নারীবাদ, নাকি পুরুষ বিদ্ধেষ

মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১১, ২০১৮ ১:২৮ PM | বিভাগ : আলোচিত


রাত সম্ভবত আড়াইটা। বেশ ঠাণ্ডাও পড়েছে। মাত্র একটা মুভি দেখা শেষ হলো। রুমের জানালা থেকে বাইরে চোখ পড়তেই বরাবরের মতো আকৃষ্ট হয়ে গেলাম, মগ্ন বনে গেলাম। টি-শার্টের উপর একটা শীতের কাপড় জড়িয়ে, ঠোঁটে লিপআইস লাগিয়ে, পায়ে সু পিন্দে বেরিয়ে পড়লাম বাইরে। গেট লক করার সময় প্যান্টের পকেট হাতড়ে চেক করে নিলাম লাইটার নিয়ে বেরিয়েছি কি না কারণ প্রায়শই বাসায় লাইটার ফেলে আসাটা অভ্যাস হয় দাঁড়িয়েছে আমার।
 
 
আসলে রাত এতোই সুন্দর যা আমাকে ঘরে থাকতে দেয় না। একদম প্রথম প্রেমিকের বাসায় যেমন শত ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজির হতাম, রাতের বেলাও ঠিক তেমনটা হয় আমার। পথে হাটছি। খুলনার রাত, ভোরটা খুবই মোহনীয়। রাস্তায় এক পুলিশের সাথে দেখা। পরিচয় পর্ব শেষে সে বললো, আগেও বারকয়েক রাস্তায় দেখেছে আমায়। খুবই আগ্রহী এবং ইচ্ছুক আমার ব্যাপারে। আমি কেনো রাতে বেরোই, কেনো পুলিশের সামনে হাতের সিগ্রেট না নামিয়েই কথা বললাম, পুলিশ দেখেও এমন অভিব্যক্তি! এইগুলা নিয়ে প্রশ্ন করতে লাগলো সে।
 
আমরা দু’জন কথা বলছি, হাঁটছি। সে মুগ্ধ হয়ে আমার কথা গিলতেছে। আমাকে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলো, আপনি নারীবাদী, তাই না? বললাম, হ্যাঁ অবশ্যই! কিন্তু আপনার এ প্রশ্ন কেনো? তার উত্তর, আপনি সাহসী খুব, ড্যাম কেয়ার, আপনার পোশাক, চলাফেরায় স্পষ্ট আপনি নারীবাদী। আর আজ কথা বলে কনফর্ম হলাম। মি. পুলিশ ঢাবিতে পড়তেন। সদ্য পুলিশে জয়েন করেছেন। তিনি আরো বললেন, পুরুষদের ঘৃণার কারণ কি? আপনাকে তো সব পুরুষেরই পছন্দ করার কথা। তাছাড়া আপনি সুন্দরী। আসলে নারীবাদটা আপনার সাথে যায় না।
 
তার কথাবার্তা শুনে সত্যিই আমার মনে হচ্ছিলো, আমি মাটির নিচে নাকি আকাশে অবস্থান করতেছি৷ যাই হোক নিজের অট্টহাসি এবং বিস্মিত অনুভূতিকে সামলে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি মানবতাবাদী? সে বললো, অবশ্যই! আমি বলেই ফেললাম বা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেলো, তাইলে আপনার নারীবাদ নিয়ে এতো চুলকানি কেনো? মানবতাবাদী বইলা যে নিজেরে দাবি করলেন মানবতাবাদ কারে কয় তাইতো জানেন না।
 
সে এতোক্ষণ আমার মিষ্টি মিষ্টি কথা শোনার পর মাত্র আমার মুখ নিসৃত বাণীতে বেশ মর্মাহত হয়েছেন, যেটার ছাপ তার চোখেমুখে স্পষ্টত। তাকে বললাম, ভাই মানবতাবাদ মানে নারী, পুরুষ, ট্রান্সজেন্ডার সকলের মানুষ হিসেবে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সেক্সুয়ালসহ সকল স্তরে সমান অধিকার প্রাপ্তির বাদটাকে বোঝায়। তাইলে আপনি নিজেরে মানবতাবাদী দাবি করেন কোন হিসেবে? আপনি তো নারীর অধিকারেই বিশ্বাসী না। মানবতাবাদ থাকলে আলাদা কইরা নারীবাদ, বর্ণবাদ এইগুলা আমদানি করন লাগতো না। মানবতাবাদের একটা টার্ম হইলো নারীবাদ কারণ নারীও মানুষ আর মানুষের অধিকার নিশ্চিত করণকেই মানবতাবাদ কয়। আর ইউ ক্লিয়ার?
 
সে মাথা নাড়ায়ে কয়, আগে এইভাবে ভাবি নাই! আমি বলছি, দেখেন ভাই, নারীবাদ মানে এইটা না যে নারী সর্বত্র পুরুষের থাইকা উন্নত, উঁচু। কিন্তু একটা মেয়ে স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিকভাবে একজন পুরুষের থাইকা শক্তিশালী এবং উজ্জ্বল এটাতো অস্বীকার করা যায় না। এমনকি নারী মস্তিষ্কও পুরুষের থেকে অধিক সক্রিয়। চিন্তাভাবনা, জ্ঞান, বুদ্ধি থাইকা শুরু কইরা যৌনতা সর্বত্র নারীর জয়জয়কার। হিসাব অনুযায়ী আপনাগো পুরুষদের অবস্থান নিচুতেই হওয়া উচিত কিন্তু আপনারা হইলেন হিটলারীয় বুদ্ধির অধিকারী। ৪০০০ বছর আগে আপনারা এক এক কইরা জাদুর কাঠি এবং আলাদীনের চেরাগ (ধর্ম) আকাশ থাইকা আমদানি করতে শুরু করলেন এবং নারীগণরে বন জঙ্গল থাইকা সোজা বাচ্চা কাচ্চা ধরাইয়া মাতৃত্বকে দেবীময় সম্মান দিয়া ঘরে ঢুকাইয়া দিলেন। সেই থাইকা নারী অানাড়ি হইয়া যাইতে শুরু করলো।
 
আর হ্যাঁ, আপনি যদি বলেন মানে পুরুষতান্ত্রিক এবং ধার্মিক নারীপুরুষগণ বলেন, নারীকে তো সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং শারীরিকভাবে দুর্বল, নাজুক বানাইয়া দুনিয়ায় পাঠাইছেন তাদেরকে বলবো, নারী কোনদিক দিয়াই দূর্বল না বরং প্রচণ্ড শক্তিশালী। এই যে ধরেন, দুই যমজ ভাইদের, একজনরে যদি ঘরের মধ্যে বন্দি কইরা রাখা হয় এবং অন্যেকজনকে যদি রেসলিং শেখানো হয় তাহলে দু’জনের শারীরিক কাঠামো স্পষ্টত পার্থক্য বিদ্যমান। নারীকে সব ধর্ম, সমাজ গৃহবন্দী কইরাই রাখছে যুগের পর যুগ।
 
এখানে পরিবেশগত কারণ ছাড়াও বংশগতির প্রভাবও লক্ষণীয়। যেমন, একজন আমেরিকানের শারীরিক কাঠামো এবং একজন বাঙ্গালির শারীরিক কাঠামো সেইম না। আবার দেখেন, সেই ৭৪ বছর পর এখনো হিরোসিমা নাগাসাকিতে পঙ্গু পোলাপাইন জন্মাচ্ছে। সুতরাং, নারীকে শারীরিকভাবে দূর্বল মনে করাটা আপনার অজ্ঞতা এবং নির্বুদ্ধিতার পরিচয় । আপনি পৃথিবীর ইতিহাস পড়েন, অভিযোজন সম্পর্কে জানেন। নিজেই বুঝতে পারবেন আজ নারীরা কেনো উচ্চতায় খাটো, কেনো পেশাগত জীবনে পিছিয়ে, কেনো আবেগীয় দিকে ভঙ্গুর। এইগুলা কোনো সৃষ্টিকর্তার কাজ না, এইগুলা হইলো আলাদিনের চেরাগ (ধর্ম) এর কেরামতি এবং নারীগণের ভুল সিদ্ধান্তের ফসল। সেদিন নারীগণ পুরুষগো মিষ্টি কথায় কান না দিলে এবং বিনা পরিশ্রমে সুখ নিদ্রায় যাবো, সাইজাগুইজা রানীর হালে থাকুম এবং দাসদাসীগণ আমার কথায় উঠবে বসবে এই লোভে গা না ভাসাইলে আজ নারীবাদের দরকার পড়তো না। সেই আদি আমলের মতো আজও মাতৃতান্ত্রিক সমাজ বিদ্যমান থাকতো।
 
এরপর আসি আপনার পুরুষবিদ্বেষ নিয়ে। আচ্ছা, আপনার কেনো মনে হয় নারীবাদী মাত্রই পুরুষবিদ্বেষী? সে আর কিছু কয় না। আমি বললাম, ভাই শোনেন, অনারীবাদী মাইয়া মানুষ কি করে জানেন? তাদের বেশিরভাগ সারজীবন তিনটা পুরুষকে ভালোবাসেন। যেমনঃ বিয়ের আগে বাপ, ভাই এবং বিয়ের পর নিরাপত্তা এবং নির্ভরশীলতার স্বার্থে স্বামীকে ভালোবাসেন। অন্যদিকে আমি অজস্র পুরুষকে ভালোবাসি। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পুরুষ কল্পনা এবং বাস্তবে আমার মন এবং দেহ রাঙায় । পুরুষের দেহ, মন আমার কাছে তো বরাবরই ফ্যান্টাসির মতো। এমনকি আমার প্রেমিকদেরও আমার বিল টিল পে করতে হয় না এবং ভবিষ্যতে বিয়া করলে বরের আমার ভাত, কাপড়ের দায়িত্ব নেওয়া লাগবে না। ভবিষ্যৎ বর চাইলেই তার পছন্দের রমণীদের সাথে শুইতেও পারেন। তাতেও সমস্যা নাই আমার কারণ স্বাধীনতায় কঠোরভাবে বিশ্বাসী আমি। অনারীবাদী মহিলাদের মতো “আমার স্বামী আমার সম্পত্তি” এমন মর্মে বিশ্বাসী না আমি।
 
এখনো কি আপনার মনে হয় নারীবাদী মাত্রই পুরুষবিদ্বেষ? সে কয়, না না! আসলে আমার ধারণাটা ক্লিয়ার আছিলো না। আমি বললাম, আরো একটা বিষয় ক্লিয়ার করি আপনারে। নারীবাদী ছাড়াও আরো একটা টার্ম আছে। যেইটা হইলো- উপনারীবাদী। পুরুষ নারীবাদীগণ এর আওতাভুক্ত। এখন আপনি নিজেরে কি মনে করেন?
 
মি. পুলিশ বললেন- তাইলে আমি আগে উপনারীবাদী, তারপর মানবতাবাদী।
 

  • ৭২৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফাহমিদা জামান ফ্লোরা

শিক্ষার্থী (ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) এবং নারীবাদী লেখক।

ফেসবুকে আমরা