নারীর জন্য যা দায়িত্ব পুরুষের জন্য কেনো তা মহত্ব!

শুক্রবার, মার্চ ৮, ২০১৯ ৬:০৮ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


পুরুষমাত্রই মহৎ। পুরুষেরা অনেক অনেক মহৎ। এ পুরুষ সমাজে আনাচে কানাচে খুঁজলেই পাওয়া যাবে অনেক অনেক মহৎ পুরুষ! পুরুষ সমাজের পুরুষদের জন্য মহৎ হওয়াটা অনেক সহজ আর সস্তা বটে। আমাদের এ সমাজে পুরুষের এই "মাহাত্ম্য" চোখে পড়ার মতো! তবে ভাববার বিষয় হচ্ছে, এ মাহাত্ম্যপূর্ণ অবস্থান কিন্তু পুরুষেরা অর্জন করে নি বা কেড়েও নেয় নি। আমরাই তাদের দিয়েছি, দিচ্ছি। সেধে সেধে দিচ্ছি উৎফুল্ল মনে আর সুস্থ মস্তিষ্কে।
 
জানেন তো, স্বামী আর স্ত্রী হচ্ছে একে অন্যের জন্য সহযোগী! ওদের অর্ধাঙ্গ আর অর্ধাঙ্গিনী বলা হয়! এদের দায়িত্ব একে অন্যের সকল কাজে উৎসাহ জোগানো, অনুপ্রেরণা দেয়া! আহা!! যতটা সুন্দর সংজ্ঞা তার চেয়েও বেশি সুন্দর এ সম্পর্কের বৈশিষ্ট্য! তবে তা হয়তো শুধু খাতা কলমেই, বাস্তবে নয়!
 
নইলে কেনো শুধুমাত্র স্ত্রীর কোনো পদক্ষেপে/কাজে অনুমতি দিলেই স্বামীটা মহৎ হয়ে যাবে? খুবই কমন কিছু বাক্য, জীবনে একবারও শুনে নি এমন পুরুষও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ আছে। "আল্লাহ!! আপনার হাজবেন্ড কত্ত ভালো, আপনাকে কত্ত সাপোর্ট করে!" "আপনার পরম সৌভাগ্য এমন স্বামী পেয়েছেন, আপনার কথার সম্মান করে!" "অমুকের বউয়ের তো রাজকপাল, অসুস্থ হলে স্বামী ঘরের কাজে অনেক হেল্প করে!" এই-সেই, আরও কত কী!
 
 
কি আজব তাই না! অসুস্থ স্বামীর সেবা করা দায়িত্ব আর অসুস্থ স্ত্রীর সেবা করা মাহাত্ম্য! স্বামীর সকল পদক্ষেপে অনুপ্রেরণা দেয়া দায়িত্ব আর স্ত্রীকে অনুপ্রেরণা দেয়া মাহাত্ম্য! স্বামীর কাজে সাহায্য করা দায়িত্ব আর স্ত্রীর কাজে সাহায্য করা মাহাত্ম্য! স্বামীর অনুশাসন মেনে চলা দায়িত্ব আর স্ত্রীর পরামর্শ নেয়াটাও মাহাত্ম্য! স্বামীর পরিবারের দেখাশুনা করা দায়িত্ব আর স্ত্রীর পরিবারের খোঁজ খবর রাখাটাও মাহাত্ম্য! সন্তান লালন-পালন স্ত্রীর জন্য দায়িত্ব আর স্ত্রীর প্র‍য়োজনে দুই ঘন্টা বাচ্চা সামলানোও স্বামীর মাহাত্ম্য! পা থেকে মাথা পর্যন্ত তেল মালিশ করা স্ত্রীর দায়িত্ব আর অসুস্থ স্ত্রীর মেডিসিন এগিয়ে দেয়াও মাহাত্ম্য! স্বামী রোজগার কম করলে টেনেটুনে কোনমতে সংসার চালানো দায়িত্ব আর যখন অনেক রোজগার করবে তখন পরনারীর প্রতি আসক্ত না হওয়াটাও মাহাত্ম্য! কালো মেয়ে বিয়ে করা মাহাত্ম্য! গরিব বাবার মেয়ে বিয়ে করা মাহাত্ম্য! যৌতুক না নেয়া মাহাত্ম্য! যা কিছু স্বাভাবিক হওয়ার ছিলো, সকল কিছুতেই মাহাত্ম্য! স্ত্রীর সফলতায়ও স্বামীর মাহাত্ম্য! "স্বামীর সাপোর্ট না থাকলে কি আর করা যেতো"! অথচ মেয়েটা হয়তো স্বামীর সাপোর্ট দূরের কথা, অনুমতিই পায় নি। হয়তো অনেক শারীরিক মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করে খুড়িয়ে খুড়িয়ে স্বপ্নের পথে হেটে সফলতা লাভ করেছে। কিন্তু একচেটিয়াভাবে আমরা সকল কৃতিত্ব সেই মহৎ স্বামীটার ঝুলিতেই পুরে দেই।
 
পুরুষের এ সমাজে নারীর জন্য কি আছে? একই ক্ষেত্রে, একই পরিস্থিতিতে, একই কর্মে নারী কেনো মহৎ হতে পারলো না। সমাজের এ কেমন নিয়ম? নিজের বাবা মা ছেড়ে এসে অন্যের বাবা মায়ের সেবা করা নারীর জন্য দায়িত্ব। নিজের অসুস্থ বাবার সেবা করার চেয়ে মামা শ্বশুর বা চাচা শ্বশুরের জন্য কোরমা পায়েশ রান্না করা নারীর জন্য দায়িত্ব। নিজের ক্যারিয়ার, রাতের ঘুম বাদ দিয়ে বাচ্চা লালন করা নারীর জন্য দায়িত্ব। অসুস্থ হলেও শ্বশুরবাড়ির চৌদ্দগুষ্টির জন্য রান্না করা নারীর জন্য দায়িত্ব। বাড়ির যেকোনো অনুষ্ঠান পার্বণে সবাই যখন উপভোগ করে তখন বুয়াগিরি করা নারীর দায়িত্ব। নিজের সব কিছু ত্যাগ করা নারীর দায়িত্ব। নিজেকে বিলিয়ে দেয়া নারীর দায়িত্ব। নিজের স্বপ্নের বলি দেয়া নারীর দায়িত্ব। নিজেকে ভুলে যাওয়া নারীর দায়িত্ব। নিজেকে অন্যের পদতলে পিষ্ট করা নারীর দায়িত্ব। চুপ করে থাকা নারীর দায়িত্ব। যা কিছুই হোক, নিজেকে মানিয়ে নেয়া নারীর দায়িত্ব। এত কিছুর পরেও কিছু না করার হতাশায় ডুবে বুদ হয়ে যাওয়া নারীর দায়িত্ব। নিজেকে বিলিয়ে দিতে দিতে নিজেকে হারিয়ে ফেলা নারীর দায়িত্ব।
 
কেনো এসব আজব নিয়ম সমাজে? কে তৈরি করলো এসব নিয়ম? কিভাবে তৈরি হলো এসব নিয়ম? এটা কেমন নিয়ম? সমাজ তো সকলের জন্য! তাহলে সমাজের নিয়মগুলো কেনো শুধু একপক্ষকে সুবিধা দিচ্ছে আর আরেক পক্ষকে পদদলিত করছে? একপক্ষ কখনই তার স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করছে না। যদিও বা করছে, পাচ্ছে "মহৎ" ট্যাগ! আর প্রকৃতপক্ষে যে নারী কিনা মহত্বের পরিচয় দিয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে, তাদের কি দিয়েছে সমাজ? কি দিয়েছি আমরা? শুধুই সান্তনা আর ধোকা!
 
শ্বশুর শাশুড়ির সেবা করা কি শুধু নারীরই দায়িত্ব? বাচ্চা লালন করা কি শুধু মায়েরই দায়িত্ব? সংসারের জন্য ত্যাগ করা কি শুধু নারীরই দায়িত্ব? আর কত দায়িত্ব চাপানো হবে নারীর কাঁধে! এতোসব দায়িত্বের বেড়াজাল সত্ত্বেও কোনো নারী যখন নিজ সাহসে মাথা উঁচিয়ে চলতে চায় তখন আবার কেনো এই সমাজের চক্ষুশূল হতে হয়?
 
এ সমাজে যেমন পুরুষদের মহৎ বলতে সময় লাগে না, তেমনি নারীদের নষ্টা বলতেও সময় লাগে না। যে  নারী কিনা সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে বারবার নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছে, বলি দিচ্ছে তাকেই সমাজ হেয় করছে। একটা পক্ষ যে কিনা নিজের দায়িত্বটাই জানে না, মানে না, যে নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবতে ভাবতে মানবতারও উর্ধ্বে চলে যাচ্ছে, যে হিংস্র হতে হতে পশুকেও হার মানাচ্ছে, তাকে আমরা বলছি স্বাভাবিক। আর এই হিংস্রতা ছেড়ে স্বাভাবিক হলে আমরা বলছি "মহৎ"!
 
পুরুষের ক্ষেত্রে যা কিছু স্বাভাবিক দায়িত্ব হওয়ার কথা ছিলো তার সকল কিছুই "মাহাত্ম্য"!

“আসেন মহাপুরুষ না বানিয়ে আমরা পুরুষকে তার দায়িত্ব শেখাই!”

  • ৪২০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফারজানা হোসেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বর্তমানে একই বিভাগে এম.ফিল গবেষনায় রত।

ফেসবুকে আমরা