নারীবাদ এবং নারীর বহুগামিতা

সোমবার, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৮ ১১:৪৬ PM | বিভাগ : আলোচিত


লীনা, আমার বাবাতো কাজিন, রাবিতে আইনে পড়ছেন। প্রচুর মেধাবী, আকর্ষণীয় চেহারা। জিনগত একটা ব্যাপার আছে না! একগুয়ে, উড়নচণ্ডী, স্বাধীনচেতা অর্থাৎ আপনি তার দিকে তাকালে আমার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাবেন। যখন দ্বাদশে পড়তো, মনে শখ জেগেছিলো, প্রেমে ভাসমান ছিলো। অমনি হঠাৎ একদিন প্রথম প্রেমিককে বিয়ে করে নিলো।

বিয়ের পর যা হয় আর কী! পরিবারের অমতে বিয়ে, বরের মিথ্যাচার, অসম্মান, পরকীয়া, তার আত্মসম্মানহীনতা সব মিলিয়ে যাচ্ছেতাই বনে গিয়েছিলো সে। এমনকি বারকয়েক মৃত্যুর সম্মুখীনও হয়ে ফেরত এসেছে সে। অবস্থা এতোটা ভঙ্গুর, বিধ্বস্ত ছিলো যে সে ভেবেই নিয়েছিলো মৃত্যুতেই তার একমাত্র মুক্তি। যাই হোক, প্রচুর ঝামেলা, যন্ত্রণা পোহানোর পর শেষমেশ রাবিতে ঠাঁই ঝুটলো তার।

বদ্ধ জীবনে হঠাৎ আশার আলো দেখতে পেলো সে। আত্মবিশ্বাসের বদৌলতে আত্মসম্মানটাও জাগ্রত হলো তার মাঝে। অনেকটাই বদলে গেলো সে, এক বরকে পূজার পরিবর্তে বহু প্রেমিকের চোখের মণি হয়ে উঠলো। অবশ্য সে প্রতারণা কিংবা মিথ্যার আশ্রয় নেয় না, নিজেকে স্বঘোষিত বহুগামী রমণী বলে। হঠাৎ আলাপের মাঝে একদিন জানালো, "আমিও এখন নারীবাদ ফলো করি। নিজের অধিকার নিয়ে সচেতন, শুধু শারীরিক না, প্রতিটা ক্ষেত্রেই নিজেকে নিয়ে সচেতন আমি।"

অন্যদিকে আমার বান্ধবী, নাতাশা, সেও একাদশে পড়তেই বিয়ে করেন। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হলো না তার! তার বরও আমার কাজিন লীনার বরের প্রতিচ্ছবি। বেচারা নাতাশা এখন অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করে বরের সেবা এবং তার সংসার সামলান। হঠাৎ গতরাতে আমাকে ফোন দিয়ে কান্নাকাটি শুরু করলেন। বললেন, ফ্লোরা তোর লাইফ এতো সুন্দর আর আমাকে দেখ! আমি বললাম, তোমার সাহস, আত্মসম্মান নাই এজন্য এখনো সংসার করছো। নাতাশার অভিযোগ, তার বর বহু রমণীর সাথে শুয়ে বেড়ান অথচ নাতাশা চান তার বর অন্য রমণীদের স্পর্শ করতে পারবেন না। আবার এই নাতাশাই কিছুদিন আগে বললেন, ঢাকায় আমার বাসায় আসতে চান, বারে যাইতে চান, প্রেমিক বানাইতে চান কিন্তু তার যে অজস্র সীমাবদ্ধতা আছে।

অন্যদিকে আমার কাজিন লীনার বর এখন লীনার হাত পা ধরেন এবং লীনাকে তার বহুগামিতা ছেড়ে তার জীবনে ফেরত আসার আহ্বান জানাচ্ছেন। লীনার ভাষ্য- "আমি সেসময় অপরিপক্ব ছিলাম, না বুঝেই তোমার বহুগামিতায় হস্তক্ষেপ করেছি। আদতে সকল মানুষই প্রাকৃতিকভাবে বহুগামী, কেউ সেটা প্রকাশ করে আর কেউ করে না। আমার অনেক ছেলেবন্ধু আছেন এন্ড আই স্লিপ উইথ দেম। তোমাকে আমি বরের মর্যাদায় আসীন করতে পারবো না, তবে তুমি চাইলে আমার অন্য ছেলেবন্ধুদের মতো আমার জীবনে থাকতে পারো।"

লীনা এবং নাতাশা দু’জন রমণীর দিকে তাকালেই আপনি দেখতে পাবেন, বুঝতেও হয়তো পারবেন ফাইনানশিয়ালি ইন্ডিপেন্ডেন্ট এবং আত্মসম্মানওয়ালা রমণীরা কখনোই অন্যের অধীনে থাকতে চান না। অন্যদিকে "গতি না থাকা" রমণীরা সুযোগের অভাবে সমাজের চোখে সৎ এবং চরিত্রবান থাকার অভিনয়ে ব্যস্ত থাকেন।

এখন হয়তো আপনি ভাবতে পারেন বা বলতে পারেন, সব নারীবাদী রমণীই বহুগামী কি না? আমি বলবো আত্মসচেতন এবং সাহসী বেশিরভাগ রমনণীই একইসাথে নারীবাদী এবং বহুগামী। আবার নারীবাদীদের অনেকেই আছেন যারা এককালীন মনোগামী কিংবা অনেকে এসব মানসিক কিংবা শারীরিক কোনো সম্পর্কের মধ্যেই নেই। এগুলো এক একজন নারীবাদীর ব্যক্তিগত এবং শারীরিক ব্যাপার। যদিও আপনার বহুগামী হওয়াতে আপনার শরীরের অক্সিটসিন হরমোনের নিঃসরণই অনেকাংশ দায়ী। আবার প্রচুর অনারীবাদী বহুগামী রমণী আছেন। কিন্তু এ কথাও অনস্বীকার্য যে, বর্তমান নারীবাদ নারীর বহুগামিতাকে স্পষ্ট সমর্থন করে এবং নারীকে স্বঘোষিত বহুগামী বানাতে শক্তিশালী ভূমিকা রাখে।

এখন আপনি যদি "নারীবাদ প্রচার আমার জীবনের অন্যতম লক্ষ্য" এই মর্মে বিশ্বাসী হন, তাহলে আপনাকে সমাজের ট্যাবুগুলোকে শক্ত হস্তে ভাঙ্গার দায়িত্ব পালন করতে হবে। আপনি, আমি সবাই জানি, নারীশিক্ষার হার বাড়তেছে, সর্বত্র নারীর পদচারণা আছে। এখন সরকারপ্রধান, সেনাপ্রধানও হচ্ছেন। কিন্তু এতোসবের পরও নারী নির্যাতিত, নিগৃহীত। রাস্তাঘাট, কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে দিনশেষে বিছানাও নারী সেই "সেক্সুয়াল হ্যারেজমেন্টের" ভিক্টিম।

নারী ভোটাধিকার অর্জন থেকে শুরু করে পার্লামেন্টে সন্তানকে স্তনপানের স্বীকৃতি পেলেও আজ পর্যন্ত নারী তার শরীরের অধিকার অর্জন করতে পারলো না। এখনও নারীর পিতা, ভাই, স্বামী, প্রেমিক নির্ধারণ করেন নারী কার সাথে শুতে পারবে, কি পোশাক পরবে, শরীরের কতোটুকু ফাঁকা রাখবে, শরীরের মাপ কেমন হতে হবে, শরীরের রঙ কেমন হবে, ব্লা ব্লা...। মানে নারী উঠতে, বসতে, হাঁটতে, চলতে সর্বত্র তার শরীর নিয়েই তার আশপাশ সরব।

এখনও কি বুঝতে পারেন না, নারীবাদীগণ কেনো বারবার "শরীরকেন্দ্রিক" কথাবার্তা বলছেন, লিখছেন? এখনও কি বুঝতে পারেন না নারীবাদীদের নিজেদেরকে কেনো বহুগামিতার চর্চা প্রকাশ্যে করা উচিত? আহা! না বুঝলে শুনেন, এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সেই সামর্থ্য নাই যে এরা "নারীর বহুগামিতা" কে স্বাভাবিকভাবে নিবে। সুতরাং বন্ধচোখে স্বচ্ছভাবে বলা যায়, বহুগামী নারী মাত্রই পুরুষতান্ত্রিক পুরুষের দণ্ডসহ অণ্ডকোষে লাথি মারা সাহসী রমণী।


  • ৫৭৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফাহমিদা জামান ফ্লোরা

শিক্ষার্থী (ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) এবং নারীবাদী লেখক।

ফেসবুকে আমরা