চৈতী আহমেদ

প্রধান সম্পাদক, নারী

হেলেনা অব ট্রয়

তিনি চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গেছেন। কয়েকদিন ধরে হুমায়ুন কল করতেছেন -ভাবি আমার জন্য গাড়ি ভাড়া পাঠান আমি ঢাকায় আসবো। হুমায়ুন আমার দেবর। উনার সাথে আমার খুব বেশি দেখা সাক্ষাৎ নাই। কবির মুখেই হুমায়ুন সম্পর্কে জেনেছি -হুমায়ুনের মাথা খারাপ ছোটো বেলা থেকেই। বিয়া দিলে পাগল সেরে যাবে এমন ধারণা থেকে পারিবারিক ভাবেই হুমায়ুনকে গ্রামেরই এক গরীব পরিবারের মেয়ের সাথে বিয়ে দেয়া হয়েছে। আমার এই দেবরানীকে অবশ্য আমি আমার বিয়ের আগেই দেখেছি। তখন কবির সাথে আমার প্রেম। সেই সূত্রেই তার সেগুন বাগিচার বাসায় আমার যাতায়াত। তো দেবরানী প্রায় কবির ঢাকার বাসায় এসে থাকতেন। ঘরদুয়ার পরিস্কার করে দিয়ে যেতেন। কখনও সাথে শাশুড়ি থাকতেন কখন একাই আসতেন শপিং করতে বা ডাক্তার দেখাতে। দেবরানীর রান্না করে ভালো। আমাকে আর কবিকে মজাদার সব রান্না করে খাওয়ান, যখনই আসেন। দেবরানীর স্বামী পাগল বলে তার প্রশ্রয় ছিলো না বাসায়। আমার এই দেবরানী খুব ধারালো চেহারার তরুণী। সুন্দরী বলাই যায়। একটা পুত্র সন্তানের মা। সাজতে, মুখে লেবু এবং কাঁচা হুলুদ মাখতে পছন্দ করতেন। আমি তাকে সাথে করে শপিংয়ে নিয়ে গিয়েছি বেশ কয়েকবার। দেবরানীর নাম হেলেনা।

একদিন হুমায়ুন অফিসে এসে হাজির। আমার রুমে ঢুকে সামনের চেয়ারে বসে পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে দিয়ে বললেন ভাবি একটা কবিতা লিখছি, আপনিতো কবির প্রেমিকা, কবিতাটা একটু দেখে দেন। আমি হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিয়ে কবিতা পড়লাম বেশ ঝকককে সুন্দর হাতের লেখায় হেলেনার বিশ্বাসঘাতকতামূলক কবিতা। শিরোনাম ‘হেলনা অব ট্রয়‘ আমি বললাম ভালো কবিতা হয়েছে, তিনি আমাকে বললেন কবিতাটা ইত্তেফাকে পাঠাই দেন, বলেই উঠে দাঁড়িয়ে বিড় বিড় করে বললেন হেলেনা ভালো নেই ভাবি, হেলেনা ভালো নেই। আমি বললাম কি হয়েছে হেলেনার? ভালো নেই কেনো? বললো আপনি বুঝবেন না। একশো টাকা দেন হেলেনার জন্য গিফট কিনবো। আমার টাকা নেই তাই হেলেনা আমাকে ভালোবাসে না। আমি হুমায়ুনের প্রলাপ শুনে হাসলাম। টাকা নিয়ে তিনি চলে গেলেন। পরে আমি কবির সাথে হুমায়ুনের সাথে সংলাপ বিনিময় এবং কবিতা কাহিনী বলে হাসলাম

-হুমায়ুনওতো বেশ কবিতা লেখেন! কবি গম্ভীর হয়ে বললেন ও পাগল ওকে প্রশয় দিও না। সারাক্ষণ এর তার কাছে আমার বদনাম করে বেড়ায়। শুনে আমারও খুব রাগ হলো।

সেই হুমায়ুন আমাকে ক‘দিন ধরেই ফোন করছেন, তিনি ঢাকায় আসতে চান, আমার সাথে উনার জরুরি কথা আছে। আমি ইতস্তত করায় বললেন

-আমি আমার ভাস্তিকে দেখতে চাই! আমার মনটা ভিজে গেলো। কবি কি এক অদ্ভুত কারণে মা ছাড়া পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে ঠিক মাখামাখি করতে দেন না। পরিবারের প্রায় সব সদস্যদের তিনি বলেন ওরা শত্রুপক্ষের লোক।

হুমায়ুন জানেন উনার ভাই দেশে নাই। আমি কিছুটা অসুস্থও। আমি উনাকে বললাম -আপনি আম্মা বা আর কারো কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসেন, আমি এখানে আসলে আপনাকে দিয়ে দেবো। হুমায়ুন আসলেন। বেশ অনেকক্ষণ সোফায় বসে নিজের মাথায় হাত বুলালেন। আমি মটরিকে বললাম মেয়েকে নিয়ে আসতে। কিন্তু উনি ভাস্তির বিষয়ে কোনো আগ্রহ দেখালেন না। মটরি চা এবং বিস্কিট দিয়ে গেলো। তিনি সেগুলো ছুঁয়েও দেখলেন না। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম জরুরি কথার জন্য।

হঠাৎ বললেন আপনার স্বামীতো আমার জীবনটা ধ্বংস করে দিলো। আমি ঢোক গিললাম! মনে মনে ভাবলাম কবিতো বলেছেন হুমায়ুন পাগল। আমার উচিত হয় নি উনাকে বাসায় আসতে দেয়া।

-আমার হেলেনা আমার সাথে ঘুমায় না। আমাকে সহ্য করতে পারে না। আপনার স্বামী গ্রামে গেলে তার সাথে হেলেনা ঘুমায়। আপনার স্বামীর কতবড় সাহস আমার সামনে থেকে আমার হেলেনাকে নিজের বিছানায় ডেকে নিয়ে যায়। আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নামছে ঠান্ডাস্রোত ধারা। আমি হতভম্ভ হয়ে প্রশ্ন করলাম।

-এইসব আপনি আমাকে কেনো বলতে এসেছেন? মাকে কেনো বলে দেন নি? বা অন্য কাউকে? -বলছি। আপনার স্বামী আমাকে পাগল বলে খুব মারছে। মা জানে, ভাইরা সবাই জানে, মুকুল জানে, ফরিদা জানে, এরা কেউ তো তার মুখের উপর কথা বলতে পারে না। আপনার স্বামী টাকা দেয়া বন্ধ করে দিলেতো সব না খাইয়া মরবে। আমি কি, আমিতো টাকা দিতে পারবো না। হেলেনাও আমাকে ভালোবাসে না।

আমার ছেলেটাও আমাকে বাপ বলে গণ্য করে না। আমিতো পাগল। শুধু মা আমাকে ভালোবাসে আমি বুুঝি। আগে আমি নিজেকে বুঝ দিতাম

-যাক, আমার ভাইয়ের বউ নাই। কিন্তু এখনতো আপনি আসছেন। গত সপ্তাহে সে যখন দেশে গিয়েছিলো তখনও হেলেনাকে আমার কাছ থেকে ডেকে নিয়ে গেছে। বলেন এটা অন্যায় না? আপনি কেমন স্ত্রী? আপনার স্বামী...... আমি উঠে হুমায়ুনকে দুই হাজার টাকা দিলাম। হুমায়ুন টাকা নিলো না। বললো আমাকে শুধু গাড়ি ভাড়াটা দেন যাতে আমি হেলেনা অব ট্রয়ের কাছে ফিরে যাইতে পারি। নিজেই টেবিল থেকে পাঁচশো টাকা তুলে নিয়ে বললো -একটা অনুরোধ করি আপনার স্বামীকে বলবেন না আমি আপনাকে সব বলছি। আমাকে খুব মারবে! আমি পাগল মানুষ!

ভাঙন শুরু হয়েছিলো মেয়ে পেটে থাকতেই, এই পাগলের সাথে কথা বলে আমিও সম্ভবত পাগলই হয়ে গিয়েছিলাম।

আমি দুঃখিত হুমায়ুন! এই লেখার পরে হয়তো আপনার উপর, মা‘র উপর নির্যাতনের খড়গ নেমে আসবে, বরাবর যেমন নেমেছে। আমাকে আগামী সময়ের জন্য সব লিখে যেতে হবে। চলবে...

 

1087 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।