাকে নিয়ে বের হয়ে বলতে থাকে আমি তোকে কত্ত আদর করি এত্ত ভয় পেলি কেনো।

ওই ছোট্ট আমি সেদিন পরিচিত হয়েছিলাম নোংরা এক আদরের সাথে যেটা খুব ভয়ংকর কুৎসিত যন্ত্রণাদায়ক। আম্মুকে বলেছিলাম, আম্মু যখন শুনছিলো তখন তার শুষ্ক এক ভয়ার্ত মুখচ্ছবি দেখেছিলাম। তারপর আমাকে বললো আর যেও না তার সাথে। বাইরে খেলতে যেও না। একা কারো বাসায় যেও না। তাকে কিচ্ছু বলে নি, উল্টা আমার হাজারটা বিধি নিষেধ। কি রাগ হলো আম্মুর উপর! ছোট্ট আমি সেদিন বুঝলাম এই গল্প বলে আমিই উল্টা রেস্ট্রিকটেড হলাম। এগুলো বলা মানে নিজের স্বাধীনতা খর্ব করা। না আম্মুর উপর রাগ নেই, এখন বুঝি আমাদের মায়েরা মেয়ে সন্তান নিয়ে কী ভয়ে দিন কাটান। সমাজের সিস্টেম এমন যে হারালে শুধু মেয়েদেরটাই হারায়, তাই মায়েরা মেয়েদের বন্দী করে বাঁচাতে চায়। আমার আটপৌরে মাও তার ব্যতিক্রম নয়।

তখন আমি ক্লাস টু'তে পড়ি মনে হয়। আব্বু মঞ্চ নাটক করতেন, সাথে আমিও। পুরো নাটকের দল রিজার্ভ বাস নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছে। যমুনা নদীতে ফেরীতে প্রায় আট ঘন্টা আটকে ছিলাম কুয়াশার কারণে। বাসে গান বাজনা চলছে এবং নিজেদের মতো করে সময় উপভোগের চেষ্টা। এক আংকেল আমাকে আদর করে আম্মু এদিকে আসো বলে কোলে বসালেন। কিছুক্ষণ পর আবিস্কার করলাম তিনি খুব জোরে আমাকে কোলে প্রেস করছেন এবং শক্ত কিছু লাগছে। চেনা অস্বস্তি। খুব জোরে বলে উঠি আব্বুর কাছে যাবো। আংকেলরা হেসে বলে উঠে, বাশার ভাই আপনার মেয়ে দেখি সেই বাপ নেওটা। ছোট্ট সেদিন আমি বুঝে গেলাম পুরুষের কোলগুলো ভয়ংকর শুধু এই কোলটাই নিরাপদ। তখন বাস ভর্তি সবার মাঝে এই ছোট্ট শিশুটি কি মানসিক যন্ত্রণা পুষছিলো কোনো পুরুষ কোনোদিন বুঝবে না এ যন্ত্রণা। শুধু মেয়েরা জানে এই কষ্টগুলো।

আমি সেভেন'এ পড়ি। আম্মু ঢাকায় গেছে মামার বাসায় মামাতো বোন হয়েছে তাকে দেখতে। বাসায় ফুপুকে রেখে। ফুপাতো ভাই অনার্সে পড়ে তখন। বাসায় এসেছে। টিভি দেখছি একসাথে। ফুপু ঘুমায়। হঠাৎ পাশে বসে ঘাড়ে হাত দিয়ে গালে কিস করে বুকে হাত। আমি চিৎকার করে বলছি, এই ভাইয়া কি করো? সে টানতে থাকলে আমি ঝটকা মেরে চিৎকার করি, আর কোনোদিন যেনো এ বাসায় না দেখি বলে গেট খুলে দৌড়ে বাসা থেকে বের হয়ে পাশের বাসায় এক আপুর কাছে গিয়েছিলাম। কাঁদতে কাঁদতে আপুকে বলছিলাম। আপু বলে, থাক এখন বাসায় যাস না। আমার কাছে থাক। পরে সন্ধ্যায় আব্বু খুঁজতে আসলে আব্বুর সাথে বাসায় যাই। মাথায় তখনও সেই পৈশাচিক যন্ত্রণা। বাসায় ঢুকে দেখি সে চলে গেছে, দেখে স্বস্তি পেলাম। ফুপু আমাকে দেখে বকছে, হুটহাট না বলে বাসা থেকে বের হও। আব্বুকে বলছে তোর মেয়েকে যা বানাচ্ছিস! কোনো আদব কায়দা নাই বড় ভাইয়ের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় তাও জানে না। ফুপুর ভাষ্যমতে আমি এতো বাজে আচরণ করেছি যে ভাইয়া কষ্ট পেয়ে চলে গেছে। সে যাবার আগে মায়ের কাছে ইচ্ছে মতো গল্প বানিয়ে বলেছে। হঠাৎ রাগ টা যেনো কান্না হয়ে গলার কাছে দলা পাকিয়ে খুব কষ্ট দিতে লাগলো। তখন বুঝলাম দুপুরে যা ঘটেছে আমি আসলে আব্বু ফুপু কারো সাথেই শেয়ার করতে পারবো না।

ভাইয়াগুলো ভীষণ ভয়ানক। ওরা এখনও সুযোগ পেলে আমার চরিত্রের বারোটা বাজায় কিন্তু তাদের মুখোশ আমি খুলতে পারি না।

এক আংকেল প্রায়ই আমাদের বাসায় আসতেন। খুব আড্ডা হতো আব্বু আম্মু আংকেলের। একদিন আমার রুমে এসে আমার সাথে গল্প করতে করতে আমার থাই এ কেমন বাজেভাবে হাত বুলাতে থাকে। চেনা অস্বস্তি। খুব শান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম হাত সরান! মানুষের মুখে এক ভয়ার্ত জানোয়ারের প্রতিচ্ছবি দেখেছিলাম। তারপর অনেকদিন আমাদের বাসায় আসে নি। আব্বু খুব চিন্তিত, কেনো আসে না। একদিন আব্বু এসে বলে আংকেল তোমাকে অংক করতে যেতে বলেছে উনার বসায়। সেদিন নাকি তোমাকে যতো অংক করতে বলেছে তুমি কোনোটাই পারো নি। খুব চিন্তিত তোমাকে নিয়ে, খুব খারাপ অবস্থা নাকি তোমার অংকে। যেও এখন থেকে। ঠিক সেই শান্ত চোখে বলেছিলাম, না, আমি যাবো না। আব্বু বিরক্ত হয়ে বলেন, কি সমস্যা? আমি খুব চিৎকার করে উগ্রভাবে বলেছিলাম, বলছি আমি যাবো না। যাবো না ব্যাস। আমার অংক আমি বুঝবো। আব্বু প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে বলেছিলো, এমনি কি আর আত্মীয়স্বজন বলে তোমার আচরণ খারাপ। আব্বু, আমি তোমাকে সেদিনও আংকেলের নোংরা পাশবিক চোখের গল্পটা বলতে পারি নি। শুধু চিৎকার শুনেছো ভিতরের ক্ষতটা বোঝাতে পারি নি।

ছোটবেলায় প্রতিবাদগুলো জোড়ালো ছিলো না, আক্ষেপ হয়। আজও নিপীড়িত হই, এগুলো অন্যরকম। খুব কাছের মানুষ সেজে আসে, আমাকে নিয়ে কতটা চিন্তিত জানায়। আরও জানায় সমাজে একা মেয়ের জীবন কতোটা ভয়ংকর। সমাজ আমাকে ভালোভাবে থাকতে দেবে না। কিন্তু রাতের আঁধারে বদলে যায় তাদের রূপ, ভয়ংকর সমাজের প্রতিনিধি তারাই।

সেটা ছিলো একটি ভয়ংকর রাত। এক বন্ধুর ভিডিও কল বাঁচিয়ে দিয়েছিলো সেই রাতে। তবে রাস্তার পশুগুলোকে যেভাবে প্রতিবাদ করি কিন্তু খুব ভদ্র চেহারার কাছের মানুষরুপীগুলোর নিপীড়নের প্রতিবাদ কি তত জোড়ালোভাবে পারি? না, পারি না। ওরা ভালো স্বামীর মুখোশ এঁটে থাকে। ভালো বাবার মুখোশ এঁটে থাকে। যে মেয়েটা স্বামীর এই ভালো মানুষের চেহারায় অভ্যস্ত তার বিশ্বাসটা ভাঙতে কষ্ট হয়। তাই হয়তো তাদের মুখোশ আর খোলা হয়ে ওঠে না। ওরা প্রোফাইল পিকচারে সুখী দাম্পত্য জীবনের ছবি রাখে। বৌকে সোনা হানি ডেকে মুখে ফেনা তুলে কিন্তু সুযোগ পেলে বদলে যাবে এক নিমিষে। প্রগতিশীলতার বয়ান দিয়ে ফ্রেঞ্চ কিস করতে চাইবে, কোমর ধরতে চাইবে হা হা।

এখন আর রাগ হয় না, হাসি পায় কারণ তাদের কাছ থেকে এমন আচরণ না পেলে অংকটা যে মেলে না।

তবে এসব পুরুষ যত দেখি কিছু পুরুষের প্রতি এখন সম্মান তত বেড়ে যায়। ওই পশুগুলোর পাশাপাশি ঠিক এই সত্যিকার অর্থে ভদ্র, এদেরও অস্তিত্ব বিদ্যমান!

তবে যাই হোক, শুধু বলি, মেয়ে তুমি তোমার ভালো বুঝতে শেখো। তোমার জায়গা থেকে সোচ্চার হও। শুধু এতটুকু বুঝিয়ে দিও তুমি একটা মাংসপিণ্ড নও।

তোমার ছেলেবন্ধুরা যখন কোনো মেয়ের চিকন কোমর, সুডৌল স্তন কিংবা আটসাট জিন্সে হিপ নিয়ে হঠকারিতাতে মেতে ওঠে, তার প্রতিবাদ করো, তাল মিলিও না। তোমার স্বজাতিকে রক্ষার দায়িত্ব তোমার।

প্রিয় বাবা মা, আপনার মেয়ে সন্তানটিকে যেমন শালীন পোষাক নিয়ে শিক্ষা দিচ্ছেন, প্লিজ! ছেলে সন্তানটিকেও চোখের শালীনতার শিক্ষা দিন। আপনার মেয়ে সন্তানটি নষ্ট সময়ে এই পৃথিবীতে, কিচ্ছু করার নেই তাকে জানিয়ে দিন একটু একটু করে। তাকে রক্ষার দায়িত্ব যে তারই! তার সাথে নোংরা কিছু ঘটলে সে যেনো সহজভাবে বলতে পারে এই জায়গাটা তৈরি করুন ।

ভাইয়ারুপি কাজিনরা কখনও কখনও বেশ ভয়ংকর। আপনার সন্তান তার সাথে সহজ না হলে প্লিজ খেয়াল রাখুন। এমনকি খুব আদর করছে যে আংকেল তার উপরেও নজর রাখুন। এই পশুগুলোর কাছে বয়স সম্পর্ক কিছুতেই কিছু আসে না, নারী শরীর এটাই মুখ্য।

(অনেকদিন পর আমার এই চাপা ক্রোধগুলো লিখতে পেরে হালকা লাগছে, যে কথাগুলো কোনোদিন পারি নি বলতে।)


  • ৮৮৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

বর্ণী এবিদ

ডিজাইনার

ফেসবুকে আমরা