আরিফা আক্তার

দুই সন্তানের জননী আরিফা পেশাগত জীবনে স্কুল শিক্ষক।

ডিভোর্স, নাকি খুন, কোনটাতে মুক্তি?

 
এই দেশে ডিভোর্স এর চেয়ে খুন সহজ। বাবুল আক্তার সহজ দিকটাই বেছে নিয়েছে। সে অভিজ্ঞ ব্যক্তি। তার পেশা তাকে আরো বেশি দক্ষ করেছে। সমস্যা হয়েছিলো তখনকার পরিস্থিতি।  সে জঙ্গি দমনের যেসব শোঅফ করতো তাতে করে পুরো প্রশাসন তার প্রতি পজিটিভ ছিলো। একজন পদস্থ কর্মকর্তা, তার স্ত্রীকে নিজের দায়িত্ব পালনের অপরাধে খুনের ব্যাপারটা পুলিশ ডিপার্টমেন্ট মানতে পারেনি। পুরোদস্তুর মনোযোগ তারা খুনের পেছনে দিয়েছিলো। এখানটায় সে ফেঁসে গেছে। নারায়নগঞ্জের সেভেন মার্ডার, তনু হত্যা, সিনহা হত্যা, আরো আরো হত্যাগুলো আমাদের প্রশাসন সম্পর্কে কেমন ধারণা দেয় সেগুলো আর নাইবা উল্লেখ করলাম। তাদেরকে ভিন্ন উপাধিতে ভূষিত করলে আবার দেশদ্রোহী হওয়ার সম্ভাবনা প্রকট হয়।
 
তারচেয়ে ডিভোর্স ব্যাপারটা নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক। আজ আমরা খুনের চেয়ে ডিভোর্স কত সহজ, সেটা নিয়ে প্রচুর মায়াকান্না কাঁদতে পারি। আদতে কি তাই? আমরা হুমায়ূন আহমেদ, সুবর্ণা মোস্তফা, এমন কি সাম্প্রতিক সময়ে বিল গেটস-মেলিন্ডা জুটির বিচ্ছেদসহ আরো আলোচিত ডিভোর্স দেখেছি। কিছুদিন আগে ক্রিকেটার নাসিরের ওয়াইফের ডিভোর্স বিয়ে সংক্রান্ত খবর ও দেখেছি। আপনাদের কী মনে হয় না, খুনের চেয়ে ডিভোর্স এ আমাদের  রিয়েক্ট বেশি হয়? আমরা নিজেদের জীবন দিয়ে বিচার করতে পারি, একটা সম্পর্ক কতটা নষ্ট হওয়ার পরও ডিভোর্স এর কথা মুখে আনা যায় না? পরিচিত আত্মীয় স্বজনদের সমস্যায় কখনো ডিভোর্স এ সমাধানের পরামর্শ দেয়ার সাহস আমাদের আছে? এই যে আমি লিখছি, দেখা যাবে একদল আমাকেই সন্দেহ করতে শুরু করেছে যে আমার সংসারে কি ধরণের সমস্যা আছে, যাতে আমি ডিভোর্স এর পক্ষে বলি!
 
এইদেশে মার্ডার, নির্যাতন একদম ডালভাত, এগুলোতে আমাদের প্রতিক্রিয়া দু'দিনেই স্তিমিত হয়ে যায়। কিন্তু বহু বছর পর ও শাওনকে হুমায়ূন আহমেদের সংসার ভাঙার অপরাধে বুলিং এর শিকার হতে হয়। শমী কায়সার এর মতো ব্যাকগ্রাউন্ড এর নারীকেও বহু মুক্তমনা নামের মানুষ হাসির ছলে আক্রমণ করে। অথচ দুদিনেই দেখবেন বাবুল আক্তারের পক্ষে কোনদিক থেকে জনমত দাঁড়িয়ে গেছে। আর এতগুলো বছর খুন করার পরেও সে কেমন নিশ্চিত জীবন যাপন করলো, তার চাইতে ডিভোর্স এ গেলে তাকে এতদিন বেশি সমালোচনা সহ্য করতে হতো। ডিভোর্স এ গেলে তাকে নারী নির্যাতন, যৌতুক সহ হরেক মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করা হতো। বাবুল সেগুলো জানতেন বলেই নিজের অভিজ্ঞতায় ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। 
 
আমাকে দয়া করে খুনের সমর্থক ভাববেন না আপনারা। আমি আমার অবজারভেশন তুলে ধরছি মাত্র। আমি নারীমুক্তির পক্ষে, আমি প্রেমে বিশ্বাসী মানুষ। যেকোনো সম্পর্ক খুনোখুনিতে যাবার আগে অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করে। আমরা সেগুলোকে সনাক্ত করে মৃত্যু আটকাতে পারি না? 
 
ডিভোর্স এ পুরুষের মেল ইগো আক্রান্ত হয় নারীটি ছেড়ে যেতে চাইলে। তবে পুরুষের চেয়ে নারী ডিভোর্স এ বেশি রিয়েক্ট করে।  কারণ,  একটা সংসার গুছিয়ে নিয়ে চলে যাওয়ার সময় সে দেখে তার পায়ের তলায় মাটি নেই। সে যতটা না ভালোবাসায় তারচেয়ে অনেক বেশি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হীনতার জন্য সংসার টিকিয়ে রাখতে আগ্রাসী হয়। প্রচলিত আইনে নারীটির প্রাপ্য খুব কম, তাও আবার আইনের মারপ্যাচেঁ আদায় করা অধিকাংশ সময় সম্ভব হয় না। সমস্ত পরিশ্রম দিয়ে যে সংসার কে সে দাঁড় করায়, বিচ্ছেদে সেখানে শূন্য হাতে ফেরে সে। আমাদের আইনকে আরো বেশি নারীবান্ধব, যেমন বিচ্ছেদ হলে যেন হাজবেন্ড এর অর্থনৈতিক অংশের একটা বিশেষ সুবিধা পায় তার ব্যবস্থা করা উচিত। তার সাথে নারীর অর্থনৈতিক কাজে এক্টিভ হওয়ার পথ প্রশস্থ  করা উচিত। সমাজকেও ডিভোর্স সহজ ভাবে নিতে শিখতে হবে। বাবুল-মিতু দম্পতি যদি পৃথক হয়ে যেতো, তাদের সন্তানেরা যদি বাবা-মা উভয়কেই পাশে পাওয়ার মতো পরিবেশ থাকতো তবে আজ পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারতো। যেমন গুলতেকিন আহমেদ নতুন জীবন শুরু করেছেন, তাদের সন্তানেরা অন্ততঃ বাবা মা, যেকোনো একজনের ছায়ায় বেঁচে আছেন। হুমায়ূন আহমেদ বুদ্ধিমান মানুষ ছিলেন, তিনি ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন। ভালোবাসা শেষ হলে শুধু সামাজিক চাপ আর সন্তানের দোহাই দিয়ে সংসার টিকালে তাতে কল্যাণ এর চেয়ে ক্ষতি বেশি হয়। আজকে বাবুল মিতু দম্পতির দু‘জন সন্তান কুলহারা, মা হত্যার দায়ে বাবাকে জেলে যাওয়ার মতো মর্মান্তিক পরিনতি তাদের ভবিষ্যত শেষ করে দিলো। 
 
অনেক আগে রিমা হত্যার দায়ে মুনিরের ফাঁসি হয়েছিলো। এই খুনে দুটো পরিবার পুরো বিধ্বস্ত হয়ে যায়। অথচ চাইলেই খুন ঠেকানো যেতো। নারী পুরুষ উভয়েরই সম্পর্ক শেষ করার স্বাধীনতা থাকা উচিত। বিয়ে নিয়ে সমাজের ট্যাবু ভাঙ্গা উচিত। বিয়ে কোন লোক দেখানো বিষয় নয়। 
 
পরিশেষে বলতে চাই, মিতু হত্যার উপযুক্ত বিচার হোক। সেই সাথে সমাজের মানসিকতারও পরিবর্তন হোক, পুরুষ বা নারী কাউকেই জোর করে ধরে রাখার মতো আহাম্মকি থেকে বের হওয়ার পরিবেশ তৈরি হোক সমাজে। ডিভোর্স সহজ হোক, রক্ষা হোক অমূল্য জীবন।

957 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।