ফরিদ আহমেদ

লেখক, অনুবাদক, দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দীর্ঘ সময় মুক্তমনা ব্লগের মডারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে ক্যানাডা রেভেন্যু এজেন্সিতে কর্মরত অবস্থায় আছেন। টরন্টোতে বসবাস করেন।

স্বাস্থ্যকর্মীরাই আমাদের হিরো আসুন তাঁদের পাশে দাঁড়াই

বাংলাদেশে প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী সনাক্ত হয় মার্চ মাসের আট তারিখে। কিন্তু, সনাক্ত হবার পরেও, সরকারীভাবে এর গুরুত্বকে অনুধাবন করা হয়নি। জনগণের একটা বিরাট অংশও এর পরিনাম বিষয়ে সম্যক ধারণা করে উঠতে পারেনি। এখনো যে পেরেছে, সেটাও না। বেশিভাগেরই আসলে করোনার ভয়াবহতাটা সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। তারা এখনো আগের মতো আনন্দ-উল্লাস আর রসালো রসিকতায় জীবন কাটাচ্ছে।

করোনা আক্রান্ত রোগী সনাক্ত হবার সময়ে শিক্ষায়তনগুলো বন্ধ করার জন্য চাপ এলেও, শিক্ষামন্ত্রী তাতে কোনোভাবে সাড়া দিচ্ছিলেন না। তিনি বার বার বলে যাচ্ছিলেন এগুলো বন্ধ করার মতো পরিস্থিতি এখনো হয়নি। কারো কারো মধ্যে তখন ধারণা জন্মায় যে মূলত মুজিব শতবর্ষে স্কুল, কলেজের বাচ্চাদের ব্যবহার করার জন্যই স্কুল বন্ধ করা হচ্ছে না। যাই হোক, অবশেষে স্কুল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত আসে। মুজিব শতবর্ষের অনুষ্ঠানকেও সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কিন্তু, সেই সীমিতের মধ্যেই বড়ো ধরনের সর্বনাশ হয়ে যায়। সতেরো তারিখ রাতে আতশবাজি পোড়ানো হয়। এটা দেখার জন্য বিশাল এক জনসমাবেশ গড়ে ওঠে ঢাকায়।

আগেই বলেছি, শুধু সরকার নয়, বাংলাদেশের জনগণের একটা বিরাট অংশও তখন করোনা ভাইরাস নিয়ে অসচেতন ছিলো। স্কুল বন্ধের সুযোগ নিয়ে তারা ছুট লাগায় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে। সেগুলো লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। জনগণকে দোষ দিয়েও আসলে লাভ নেই। কারণ, সরকারী পর্যায় থেকে করোনার ব্যাপারে কোনো সচেতনতাই তখন পর্যন্ত গড়ে তোলার উদ্যোগ দেখা যায়নি। বরং সরকারের মন্ত্রীরা করোনা মোকাবেলায় সরকার প্রস্তুত আছে, করোনার চেয়ে আমরা বেশি শক্তিশালী বা প্রধানমন্ত্রী ভোর রাতে তাহাজ্জদে নামাজ পড়েন, কাজেই করোনা আমাদের কিছু করতে পারবে না, এই সব কথা বলে মানুষকে মিথ্যা নিরাপত্তার ধারণা দিয়েছে।

শুধু মন্ত্রীদের না, প্রধানমন্ত্রীর আচরণ থেকেও করোনার ভয়াবহতার বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত সাধারণ মানুষ পায়নি। বরং তারা দেখেছে এই ক্রান্তিকালে অপ্রয়োজনী নির্বাচন অনুষ্ঠান করেছে সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী সেখানে ভোট দিয়ে হাসিমুখে দুই আঙুল তুলে বিজয় চিহ্ন দেখিয়েছেন।

সেই সময় করোনার ভয়াবহতা নিয়ে কেউ কথা বললেই তাদেরকে গুজব সৃষ্টিকারী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আনন্দময় সময়ে নিরানন্দময় ঘ্যানঘ্যান শুনতে তারা প্রস্তুত ছিলো না।

এর পরে পরিস্থিতি আরেকটু খারাপ হলে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। কিন্তু, পরিবহন ব্যবস্থা চালু রেখে দেয়। ঢাকা শহরে এখনো প্রায় অর্ধেক সংখ্যক মানুষই ঢাকার বাইরের। পেশার প্রয়োজনে ঢাকা শহরে থাকে তারা। স্বাভাবিকভাবেই ছুটি পেয়ে তারা ছুটে গেছে নিজস্ব জায়গায়। নানা গণপরিবহনে তাদের গাদাগাদি করে যাওয়ার ছবি প্রকাশ হয়েছে গণমাধ্যমে। মুলত লকডাউনের উদ্দেশ্যে করা ছুটিটা বিপরীত ফল ডেকে নিয়ে এসেছিলো। এর মাধ্যমে করোনা ভাইরাস সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে।

এর চেয়েও আরেকটা বড়ো সমস্যা রয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশে এখন মসজিদের কোনো অভাব নেই। শহরের প্রতিটা পাড়া, মহল্লায় মসজিদ। গ্রামে গেলে দেখা যায় এক গ্রামেই একাধিক মসজিদ রয়েছে। এই সমস্ত মসজিদগুলোতে এখন মুসুল্লির কোনো অভাব হয় না। রাষ্ট্রীয় আনুকুল্যে বাংলাদেশে ধর্মান্ধ জনগোষ্ঠীর ব্যাপক বিস্ফোরণ ঘটেছে। এরা শুধু শুক্রবারের জুম্মার নামাজই না, প্রতিদিন পাঁচবেলা করে সমবেত হয়েছে মসজিদে। এটাকে সরকার বন্ধ করার সাহস পায়নি মোল্লারা গোস্যা করবে বলে। অনেক পরে এসে মসজিদের জামাতে কতোজন থাকতে পারবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দিলেও, ক্ষতি যা হবার তা এর মধ্যেই হয়ে গিয়েছে। ভবিষ্যতে যদি কোনোদিন গবেষণা হয়, আমি নিশ্চিত করোনা ভাইরাসের বিস্তারে সবচেয়ে বেশি সহায়ক ভূমিকা পালনে মসজিদের নাম সবার উপরে থাকবে।

এগুলো ছাড়াও আরো অনেক ধরনের দ্বৈত নীতি বাংলাদেশ সরকার নিয়েছে। গার্মেন্ট মালিকদের লোভের শিকার হয়ে গার্মেন্টস কর্মীদের কাজ করতে হয়েছে গাদাগাদি করে। তারা সাধারণ ছুটির পরে ঢাকার বাইরে চলে গেলে, আবার তাদেরকে শত শত মাইল হাটিয়ে ঢাকায় আনা হয়েছে। ঢাকায় এনে বলা হয়েছে ছুটি বর্ধিত হয়েছে, এবার তোমরা আবার বাড়ি চলে যাও। ব্যাংক খোলা রাখা হয়েছে, সেখানে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েছে।

একেবারের শুরুতে যদি যাই, সেখানেও সরকারের ভ্রান্ত নীতির পরিচয় পাওয়া যায়। বিদেশ থেকে আসা বাংলাদেশিদের আলাদা করে রাখতে পারে নাই সরকার। এদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিলো জনপদে কোনো ধরনের মনিটরিং না করেই।

সরকারের এইসব ভুলভ্রান্তির জের হিসাবে আজকে করোনার এই প্রকোপ তৈরি হয়েছে। এটা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। বিশেষজ্ঞরা বহু আগে থেকেই ভবিষ্যতবাণী করে আসছিলেন। কিন্তু, সেগুলোতে বাংলাদেশের সরকার বা জনগণ কেউ-ই গুরুত্ব আরোপ করে নাই। অতিরিক্ত আতংকিত কিছু মানুষের আতংক ছড়ানোর প্রচেষ্টা হিসাবেই দেখা হয়েছে সেগুলোকে।

উহানের করোনার সংক্রমণ শুরু হবার পরে বাংলাদেশ সরকার প্রস্তুতির জন্য তিন মাস সময় পেয়েছিলো। এই তিন মাসে তারা কোনো প্রস্তুতিই নেয়নি। প্রস্তুতি না নিয়ে, তারা প্রস্তুত বলে গলাবাজি করেছে প্রতিদিন। ডাক্তার, নার্সদের সরঞ্জাম প্রস্তুত করা হয়নি, করোনা মোকাবেলায় তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি, হাসপাতাল প্রস্তুত করা হয়নি। ফলে, করোনা যখন সত্যি সত্যি বাংলাদেশে এসে পড়েছে, তখন সহজ পন্থাটা নিয়েছে তারা। সেটা হচ্ছে, এটাকে অস্বীকার করা। করোনা প্রতিরোধে টেস্ট যেখানে সবচেয়ে গুরুত্ব পায়, সেখানে বাংলাদেশে শুরুর দিকে টেস্ট করাটা একটা অলীক বিষয় ছিলো। হাতে গোনা অল্প কিছু মানুষের টেস্ট করেছে আইইসিডিআর। সেই টেস্টেও আসলে কতোজন করোনায় আক্রান্ত সেই তথ্য সঠিকভাবে মানুষকে দেয়নি তারা। টেস্ট করার জন্য অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকেও তারা সংযুক্ত করেনি। একক আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিলো তারা এই বিষয়ে। এই কাজটা কোনো উদ্দেশ্যে তারা করেছিলো, এখন জানা না গেলেও ভবিষ্যতে নিশ্চিতভাবেই সেটা জানা যাবে।

করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যার বিষয়ে তথ্য গোপন করলেও, এই রোগের বিস্তারকে থামাতে পারে নাই আইইসিডিআর। বরং তথ্য গোপন করে সারাদেশব্যাপী এই রোগকে কম্যুনিটি সংক্রমণের পর্যায়ে নিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছে। একটা দেশের মহামারী প্রতিরোধের প্রতিষ্ঠান কীভাবে মহামারীকে ত্বরান্বিত করতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে আমাদের এই কুখ্যাত প্রতিষ্ঠানটা।

এখন যখন করোনাকে আর কোনোভাবেই ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তখন সরকার তার নিজের দায়িত্বে অবহেলার দায় আর নিতে চাইছে না। এর দায় অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে তারা। সহজ টার্গেট হিসাবে তারা বেছে নিয়েছে ডাক্তারদের। যেখানে এই বিপদে ডাক্তাররাই যেখানে আমাদের ত্রাতা হবার কথা, নায়ক হবার কথা, সেখানে তাদেরকে খলনায়ক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার কাজটা তারা খুব সফলভাবে করে ফেলেছে। শুরুটা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে। তিনি তীব্রভাবে ডাক্তারদের আক্রমণ করেছেন। তাঁর সবুজ সংকেত পেয়ে বাকিরাও ডাক্তারদের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগে গিয়েছে। কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের ছয়জন ডাক্তারকে বহিষ্কার করা হয়েছে। যে দ্রুতিগতিতে এদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছে, সেটা দেখলেই বোঝা যায় ডাক্তারদের একটা বার্তা দেবার চেষ্টা করেছে সরকার। তাদের সৃষ্ট আসন্ন মহামারী এবং এর সাথে হাত ধরাধরি করে আসা দুর্ভিক্ষ, এখন আর তাদের দায় নয়, সব দায় এবং দায়িত্ব শুধু ডাক্তারদের। ময়লা আবর্জনা যা তারা জমা করেছে গত তিন মাসে, সেগুলো ডাক্তার, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদেরই পরিষ্কার করতে হবে। সরব সব মন্ত্রীরা এখন নীরব থেকে ঘরের অভয়াশ্রয়ে থাকবে, আর যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেবে চিকিৎসকরা। সেটা কেউ না দিতে চাইলে তার কোর্ট মার্শাল করা হবে।

পৃথিবীর অনেক দেশই এই মুহুর্তে করোনার মোকাবেলা করছে। সব দেশেই এখন সবচেয়ে নন্দিত মানুষ হচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মীরা। মানুষের অফুরন্ত ভালবাসায় সিক্ত হচ্ছে তারা। বাংলাদেশই একমাত্র ব্যতিক্রম। এখানে ডাক্তাররা নিন্দিত হচ্ছে, ফাঁসির আসামীর মতো তাদের ধরে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ফাঁসির মঞ্চে। যেনো সব দোষ শুধু তাদেরই। আর সবাই ধোয়া তুলসী পাতা। করোনাকে ঠেকানোর দায়িত্ব যাদের উপর ছিলো, বিস্তার রোধে যাদের ভুমিকা পালন করার কথা ছিলো, সেই দায়িত্ব এবং ভূমিকা চরমভাবে না করতে পারা সেই লোকগুলো এখন কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে ডাক্তারদের দায়িত্ববোধ শেখাচ্ছে। এর চেয়ে বড় প্রহসন আর হতে পারে না।

815 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।