তালাক'ও কি পুরুষের একচেটিয়া অধিকার?

শনিবার, মে ১১, ২০১৯ ৪:৪৮ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


হেডলাইন দেখলাম-"সিলেটে ডিভোর্স বেড়েছে, নারীরা এগিয়ে"। যদিও দেশে দিনে দিনে ডিভোর্স বাড়ছে বলে এ সংবাদ নতুন কিছু নয়। কিন্তু কেনো তা বাড়ছে বা নারীরাই কেনো এগিয়ে সেটা হলো প্রশ্ন।

 

বেশীর ভাগ পুরুষই বলবেন, "নারীরা শিক্ষিত হয়ে গেছে, বাড়ির বাইরে যাওয়া শিখে গেছে- ডিভোর্স তো বাড়বেই।" জিজ্ঞাসা আমার, তো মশাই তারা যে পড়া-লেখা করবে না, বাইরে যাবে না তা লেখা আছে টা কোথায়? উত্তর দিতে পারবেন না, কেননা তা কোনো সংবিধানে লেখা নাই, আইনে লেখা নাই। তবে হ্যাঁ, একটা জায়গায় লেখা আছে- আর তা হলো আপনাদের মন। মনে মনে লিখে রেখেছেন যে, নারীরা যত অজ্ঞ থাকবে, অবরোধবাসিনী হয়ে থাকবে ততোই আপনাদের লাভ। তারা জানবে না কিছু, বুঝবে না কিছু তাই আপনাদের কথার উপর বলবেও না কিছু। অনেকটা অন্ধকে সাদা রং চেনানোর মতো, যা বলবেন নারীরা তাতে জ্বি হুজুর, জ্বি হুজুর রব তুলবে। আর তাই আগের যুগে তালাক হতোই না বলতে গেলে। তবে সে সময়ের সর্বংসহা নারীরা যে কতো অসুখী ছিলেন, কতো অত্যাচার, নিপীড়নের শিকার হতেন তার খবর কয়জন জানেন? বর্তমানে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের যেসব মেয়েকে উচ্চ শিক্ষা না দিয়ে বিয়ে দেয়া হয় তারাও এরূপ সহিংসতার শিকার হয়। তাই তালাকের সংখ্যার পার্থক্যটা যুগের বা কালের নয়, পার্থক্যটা সামাজিক অবস্থান, বিদ্যা-শিক্ষার, সচেতনতার। এসব নারীর সাধারণত তালাক হয় না ঠিক (কেননা তাদের যাওয়ার জায়গা নেই) যদি সে কর্মজীবী না হয়, আর কর্মজীবী হলেও অনেকে সমাজ কী বলবে এই ভয়ে তালাক দিতে চায় না। তথাপি তারা মোটেও সুখী কিংবা স্বাধীন কোনোটিই নয়। এক প্রকার বাধ্য হয়েই তাদেরকে সংসার চালিয়ে যেতে হয়, আর সেই সংসারে সুখ খুঁজে যেতে হয়। তাই তারা জোর করেই সুখে(?) থাকে। 

তালাক হবার পেছনে নারীদের দায়ী করতে পুরুষদের আবিষ্কৃত আরেকটি অস্ত্র হচ্ছে মেয়েদের 'রাগ'। অর্থাৎ যে মেয়ের রাগ বেশি সেই মেয়ে পুরুষের সকল গঞ্জনা সবসময় সহ্য করবে না। এক সময় সে প্রতিবাদ করবেই, পুরুষের সাথে বেয়াদবি(?) করবে, তার মুখে মুখে তর্ক করবে, স্পর্ধা দেখাবে। সুতরাং সে মেয়ের সংসার টিকতে পারে না। এজন্য আগেকার মুরব্বীরা রাগী মেয়েদের তিরস্কার করতেন। তাহলে মহাশয়গণ, বলি রাগ, স্পর্ধা, সাহস, শিক্ষা, জ্ঞান ইত্যাদি বিষয়াদি কি আপনাদের একক সম্পদ? আর তাই আপনাদের এই মহা মূল্যবান সম্পদ নারীরা চুরি করে (পুরুষরা ডাকাতি কথাটি উচ্চারণ করতে চাইবেন না। কেননা সেটাও তাদের সম্পদ বলে তারা গণ্য করেন) নিয়ে যাচ্ছে বলে আপনাদের ঘুম হারাম? তবে শুনে রাখুন এগুলো আদৌ কারও সম্পদ নয় যে নারীরা তা চুরি করবে। তারপরও যদি এগুলোকে নিজের সম্পদ বলে প্রতিষ্ঠা করতে চান তাহলে নারীরা এ সব সম্পদ ডাকাতি করেই লুট করবে, চুরি করে নয়। আর তাই ডিভোর্স দিতেও মেয়েরা এখন পুরুষদের ধার ধারে না, তোয়াক্কা করে না পুরুষদের। 

লেখাগুলো পড়ে অধিকাংশ ব্যক্তির মনে হতে পারে যে, আমি তালাককে appreciate করছি। মাথায় ঘিলু যাদের আছে কেবল তারাই বুঝবেন, এখানে 'তালাক' কে নয়, বরং নারীদের দ্বারা তালাক দেয়ার 'সাহস'টাকে appreciate করা হয়েছে। নতুবা ব্যক্তিত্বহীন চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাসের মতো শাকিব খানের পেছনে ঘুরে ঘুরে অবশেষে শাকিবের দ্বারা তালাকপ্রাপ্ত হয়ে 'back to the pavilion' হতে হবে। পাশাপাশি বোনাস হিসাবে পাবেন ব্যঙ্গ আর করুণা। 

তবে হ্যাঁ, তালাক কখনোই সুখকর কিছু হতে পারে না। আমি কালেভদ্রেও চাই না কোন দম্পতির বিচ্ছেদ হোক। ঝগড়া-ঝাঁটি হবে এটা স্বাভাবিক। পারস্পারিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে তা মিটিয়ে নেয়াই শ্রেয়। তবে এক্ষেত্রেও ছাড় বা compromise করার কথা বলা হয় নারীকে। বুঝাই যাচ্ছে, পুরুষরা তাদের সুবিধামত যখন যা চাপানো যায় তখন তা-ই নারীদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেন। এতকাল ছাড় তো নারীরাই দিয়ে আসলো, আর কত ছাড় চান আপনারা? এবারে নিজেরা ছাড় দিতে শিখুন।

নারীশিক্ষার প্রসারের ফলে নারীরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেছে। প্রকৃতপক্ষে, পুরুষরা নারীর এই অধিকার সচেতনতাকে মেনে নিতে পারছেন না বলেই তৈরি হচ্ছে দ্বন্ধের। সচেতনতার বলে নারী ব্যক্তি স্বাধীনতায় জেগে ওঠছে। পুরুষরা এই স্বাধীনতা গ্রহন করতে পারছেন না (তাদের গুরুত্ব কমে যাবে এই ভয়ে) বলেই বাড়ছে তালাক। আর যদি ব্যক্তিত্বের দ্বন্ধের কথা বলা হয় তাহলে সেক্ষেত্রেও পুরুষদের 'শ্রেষ্ঠত্ব মনোভাব' এখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তারা নিজেদের উত্তম ভাবেন বলে নারীদেরকে তাদের সম পর্যায়ের ভাবতে পুরুষদের অহমে লাগে। এতো যদি বড়ত্ব তাহলে নারীর পেছন পেছন ঘুরেন বা তাকে বিয়ে করেন কেন? অনেক পুরুষ এই প্রশ্নের উত্তরে বলবেন, যে সেবা-যত্ন পেতে তারা বিয়ে করেন। আমার পাল্টা প্রশ্ন, "সেবা পেতে গেলে টাকা দিয়ে লোক রেখে তা নিচ্ছেন না কেন?" তাদের উত্তর, "ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিয়ে করতে হয়" (এবং এবং বাংলাদেশে ৯৯.৯৯% লোক এই উদ্দেশ্যেই বিয়ে করে, যদিও আমার কাছে তা মোটেও প্রাসঙ্গিক নয়)। শেষ প্রশ্ন, "যাকে এত তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, অমানুষ জ্ঞান করেন তার সাথে সংসার করতে আপনার লজ্জা বা ছোটত্ব প্রমাণিত হয় না? আমি যতটুকু জানি পশুর সাথে পশুর সংসার আর মানুষের সাথে মানুষের। তো আপনি এত মহামানব হয়ে অমানুষ/পশু/নিম্ন শ্রেণির তথাকথিত মানুষের সাথে সংসার করছেন- তাহলে তো আপনিও তা-ই, তাই না?"এর উত্তরে পুরুষরা কী খোঁড়া যুক্তি খাড়া করবেন তা অবশ্য আমার জানা নাই।

আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, এদেশে অধিকাংশ পুরুষ নিজের চেয়ে কম বয়সী, কম যোগ্যতা সম্পন্ন (উদাহরণস্বরূপ, স্নাতকোত্তর পাশ ছেলে উচ্চমাধ্যমিক পাশ মেয়েকে) নারীকে বিয়ে করেন যেনো তাকে সহজে অবদমন করে রাখা যায়। তবে ব্যাপারখানাকে আমি একটু ভিন্নভাবেও দেখি। এরূপ পুরুষের বাহ্যিক/দৃশ্যমান যোগ্যতা স্নাতকোত্তর হলেও আভ্যন্তরীণ অর্থাৎ চিন্তার দৌড় কেবল উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বিস্তৃত। উল্টো দিকে নারীর চিন্তা-চেতনা স্নাতকোত্তর পর্যায়ের বলেই সে স্নাতকোত্তর পাশ পুরুষকে বিয়ে করতে চায়।

যা হোক, পুরুষরা কম যোগ্যতাসম্পন্ন নারীদের বিয়ে করবেন নিজেদের সুবিধার জন্য আবার সম বা অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন নারীদের বিয়ে করবেন (যদিচ কখনো আপনাদের কপালে এই সৌভাগ্যটা জুটে) ঐ নিজের সুবিধার জন্য আর তাকে ছাড় দেবেন না বা তার মতামত, কাজ, চিন্তা-ভাবনাকে মেনে নেবেন না এরূপ 'double standard maintain' করে চলবেন তা তো হবে না। আইনে 'estoppel' নামে একটা নীতি আছে যেখানে বলা হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি যদি কোনো কিছু থেকে সুবিধা গ্রহণ করে থাকে তাহলে সেটা থেকে উত্থিত অসুবিধাও তাকে বরণ করে নিতে হবে। অন্যথায় তার উপর এই নীতিটি প্রয়োগ করে তার গৃহীত সুবিধাগুলো কেড়ে নেয়া হবে। আপনাদের মতো পুরুষদের উপর এই নীতি প্রয়োগ করা শুরু হয়ে গেছে বলেই নারীরা প্রতিবাদ করতে বা বিচ্ছেদ ঘটাতে শিখে গেছে। আর তাই পুরুষরা ছাড় দিতে শিখুন, মেনে নিতে, মানিয়ে নিতে শিখুন- বিচ্ছেদের ডামাডোল আর বাজবে না তখন। আর তাই অন্যান্য বিষয়ের মতো তালাক'ও পুরুষের একচেটিয়া কিছু নয়।


  • ৫০১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শাহনাজ ঈভা

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে নারীবাদী ঈভা লেখালেখির পাশাপাশি বর্তমানে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেল-এ প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।

ফেসবুকে আমরা