চলমান পৃথিবীর সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যবস্থার ফলাফল - আত্মহত্যা

শুক্রবার, ফেব্রুয়ারী ১, ২০১৯ ১২:০৩ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


এই যে মহান দার্শনিক বাঙালিগণ আপনারা কি জানেন এতো লোক কেনো আত্মহত্যা করছে? কারণ- আপনি, আপনারা এবং আপনাদের সৃষ্ট সমাজ ব্যবস্থা এবং আপনাদের অনুর্বর মস্তিষ্কের অত্যাধিক উত্তেজিত কর্মকাণ্ড।

সমাজ বিজ্ঞানী এমিল দুরখেইমের "সুইসাইড" নামক একখানা বই আছে। সেখানে তিনি লিখেছেন, যখন একটি সমাজের সামাজিক বন্ধনগুলো দুর্বল হয়ে পরে, আবার একই সাথে সেই সমাজের লোকজনকে শক্ত এবং রিজিড কিছু নিয়মকানুন এবং ভ্যালুজের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তখন আত্মহত্যা বাড়ে। ঠিক বিষয়টা কিন্তু এমনই।

যিনি আত্মহত্যা করেছেন ধরেন ডক্টর আকাশের কথাই বলি, তার ক্ষেত্রেও এমন হয়েছে। প্রথমত তিনি সামাজিক মানসম্মনের ভয়ে ন'বছর আগে তার প্রেমিকাকে "চরিত্রহীন" এবং 'বিবাহঅযোগ্য" মনে করেও বিবাহ বাতিল করতে পারেন নি কারণ ইতোমধ্যে বিবাহ পূর্ব পরিস্থিতি আরম্ভ হয়েছিলো। এতো বছর পর এসে তিনি ঠিক সেই একই "সামাজিক মানসম্মান এবং নিয়মকানুনের" কাছে নির্মমভাবে পরাজিত এবং অসহায় হয়ে স্বীয় আত্মাকে হত্যা করলেন।

জানেন তো এমন "চিকিৎসক আকাশ" কিন্তু আমাদের সমাজব্যবস্থার ফলাফল। একটু ভাবেন তো, মি. আকাশ কেনো মনে করতেন "তার স্ত্রী তিনি ছাড়া অন্য কারো লগে শুইবেন না", "বহু পুরুষের লগে শোয়া নারী বিবাহঅযোগ্য", "আধুনিক মেয়েরা বহু পুরুষেরর লগে রাত কাটায়"। এই ধরনের অস্বাভাবিক এবং ভিত্তিহীন চিন্তাভাবনা এবং মনস্তত্ত্বের অধিকারী ব্যক্তি নিঃসন্দেহে বাইপোলার ডিজঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, পারসোনালিটি ডিজঅর্ডারে ভোগা রোগী। তার হয়তো চিকিৎসা বিজ্ঞানে কিছু জ্ঞান ছিলো কিন্তু আমার কাছে তাকে "আপাদমস্তক শূণ্য এবং ছাগলবুদ্ধির অধিকারী ব্যক্তি" মনে হয়। কিন্তু নির্মম সত্য হলো, আমাদের অসুস্থ, অসভ্য, পুরুষতান্ত্রিক এবং ধর্মভিত্তিক সমাজ তাকে, চিকিৎসক আকাশকে এভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে, এভাবেই তার মনস্তত্ত্ব গড়ে উঠিয়েছে। যার দরুণ আজ তার আত্মহত্যা।

আর আপনারা কি করেন একজন মানুষ আত্মহত্যা করলে সমস্ত লোক তার মৃত্যু সংবাদে প্রচণ্ড শোকাহত হয়ে হয় আত্মহত্যাকারীকে "পাগল, ছাগল, মানসিক রোগী" বলে অবহিত করেন এবং অন্যপক্ষ আত্মহত্যাকারীর সাথে সমবেদনা প্রকাশ করে আত্মহত্যাকারীর ফেসবুক স্ট্যাটাস বা কোনো নোট থেকে প্রাপ্ত " সম্ভব্য দায়ী ব্যক্তি" কে নিয়ে যাচ্ছেতাই অবস্থার সৃষ্টি করেন। এই যে আত্মহত্যাকারী আকাশ, তিনি কিন্তু তার দিক দিয়ে সফল হয়েছেন কারণ তিনি চেয়েছিলেন তার মৃত্যুর পর ফেসবুকে দেওয়া তার স্ট্যাটাস ভাইরাল হবে, সংবাদকর্মীরা আসবেন, তার অপরাধী বউকে গ্রেফতার করবেন এবং তার বিচার হবে, শাস্তি ভোগ করবেন। ঠিক তার ভাবনা অনুযায়ীই এখন পর্যন্ত সমস্তকিছু হয়ে চলেছে।

এভাবেই যদি আপনারা সকলে "আত্মহত্যা" কে এতো হাইলাইট করেন, তাহলে সমাজে আত্মহত্যার পরিমাণ বেড়েই চলবে কারণ আত্মহত্যাকারীরা ভাববেন আমার মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি (প্রেমিক, প্রেমিকা, স্ত্রী, স্বামী, মা, বাবা বা অন্যরা) শাস্তি পাবেন বা নিজেদের অপরাধ অনুভব করতে পারবেন। বুঝলেন তো, আপনারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেন অথচ এটা স্বীকার করেন না। না তো না ই।

আরেকটা বিষয় কি আপনাদের চোখে পড়েছে "আকাশের দেনমোহর ৩৫ লাখ টাকা"? জানেন তো অনেক পুরুষই মোটা অংকের দেনমোহরের জন্য তালাক দিতে না পেরে বাধ্য হয়ে, মানসিক চরম অসুস্থতায় ভুগে দিনের পর দিন স্ত্রীর সঙ্গে দিনরাত্র যাপন করছেন! এই যে, সমস্ত কিছুর জন্য দায়ী কি? আমাদের সৃষ্ট "অসভ্য সমাজ" এবং " নিষ্ঠুর পুরুষতান্ত্রিক অমানবিক ধর্ম " । হায়রে পুরুষ্যসৃষ্ট ধর্ম এবং সমাজ, এই দুই উপাদানই আজ ছিঁড়ে খাচ্ছে তোমাদের কারণ অমানবিক কিছুই স্বাস্থ্যকর নয়, নারী কিংবা পুরুষ কারো জন্যই নয়।

চিকিৎসক এবং মানসিক ভারসাম্যহীন আকাশের কথা বাদই দিলাম, তার স্ত্রীর প্রসংগে আসি। হতেই পারে, আকাশ তার স্ত্রীকে মানসিক কিংবা শারীরিকভাবে তৃপ্ত করতে পারেন নি যার ফলাফল -অন্য পুরুষে আসক্তি। এটা স্বাভাবিক ব্যাপার, খুবই। এটাকে নিয়ে এতো হাইলাইট না করে, "আকাশ মানসিক রোগী" এটাকে হাইলাইট করুন। আবার ভাইবেন না, আমি তার বউয়ের পক্ষে বলতেছি। তার বউয়ের উচিত ছিলো তার পলিগামিতার ব্যাপারে তার বরকে অবগত করা এবং দু’জনে মিলিত হয়ে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। অসুস্থ সম্পর্ক নিয়ে টানাটানি না করে, এর ইতি টানা উচিত। অন্যদিকে সহজ পন্থা, ডাইভোরস অপশন আকাশের কাছে ছিলোই। কিন্তু তিনি তা না করে, নিজের সব থেকে মূল্যবান জিনিস "নিজজীবন" কে হত্যা করলেন।

এখন আপনাদের কি করা উচিত বলেন তো -আকাশের স্ত্রীর উপর অত্যাচার বা অসম্মান হচ্ছে কিনা সেদিকে নজর রাখা এবং "অসুস্থ সমাজ" এবং "অমানবিক ধর্মগুলো" সংশোধনে নজর দেওয়া কারণ আত্মহত্যা হলো একটি সামাজিক খুন যেটা পরিবার, সমাজ এবং রাষ্টের অনেকে মিলিত হয়ে করেন, যেজন্য এই হত্যার অসংখ্য আসামীদের বিচার হয় না।


  • ১৮৩০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফাহমিদা জামান ফ্লোরা

শিক্ষার্থী (ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) এবং নারীবাদী লেখক।

ফেসবুকে আমরা