ফ্রান্স কাফকা : জার্মানভাষী বোহিমিয়ান উপন্যাসিক

শুক্রবার, জানুয়ারী ২৬, ২০১৮ ২:০৫ PM | বিভাগ : সাহিত্য


ফ্রান্স কাফকা: একজন জার্মানভাষী বোহিমিয়ান উপন্যাসিক এবং ছোট গল্প লেখক ছিলেন, যিনি ব্যাপকভাবে বিংশ শতাব্দীর (১৮৮৩-১৯২৪) সাহিত্যের তালিকায় প্রধান সারির লেখকদের মধ্যে একজন হিসাবে পরিচিত। তাঁর কাজ, যা সম্পূর্ণ বাস্তবতাবাদ এবং অতিপ্রাকৃত সামাজিক-আমলাতান্ত্রিক শক্তিসমূহের সমালোচনায় মুখোমুখি হয়, এবং তাঁর লেখনীতে সে সময়ের অস্তিত্বগত উদ্বেগ, অপরাধবোধ, যৌক্তিকতা এবং আধ্যাত্মিক পূর্বাভাস সমুহ প্রাধান্য পায়। তাঁর সেরা লেখা অসংখ্য রচনাগুলির মধ্য একটি হলো "রুপান্তর" বা মেটামর্ফোসিস Die Verwandlung (ডি ফারভান্ডলুংগ)

রুপান্তর

ফ্রান্স কাফকার লেখা একটি গদ্য, ১৯১২ সালে লেখা মাত্র ৭০ পৃষ্টার এই গল্পটির প্রটাগোনিষ্ট হচ্ছে গ্রেগর সামসা, যার দেহ আকস্মিক পরিবর্তন হয়ে একটি পোকায় রূপান্তরিত হয়।

গ্রেগর সামসা, আবিষ্কার করে যে তার শরীর তেলাপোকা জাতীয় কোন এক অদ্ভুত পোকায় রূপান্তরিত হয়েছে। কল্পনার দৃষ্টিতে এই ব্যাপারটা তার কাছে যদিওবা খুবই অস্বাভাবিক এবং গ্রেগরের পরিবারের কাছেও সেটি অস্বাভাবিক ভাবে গৃহীত হয়েছিলো। তারপরও তার পরিবারের সকলেই অনেক চেষ্টা করলো এই ‘বাস্তবতা’কে মেনে নেয়ার। গ্রেগর ছিলো তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম পুরুষ। তার শারীরিক এই রুপান্তরের ফলে তার কর্মক্ষমতা লোপ পায়, কর্মস্থানে আর যেতে পারে না এবং গ্রেগরের এই কর্ম অনুপস্থিতিতে তাদের সংসারের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়ে। অন্যদিকে পরিবারে তেলাপোকার শরীরে বাস করা গ্রেগরও ক্রমশ অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা হয়ে উঠতে থাকে। তার ভগ্নী ও মাতা প্রথম দিকে তার প্রতি সহানুভূতিশীল থাকলেও ধীরে ধীরে গ্রেগরের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচকভাবে পরিবর্তন হতে শুরু করে। 

গ্রেগর সামসা'র পিতা প্রথম জীবনে একটি অর্থনৈতিক ব্যর্থতার পর কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন, এবং বিরাট ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়েন, যখন গ্রেগর তার পিতার ঋণ শোধ করতে না পারে তখন থেকেই তিনি এই রূপান্তরের কথা চিন্তা করেন।

(ফ্রান্স কাফকা ছবি: উইকিপেডিয়া)

গ্রেগর এর অবশিষ্ট মানব বৈশিষ্ট্যগুলো ধীরে ধীরে প্রাণীদের আচরণ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হচ্ছে। তিনি তার নতুন পরিচয় গ্রহণ শুরু করেন এবং মেঝে থেকে দেয়াল এবং ছাদ পর্যন্ত বিচরণ শুরু করেন। যখন তার মা এবং বোন তার ঘর পরিষ্কার করে -তেলাপোকাটি মনে মনে ভাবে তাকে আরো স্বাধীনতা প্রদান করা হউক, একসময় গ্রেগর নিদারুণভাবে দেয়ালে টাঙানো একটি ছবি যা সে ভালোবাসতো তা আঁকড়ে ধরে ঝুলে থাকে। যখন তিনি ছবিটিকে রক্ষা করার জন্য দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকেন, তখন তার মা তার বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করে। গ্রেগরের মা পৃথিবীর আর সকল মায়ের মতোই খুব সহানুভূতিশীল এবং কাছের মানুষ হওয়ায় তাকে বেশ যত্ন করতো। 

গ্রেগরের রূপান্তরের ফলে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেললে তার মা একটা দর্জির দোকানে সেলাইয়ের কাজে যোগ দেয়  

গ্রেগরের ছোট বোন গ্রেটা সামসা, গ্রেগরের রূপান্তরের আগে পর্যন্ত পরিবারে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে নি, কিন্তু গ্রেগরের সাথে তার ভালো সম্পর্ক ছিলো। রূপান্তরের আগে, তার বাবা-মায়ের দ্বারা তাকে একটি আদূরে মেয়ে হিসেবে গণ্য করা হতো এবং এই গল্পের মাধ্যমে সে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে, গ্রেগর এর রূপান্তরের পরে, গ্রেট পরিবারে নিজেকে অপরিহার্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং তিনি দক্ষতার সাথে বাড়ির কাজ মোনোযোগ দিয়ে করতো তাই সে গ্রেগরের চারপাশে কাজগুলি ও করতে শুরু করে এবং তার মা তাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলো। 

যেহেতু গ্রেগর পরিবারের আর কোনো কাজে যোগ দিতে পারতো না, এক পর্যায়ে তারা গ্রেগরকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়ার কথাও ভাবতে থাকে। অন্যদিকে রুপান্তরিত তেলাপোকা, গ্রেগর পরিবারের সকলের কথাবার্তা বুঝতে পারলেও কোনভাবেই সে তাদের সাথে কথা বলতে পারে না এবং খাবার খেতে না পেরে একদিন ক্ষুধায় সে মারা যায়। গ্রেগরের মৃত্যুতে তার পরিবার মোটেও শোকাহত হয় না, বরং তাদের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরে আসে এবং তারা নতুন করে জীবন গড়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠে।

এটি ফ্রান্স কাফকার একটি রুপক বা মেটামর্ফোসিস রচনা, যা দিয়ে কাফকা সমাজকে বোঝাবার চেষ্টা করেছেন যে পরিবারের বা সমাজের অতি আদরের বা জনপ্রিয় মানুষটিরও যখন "রুপান্তর" ঘটে তখন তার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়।

 


  • ১৫২১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

মোনাজ হক

সম্পাদক আজকের বাংলা ডট কম

ফেসবুকে আমরা