চলছে বিচারহীন ধর্ষণের সংস্কৃতি

শুক্রবার, জানুয়ারী ৪, ২০১৯ ১২:১৮ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


একেকটি ধর্ষণের ঘটনা, পত্রিকার পাতা আর টেলিভিশনের পর্দায় তোলপাড়, তারপর সব চুপচাপ। প্রতিবারই এমনটা ঘটছে। ঘটেই চলেছে। তাও যে খবরগুলো প্রকাশ পায়, শুধু সেগুলোর ক্ষেত্রে।

নারীর ওপর শক্তি প্রয়াগের চরম রূপ ধর্ষণ। ধর্ষণ যতোটা অবদমিত যৌনতা, তার চেয়ে বেশি নারী বিদ্বেষের প্রকাশ। অনেকেই দাবি করেন, ধর্ষণ বিকারগ্রস্ত লোকের বিকৃত কাজ। কিন্তু ধর্ষণ মোটেই বিকারগ্রস্তের রোগ নয়, এটি পুরুষতন্ত্রের রোগ, সচেতন ভাবে নারীকে সন্ত্রস্ত রাখার উপায়। পুরুষতন্ত্র উৎসাহ দেয় ধর্ষণে। সমাজও ধর্ষণকারীর পক্ষে।

ধর্ষণ একটি রাজনৈতিক অপরাধও বটে। নারীকে অধীনে রাখার উপায়, নারীর ওপর বল প্রয়োগের প্রধান অস্ত্র। ধর্ষণকে রাজনৈতিক রূপ দিয়েছে পুরুষতন্ত্র।

ধর্ষণ যে একটি রাজনৈতিক ব্যাপার এটি বোঝা যায় কোনো দখলকারী সেনাবাহিনী কর্তৃক অধিকৃত অঞ্চলের নারীদের ধর্ষণের ঘটনায়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক ৩ লক্ষ বাঙালি নারী ধর্ষিত হয়েছিলো।

ধর্ষকের নখরে ছিন্নভিন্ন নারীদের রক্তরেখায় বাংলাদেশের জন্ম। ধর্ষণ যে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী অপরাধ, সেটি এই দেশের মর্মমূলে প্রোথিত থাকা উচিত। অথচ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরেও ধর্ষণের শিকার যে নারীরা বেঁচে গেছেন, সমাজ তাঁদের গ্রহণ করে নি। ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে তাঁদের স্বীকৃতি দিতেও চার দশকের অধিক কাল লেগে গেছে।

অথচ একাত্তরের ধর্ষণ থেকেই আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠার কথা যে ধর্ষণ একটি রাজনৈতিক অস্ত্র। একটি দেশ আর একটি দেশকে দখল, বিনষ্ট, ধ্বংস করার উপায় হিসেবে ধর্ষণকে ব্যবহার করে, তেমনি জাতিগত ঘৃণা প্রদর্শনের জন্য, শক্তি প্রদর্শনের জন্য, কাউকে দখলে রাখার জন্য ধর্ষণ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।  ভোটে জিতে পরাজিত দলের সমর্থক কিংবা পরাজিত দলকে ভোট দেওয়ার অপরাধে ধর্ষণ ক্ষমতার প্রদর্শন এবং পৈশাচিক উল্লাসেরই অংশ।

মেয়েদের দমন, পীড়ন বা তাদের হেয় করার মধ্যে পুরুষেরা আনন্দ খুঁজে পায়। এটা পুরুষতন্ত্রের বিকৃতি। যৌন বিকৃত ধর্ষকেরা লিঙ্গের ক্ষমতার প্রদর্শনের জন্যে নারী বা শিশু কন্যার উপর জুলুম করতে ভাবে না। ধর্ষণ আর যাই হোক যৌন সংগম নয়। নারীর উপর শক্তি প্রয়োগের চরম রূপ ধর্ষণ। এসবের জন্য পারিবারিক দায় যেমন রয়েছে তেমনি রাষ্ট্রীয় দায়ও কোনো অর্থে কম নয়।

শিশু থেকে প্রৌঢ়, ধনী থেকে দরিদ্র, গ্রাম কিংবা শহরবাসী, বিবাহিত বা অবিবাহিত, প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, কামিজ-হিজাব-শাড়ি-টপস পরিহিত, যে-কেউ এর শিকার হতে পারেন। ধর্ষণের কোনো নির্দিষ্ট পরিসর কিংবা সময় নেই যেখান থেকে গা বাঁচিয়ে চলা যায়। ঘরের ভেতর, উৎসবের ময়দান, মিলনায়তন, কর্মক্ষেত্র কিংবা আসা-যাওয়ার পথ, সর্বত্র লোলুপ থাবা।

ধর্ষণ হলো ক্ষমতার আস্ফালন। ঘরে বাইরে সর্বত্র পুরুষ যখন নারীর ওপর ক্ষমতা প্রদর্শন করতে চায়, যখন নারীকে জানাতে চায় তুই আমার পায়ের নীচের মানুষ, তখন সে নানাভাবে মেয়েদের নির্যাতন করে, ধর্ষণ তেমনই এক নির্যাতন। সমাজে ধর্ষণকে মেয়েদের ওপর ঘৃণ্যতম অপরাধ হিসেবে দেখা হলেও এই সমাজই ধর্ষক বানায় পুরুষকে। এখানে মনে করা হয় নারীর যোনিতেই তাদের সম্মান লুকানো আছে। অতএব নারীর অথবা তার পরিজনদের সম্মানহানির উপায় হলো মেয়েকে ধর্ষণ করা। ধর্ষণের সঙ্গে কামনার লেশমাত্র সম্পর্ক কিন্তু নেই।

পুরুষ অত্যন্ত যৌন কাতরতায় ধর্ষণ করে, তা নয়। এর সাথে ক্ষমতার সম্পর্ক রয়েছে। ধর্ষণ হলো নারী বিদ্বেষ এবং পুরুষের একটি ঝুলন্ত প্রত্যঙ্গের ক্ষমতার প্রকাশ। পুরুষ মনে করে এসেছে নারী তার অধঃস্তন, তাই তার উপর জোর-জবরদস্তি করা চলে। পুরুষ জেনে এসেছে নারী যৌনবস্তু, নারী খাদ্য। ধর্ম শিখিয়েছে নারীর অবস্থান পুরুষের নিচে, নারী শস্যক্ষেত্র, গণিমাতের মাল। যুদ্ধে জিতে পরাজিত দলের নারীদেরকে ধর্ষণ করা ধর্মও জায়েজ করে দিয়েছে। তাহলে ভোটে জিতে পরাজিত দলের সমর্থক নারীকে কেনো ধর্ষণ করা হবে না? কেনো বিজয়ী দলের পুরুষ অন্য দলে ভোট দেওয়ার প্রতিশোধ নিবে না ধর্ষণ করে? কেনো বিজয় উল্লাস করতে ধর্ষণ উৎসব করবে না? নারীর প্রতি ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পুরুষকে সাহায্য করে ধর্ষক হতে। তাই পুরুষ প্রতিনিয়ত উৎসাহী হয়েছে তার পুরুষাঙ্গের ক্ষমতার প্রদর্শনে। পুরুষের মতো এমন যৌন ইতরতা, এতোটা যৌন বিকৃতি আর কোনো প্রাণীর আছে কী না আমি জানি না!

বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে দেশে ধর্ষণ বেড়েই চলছে। সমাজ, রাষ্ট্র, ক্ষমতাসীন দল পরোক্ষ ভাবে, কখনো বা প্রত্যক্ষ ভাবে ধর্ষকের পক্ষ নেয়। ফলে আমাদের সোনার বাংলাদেশে বিচারহীন ধর্ষণের সংস্কৃতি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। আর এখানে ধর্ষক বুক ফুলিয়ে বীরের বেশে ঘুরে বেড়ায়, ধর্ষিতার স্থান হয় ঘরের কোনে- যদি বেঁচে থাকে সে। যেন ধর্ষিত হওয়া এদেশে নারীরই অপরাধ। 

কি অদ্ভুত আমাদের সমাজ! যেখানে নারী-শিশুদের নিরাপত্তা দেওয়া তো দূরে থাক, তাদের যৌন নির্যাতনকারীদের পরোক্ষভাবে সহায়তা করে যাচ্ছে এই সমাজ। বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই সব অপরাধী। মনের মধ্যে পৈশাচিক আনন্দ নিয়ে নতুন কোনো নারী বা শিশুকে লক্ষ্য করে এগোচ্ছে। এটাই যদি হয় আমাদের সমাজের রূপ তাহলে কেনো বন্ধ হবে শিশু ধর্ষণ, যৌন হয়রানির মতো সমাজের বুকে গেঁথে যাওয়া অপরাধগুলো!


  • ৪৬৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফারজানা কাজী

সমাজ কর্মী

ফেসবুকে আমরা