হতাশাগ্রস্ত দেবতাকূলের হতাশার অবসান হোক

বৃহস্পতিবার, জুন ২৭, ২০১৯ ১০:০৮ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


পৃথিবীতে জাতি ধর্ম, বর্ণ, দেশ, কাল, পাত্র নির্বিশেষে সকল ক্যাটাগরির মহাপুরুষেরা বলে গেছেন, পুরুষ বাইরে থেকে খেটেখুটে ফিরে তার হতাশা আর ব্যর্থতার গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে স্ত্রীকে হালকা করে দু'চারটে চড় থাপ্পড় মারতেই পারেন। ছোটো সাইজের লাঠিও ব্যবহার করতে পারেন মাঝে মধ্যে। 

পুরুষের সবরকম হতাশা আর ব্যর্থতার গ্লানি ঝেড়ে ফেলার জন্য দুই, চার, আট, দশ থেকে অসীম পর্য্যন্ত স্ত্রী গ্রহণের বিধান রয়েছে। যতো বেশি হতাশা, ততো বেশি স্ত্রী, ততো বেশি পৌরুষ।    

চোর, ডাকাত, খুনি, লম্পট, ধর্ষক সকলেই বাইরে জুতাপেটা খেয়ে ঘরে এসে স্ত্রীর কাছে পূজিত হয়ে যাতে নিজেকে দেবতা ভেবে সবরকম গ্লানি ভুলে যেতে পারেন তাই এই সুব্যবস্থা। ডিভাইন! 

তারা বাইরে লাথি ঝাটা জুতাপেটা খেয়ে সারা বিশ্বের বৃহৎ কল্যাণ নিশ্চিত করে বাড়িতে এসে যদি  একটিবার সিংহ না হয়ে উঠতে পারেন তবে পরের দিন আবার লাথিপেটা জুতাপেটা খাওয়ার ধৈর্য কই পাবেন। দিন শেষে তাই এই বীর পুরুষদের জন্য বাড়িতে অপেক্ষা করে থাকেন অবলা স্ত্রী। খোলা দরজা কিংবা বন্ধ দরজায়, আদরে কিংবা শাসনে, নপুংসক থেকে সপুংসক সকলেই পুরুষ হয়ে ওঠেন বিনা সংশয়ে। একজন অনুগত স্ত্রী থাকলেই আপনি চিরজীবন দেবতা এবং সিংহ সিংহ অনুভূতি নিয়ে কাটিয়ে দিতে পারবেন। পরের ঘরের নারী আসলেই আপনি কতটা সিংহ সেটা ফাঁস করে দিতে পারে। আপনার অনুগত স্ত্রী নিজের মান সম্মানের ভয়েই কোনদিন কাউকে বলবে না আসলে আপনি কতোখানি কাপুরুষ। সে নিজেও সিংহীর গৌরব পেতে চাইবে। তবু শুধু নিজের ঘরের একটি নারী নিয়ে তো আর দেবতারা সন্তুষ্ট হতে পারেন না। যতো বেশি নারী, ততো বেশি পৌরুষ, সিংহ সিংহ অনুভূতি। তা সে নারীর কাছে সিংহের বদলে যদি সাপ ব্যাঙ অনুভূত হয় তাহলে  সমাজে তো আর মুখ দেখানো যাবে না। সুতরাং নারীর পুরুষকে বিচার করার সুযোগ, অধিকার এবং যোগ্যতা কোনোটাই তৈরি হতে দেয়া যাবে না। তাই পবিত্রতার শেকল পরিয়ে দিন। তারাও প্রাণান্ত চেষ্টা করুক বহির্জগতে দেবী হয়ে ওঠার। দেবী হয়ে ওঠার লোভে নিজেরাই নিজেদের রক্ত মাংসের শরীর ভুলে যেতে চাইবে তারা। দেবী হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতায় অপর নারীর শরীর থেকে তার মানুষের রক্তমাংসের গন্ধ পেতে থাকে সারাক্ষণ আর নিজের শরীরে পেতে থাকে চন্দনের ন্যায় সুবাসের ভ্রম।    

তো এই নারীরা কি তাতে নিজের ভেতরে সত্যিই দেবী হয়ে উঠতে পারেন? নিয়ত দেবী হওয়ার প্রতিযোগিতায় এবং নিজের কাছে ব্যর্থতা ধরা পড়ার সে গ্লানি আর হতাশা তারা কোথায় উগরাবে? যেহেতু নারী কেবলমাত্র মাতৃরূপে পূজনীয়, কেবলমাত্র এই একটি সম্পর্কে সে নিয়ন্ত্রণের অধিকার রাখে তাই সে সমস্ত হতাশা আর গ্লানি উগরাবে সন্তানের উপর। আদরে শাসনে বাঁধবে সন্তানকে। সন্তানই কেবল তাকে দেবী বানাতে পারে।  কেবলমাত্র সন্তানের মা হিসেবেই সে দুনিয়াতে কিছু সম্মান আর শ্রদ্ধা পেতে পারে।

সন্তান পুরুষ হলে সে আর বেশিদিন অধস্তন ভক্ত থাকে না। সেও হয়ে ওঠে আবার কারো দেবতা এবং পুরুষসিংহ। আর সন্তান নারী হলে সে হয় কারো অধস্তন ভক্ত, হতাশা গ্লানি ব্যর্থতা উগরে দেবত্ব ফলানোর জায়গা। অন্য দেবতার অবলা অধস্তন অনুগত ভক্তের ঈশ্বর হয়ে থাকবার চেয়ে দেবতা আর পুরুষসিংহের মাতৃদেবী হিসেবে পূজিত হওয়া অপেক্ষাকৃত বেশি মর্যাদার নিশ্চয়ই। তাই এই পুরুষ সন্তানটিকে নিজের চিরকালীন ভক্ত বানিয়ে রাখবার জন্য নারীকে একটু স্বাভাবিকভাবেই বেশি বেশি প্রয়াস দিতে হয়। তাই নারীর আর নারীর আপন হয়ে ওঠা হয় না। দেবী হওয়ার আকাঙ্খা আর প্রতিযোগিতায় জীবন শেষ হয় তার। সামগ্রিকভাবে পুরুষ হয়ে ওঠেন সর্বস্তরের নারী জাতির আরাধ্য দেবতা আর নারী অপেক্ষা করতে থাকে দেবতার সান্নিধ্যে দেবতার হতাশা গ্লানি দূর করে দিয়ে দেবতার প্রসাদে ভবিষ্যত দেবতার দেবী হয়ে ওঠার।

এভাবে হতাশা উগরানোর জন্য দেবতা এবং দেবীরা নিজেদের অধস্তন ভক্তদের ভালবাসুন, শাসন করুন, ধরে রাখুন, বেঁধে রাখুন, দম বন্ধ করে মেরে ফেলুন।

হতাশ হলে ভক্তকে পেটাতে হয়। ভক্তের আর্তচিতকারে নিজেকে মহিমান্বিত মনে হতে থাকে।

তাই ঘরের কিংবা পরের নারী, নিজের কিংবা পরের শিশু সন্তান কাউকে কথায়, কাউকে হাতে,  কাউকে পায়ে আদর শাসন করে হতাশা উগরে দিয়ে দেবতা এবং সিংহ হয়ে উঠুন।  

পরিশেষে বাঙালি সকল হতাশাগ্রস্ত মানব সন্তানের জন্য শুভকামনা। বরগুনার চোখের সামনে স্বামীকে খুন হতে দেখা ওই নারীর দোষ খুঁজে বের করুন, চরিত্রকে ডিসেকশন টেবিলে রেখে কাটাছেঁড়া করুন, কেনো না খুনীরা হতাশ এবং ব্যর্থ ছিল আপনাদের মতো। নিশ্চয় সেইসব হতাশা আর ব্যর্থতা দূর না করতে পারা সমগ্র নারীজাতির অপরাধ।

হেইল ব্রাদারহুড !

 


  • ৩১০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

চৈতি চন্দ্রিকা

লেখক এবং এক্টিভিস্ট।

ফেসবুকে আমরা