মেয়ে আট আনা থেকে এক টাকা হতে পারে নি দুইশো বছর পরেও

রবিবার, এপ্রিল ১৪, ২০১৯ ৪:১৭ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


আন্নারা সাত বোন, এক ভাই। ভাইটা জন্মেছে পাঁচ বোনের পরে। আন্নার পরে পঞ্চম বোন হিসাবে চায়নার জন্ম হয়। ওর নামের সাথে চিনের কোনো সম্পর্ক নেই। 'চায় না' থেকে চায়না হয়েছে তার নাম। ওর জন্মের পরে দাই যখন বাইরে এসে মেয়ে সন্তান জন্মের খবর দেয়, আমার দাদি শাশুড়ি নাকি সে কথা শুনে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন।

এতো গেলো বিংশ শতাব্দীর ঘটনা। উনবিংশ শতাব্দীতে বাঙালি সমাজে সবচেয়ে অনাদৃত এবং অবহেলিত ছিলো মেয়েরা। মেয়ে হয়ে জন্মগ্রহণ করাটাই ছিলো এক চরম দুর্ভাগ্যের বিষয় তখন। শুধু তার একার জন্য না, পুরো পরিবারের জন্যই তা ছিলো গুরুতর এক পাপের সামিল। অন্য দিকে, ছেলে সন্তান ছিলো অত্যন্ত আকাঙ্ক্ষিত এবং আদরণীয়। ছেলে জন্মালে বাড়িতে আনন্দ উৎসব শুরু হতো। খুশির বন্যায় ভেসে যেতো চারিধার। ছেলের মাকে রত্নগর্ভা বলে প্রশংসায় সিক্ত করে দিতো সবাই। জগৎচন্দ্র গাঙ্গুলি লিখেছিলেন ছেলের মাকে 'হীরা বিয়ানি' বলে ডাকা হতো।

এর বিপরীতে, মেয়ে জন্মালে বাড়িতে শোকের মাতম পড়ে যেতো। নতুন একটা শিশু বাড়িতে এসেছে, সেটা নিয়ে কোনো আনন্দ-উল্লাস করা হতো না, বরং সবাই মন খারাপ করে এটাকে অশুভ সংবাদ হিসাবেই গ্রহণ করতো। নবজাতককে স্বাগত জানানোর কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হতো না। নিরানন্দময় বিষাদে ডুবে যেতো পুরো পরিবারটি।

পরিবারের অন্য সদস্যদের কথা বাদই দিলাম, এই সন্তানের জন্ম দেওয়া মা-ও সন্তান জন্মের পরে মেয়ে হয়েছে শুনলে মানসিকভাবে চরমভাবে মুষড়ে পড়তো। সন্তান জন্ম দেওয়ার গভীর কষ্টকর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবার এই সময়ে তাকে মানসিকভাবে চাঙা রাখার জন্য বেশিরভাগ সময়েই মিথ্যা কথা বলা হতো। বলা হতো ছেলে জন্মেছে। এই মিথ্যা অবশ্য বেশিক্ষণ টিকিয়ে রাখা যেতো না। ছেলে জন্মালে তাকে স্বাগত জানাতে শাঁখ বাজানো হতো, মেয়ের জন্য কিছু ছিলো না। যখন শাঁখ বাজতো না, তখনই প্রসূতি বুঝে নিতো আসল সত্যটা কী।

সে সময়ে কোনো নারী গর্ভধারণ করলে, পরিবারের লোকজন এবং আত্মীয়-স্বজনেরা সবাই মিলে রাতদিন প্রার্থনা করা হতো যেন ছেলে সন্তান জন্মায়। ভুলেও কেউ কখনো মেয়ে সন্তান জন্মানোর জন্য প্রার্থনা করতো না। যিনি গর্ভধারণ করেছেন, সেই নারীরও জীবনও সুখময় ছিলো না। তার শরীর স্বাস্থ্য নিয়েও কারো কোনো বিকার ছিলো না। তিনি ছেলে সন্তান জন্মানোর একটা মেশিন বই অন্য কিছু হিসাবে কারো কাছে কোনো মর্যাদা পেতেন না। সংবাদ প্রভাকর পত্রিকা লিখেছিলো, “স্ত্রীলোকেরা যে অবধি গর্ভধারিণী হয় সেই পর্যন্ত তাহার আত্মীয়বর্গেরা দেব-দেবীর নিকট প্রার্থনা করেন যে একটি পুত্র সন্তান হউক। কিন্তু কি আশ্চর্য যে কেহ কখন বিস্মৃতক্রমে কহেন না যে এ জনের একটি মেয়ে অর্থাৎ কন্যা সন্তান হউক, তাহার পর দশ মাস দশ দিবস গত হইলে প্রসব হইবার নিমিত্তে ওই গর্ভিণী যখন শুতিকা গৃহে প্রবেশ করেন, তখন তাহার স্বামী পিতা মাতা ইত্যাদি সকলে এই অনুমান করেন যে কি ছেলে হইল, গর্ভিণী কেমন আছে বলিয়া একটি কথাও কেহ জিজ্ঞাসা করে না। যদি গর্ভধারিণীর দুর্দ্দশা প্রযুক্ত কন্যা সন্তান জন্মে তবে মস্তকে বজ্রাঘাতের ন্যায় নিরানন্দের শব্দ পরিজনের মধ্যে ওঠে।

ছেলে সন্তান আর মেয়ে সন্তানের প্রতি আকাঙ্ক্ষার এই পার্থক্য দাইকে দেওয়া পারিশ্রমিকের মধ্যেও ফুটে উঠতো। অধ্যক্ষ জেমস কার লিখেছিলেন, ছেলে জন্মালে দাই পেতো পুরো এক টাকা, আর মেয়ে জন্মালে তাকে পারিশ্রমিক দেওয়া হতো এর ঠিক অর্ধেক, অর্থাৎ আট আনা।

আজ, সেই সময়ের থেকে দুইশো বছর পরে এসেও আমাদের সমাজে সেই আট আনা কি এক টাকা হতে পেরেছে? মনে হয় না। বরং আট আনা থেকে কমে গেছে তার দাম। কল্পনা চাকমা, ইয়াসমিন, তনু কিংবা নুসরাতদের মতো অসংখ্য মেয়েদের দেখলে মনে হয় দুই পয়সাও বুঝি বা দাম নেই মেয়েদের জীবনের আমাদের এই বৈষম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থায়।


  • ৩৩৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফরিদ আহমেদ

লেখক, অনুবাদক, দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দীর্ঘ সময় মুক্তমনা ব্লগের মডারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে ক্যানাডা রেভেন্যু এজেন্সিতে কর্মরত অবস্থায় আছেন। টরন্টোতে বসবাস করেন।

ফেসবুকে আমরা