ফারহানা আনন্দময়ী

লেখক

এই অন্ধকূপই আমার দেশ

নিজেদের নির্বিকার নির্লিপ্ততায় আমরা আতঙ্কের গিরিখাদ তৈরি করবো আর বলতেই থাকবো, আততায়ীর উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ নয়, তা কী ক’রে হবে? 

এই প্রতিবাদহীনতা তো আজকের নয়। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই ‘ও আই সি’র সদস্যপদ পাওয়ার জন্যে কী তোড়জোড়... ‘আমরা সবাই বাঙ্গালি’র স্থপতি বঙ্গবন্ধু সেদিন আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে বাঙালি মুসলমান হলেন। ’৭৫এ যেদিন সৌদি আরব স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলো... ‘বাংলাদেশি’রা যেন বিশ্ব জয় করলো। মেজর জিয়া যেদিন সংবিধানে একটি বিশেষ ধর্মের বাণী সংযুক্ত ক’রে দিলেন, স্বৈরাচার এরশাদ যেদিন সংবিধানে রাষ্ট্রের একটা ধর্মীয় পরিচয় খোদাই ক’রে দিলেন... সেদিন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের কতজন রাজপথে নেমেছিলেন এর প্রতিবাদে?

হাস্যকর এক স্ববিরোধিতা সংবিধানে নিয়েই দশকের পর দশক রাজত্ব চালাচ্ছেন রাজা-রাণীরা। এভাবেই তাদের সকলের প্রশ্রয়ে হাঁটি হাঁটি পায়ে পায়ে এগিয়েছে ইসলামী মৌলবাদীরা তাদের গন্তব্যের দিকে। নির্বিঘ্নে পৌঁছেও যাচ্ছে। এই তো সেদিন হাটহাজারীর মাদ্রাসায় শফি মোল্লার কাছে বর্তে যাওয়া ভঙ্গীতে দোয়া নিতে যান ডিজিটাল বাংলাদেশের সম্মানিত মন্ত্রী। এভাবেই সাধের অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ সেই বাংলাদেশ ধর্মান্ধ মৌলবাদের কাছে নতজানু হ’তে হ’তে আজ মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।

এই বাংলাদেশে পৌঁছে আজ একজন মুক্তমনা লেখক তাঁর মুক্ত মত প্রকাশের জন্যে মৌলবাদীদের চাপাতির কোপ খাবেন, ভিন্নমতের জন্য দিনে-দুপুরে ঘর-কার্যালয় থেকে নিরীহ মানুষেরা গুম হয়ে যাবেন, ভিন্নধর্মীয় বিশ্বাসের জন্যে অপমানিত, নিগৃহীত হবেন... এতে এতো অবাক হওয়ারই বা কী আছে, শুধু ফেসবুকে ঝড় উঠিয়ে প্রতিবাদেরই বা কী আছে ? নিজের বুকে হাত দিয়ে বলুন তো আমরা ক’জনে নিজেদের এবং পরবর্তী প্রজন্মের মানসিক গঠন এভাবে তৈরি করেছি যে কোনোরকম মুক্তমত, ভিন্নমত সহজ চিত্তে গ্রহণ করতে পারি? ধারণ করার প্রশ্ন তো অনেক পরের। যারা মুক্তচিন্তা করছে তাঁদেরকে বুঝতে হবে, আমাদের মগজটা এখনো অতোটা পরিণত হয়নি, ভিন্নমতকে সহ্য করার মতো উপযোগীও নয়। রাষ্ট্র এবং তার নাগরিক কেউই অতোটা পরিণত বা উদার এখনো হয়নি।

মুক্তমত প্রকাশের জন্যেও যেমন, ভিন্নমত শোনার জন্যেও, পড়ার জন্যেও একটা আধুনিক মনন থাকা জরুরী। অশিক্ষিত মানুষের কথা ছেড়েই দিলাম, শিক্ষিত সংস্কৃতিবান ক’জন মানুষের এটা আছে? তারা বেশীরভাগই আজ পর্যন্ত আধুনিক পোশাককেই সহজ দৃষ্টিতে দেখতে পারেন না, সেখানে আধুনিক বোধকে কীভাবে সহজ ভাবে দেখবেন? না, আমি এটাও বলছি না, যে আধুনিক পোশাক পড়লেই সে মননেও আধুনিক হবে... তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটাই হয়। আজকাল কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে গেলে নিজেকে এলিয়েন মনে হয়, চারপাশের দৃষ্টি এমন জিজ্ঞাসু থাকে।( ব্যতিক্রম, গত সপ্তাহের 'আনন্দময়ী' সম্মিলন) বাংলাদেশ যে চিন্তা চেতনায় পেছন পথে হাঁটছে রাস্তায় বেরোলে বেশ টের পাই... প্রতি দশজন নারীর আটজন হিজাব নামক এক বিজাতীয় পোশাকে আবৃত। অথচ ৩/৪ বছর আগেও এই পোশাকে থাকা কোনো নারীকে আশেপাশে দেখলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিটা তার দিকেই যেত... অথচ আজ এই দৃশ্যটাই যেন বড্ড স্বাভাবিক। তো একটুও অবাক হবেন না, সমাজের সামাজিক-সাংস্কৃতিক এই পরিবর্তনে। কারণ ক্ষেত্রটা আমরাই তৈরি ক’রে দিয়েছি। আমাদের নির্লিপ্ততা, আমাদের প্রতিবাদহীনতা, আমাদের প্রতিরোধহীনতা তাদেরকে ধর্ম-আশ্রিত সমাজের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।।

একটা আলোকিত বাংলাদেশ গড়ার জন্যে কী দরকার ছিলো প্রথম থেকেই... শিক্ষা, যুগোপযোগী বিজ্ঞানমুখী শিক্ষা। পারিনি আমরা এক ধারার আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে। জ্যামিতিক হারে বাড়ছে মাদ্রাসা রাষ্ট্রের মদদে। যেখানে প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি উপজেলায় পাঠাগার গড়ে তোলার কথা সেখানে আমরা চারতলা মডেল মসজিদ বানানোর প্রকল্প হাতে নিচ্ছি। জানালাটা যদি এভাবেই শুরুতেই বন্ধ ক’রে দিই, মুক্তভাবনার আলো বাতাস ঢুকবে কোন দিক দিয়ে? শুরুটা হতে হয় শুরু থেকেই, গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালতে ঢালতে যদি বলি, মুক্ত মত প্রকাশের স্বাধীনতা চাই... কী ক’রে হবে? রাষ্ট্র তো দেশের বেশিরভাগ টাইপ মানুষের পাল্‌স বুঝেই হাঁটবে। তাই যতদিন দেশের মানুষের মানসিকতা পরিবর্তন না হবে, ততদিন কারো সাধ্য নেই ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে মুখ-ফেরানো এবং অসাম্প্রদায়িকতার বিপরীতমুখী হাওয়ার দিক পরিবর্তন করার।

খুব ব্যক্তিগত একটি বিষয় দিয়ে শেষ টানি। আমাদের দুই সন্তানকে যখন ছোট্টবেলায় একটি মিশনারী স্কুলে ভর্তি করলাম, আশেপাশের চেনা মানুষেরা সাবধান করলেন, ওখানে তো বাইবেল পড়ায়, ওই স্কুলে বাচ্চাদেরকে ভর্তি কোরো না। কেনো, ওরা খ্রীষ্টান হয়ে যাবে সেই ভয় পাচ্ছো, আমি বললাম। আজ আমার মেয়ে ওই স্কুল থেকেই ১২ ক্লাস শেষ ক’রে কলেজে গ্রাজুয়েশন করছে... ও কিন্তু খ্রীস্টান হয়নি, বরং অনেক বেশি মানবিক মানুষ হয়েছে। ও প্রশ্ন করতে শিখেছে, ও প্রশ্নহীন কিছু মানতে না-রাজী হতে শিখেছে।

রামুতে পুড়ে যাওয়া বৌদ্ধমন্দিরে গিয়ে বাবা-মায়ের কাছে টাকা চাওয়ার অপেক্ষা না ক’রে নিজের জন্মদিনে পাওয়া টাকার থেকে নির্দ্বিধায় হাজার টাকা সাহায্যবাক্সে দিতে পারার মতো মানবিক হয়েছে আমাদের ছেলেটা। না, কোনো বিশেষ ধর্মের প্রভাব ওদেরকে গ্রাস করেনি। ওরা ধর্ম বলতে শুধু 'মানুষ' বুঝতে শিখে নিয়েছে।

যেদিন আমার মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গীকারপত্রে সন্তানদের স্বাক্ষর প্রয়োজন হলো, ওরা সই ক’রেই দুজনেই আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, "মা, I feel proud of you. আমরাও একদিন...।“ ঘর থেকেই শুরু করেছিলাম... একটু একটু ক’রে চিন্তার মুক্ত আকাশে ওড়বার জন্য ঘরের জানালা খুলে দিতে চেয়েছি নিজের সন্তানদের জন্যে... কিছুটা তো পেরেছি। আমার আংশিক মুক্তি ওখানেই... লড়াই আরো বাকী। সকলেই যদি শুরু থেকেই শুরু করতেন তাহলে আজ চারপাশে ঘন হয়ে আসা অন্ধকার দেখে আমাদের অক্ষম ক্রোধে ফেটে পড়তে হতো না, শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হতো না।

আলো লিখবো ব’লে বসেছিলাম... অন্ধকার এঁকে গেলাম।

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।