গন্ধকাতরতা

মঙ্গলবার, জানুয়ারী ১, ২০১৯ ১২:৩৮ PM | বিভাগ : সাহিত্য


-আমার মেন্টাল প্রবলেমটা শুরু হয় গত ডিসেম্বরে।

-কীভাবে?

-ডিসেম্বরের ষোল তারিখে আমার অফিস ছুটি ছিলো। বাই দ্যা ওয়ে! আগেই বলে নেই, আমি পলিগেমাস ধরনের ছেলে। কমিটমেন্টের ফালতু পেইন আমার সহ্য হয় না। আপনি তো আবার মেয়ে সাইকিয়াট্রিস্ট। সো প্লিজ, ওয়াজ শুরু করবেন না এখন! কারো জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলবেন না-ব্লা ব্লা ব্লা!

-আমি ওয়াজ করবো না। বলেন আপনি!

-ষোলই ডিসেম্বর সকালে তুনতুনিকে পিক করি আমি। তুনতুনির সাথে তখন আমার রিলেশন শোয়াশুয়ি লেভেলের।

-আমি বুঝতে পেরেছি। আপনি বিস্তারিত এক্সপ্লেন না করলেও হবে।

-তো তুনতুনিকে প্রেম প্রেম কথা বলে বাসায় নিয়ে আসি। এরপরে সেক্স শুরু করি। যখন তুনতুনি কাউগার্ল পজিশনে ছিলো, তখন......

-আসলে এতোটা ডিটেইলস বলার দরকার নেই। আপনি সমস্যাটা বলেন, প্লিজ!

-তখন ড্রয়িংরুমে কেউ টিভি ছাড়লো। ফুল সাউন্ডে। আমার রুমমেটদের কেউ হবে। টিভিতে খবর হইতেসিলো। সেইদিন বাংলাদেশের চৌষট্টি জেলায় একসাথে বোমা ফুটানো হয়। মে বি জঙ্গীরা এই আকামটা করে। বা সরকার নিজেই। জানি না আমি! পলিটিকাল ব্যাপার-স্যাপারে আমার হেভি বিরক্তি! আমি একজন পিসফুল মুসলমান। প্রতি শুক্রবার জুম্মার নামাজ পড়ি। রোজা রাখি। জঙ্গীদেরকে পছন্দ করি না। তবে সেকুলার নাস্তিকদের উল্টাপাল্টা কথা শুনলেও রক্ত গরম হয়ে যায়!

-জ্বি, বুঝতে পেরেছি!

-তো তখনও আমি ‘দ্যাশের গুষ্টি কিলাই’ বলে সেক্স করে যাইতেসি। প্রায় এক ঘণ্টা পরে সেক্স শেষে রুম থেকে বের হইলাম। সিগারেট ধরাইলাম। সেই সময় আমার রুমমেট বললো, “ভাই! রুমি তো মইরা গেসে! ওর বান্ধবী ঝুমুর ফোন করসিলো!”

-রুমি কে?

-বলতেসি! আসলে রুমিও আমার গার্লফ্রেন্ড ছিলো। বেকুব টাইপের মেয়ে! আমার রুমমেটের এলাকার মেয়ে। তুনতুনিকে য্যামনে পটায়ে বাসায় নিয়ে আসছি, রুমিকেও পটায়ে বাসায় আনছিলাম। পরে বেশি প্যানপ্যান শুরু করে মেয়েটা। বিয়া করো বলতে বলতে কান-টান পঁচায়ে ফেলতেসিলো। তখন ওরে ডাম্প করি!

-রুমি মারা গেল কীভাবে?

-টি এস সি তে ঘুরতে গেসিলো ওইদিন। তার আবার এইসবের খুব শখ ছিলো। পহেলা ফাল্গুনে হলুদ শাড়ি পরে ঘুরতে যাইতো। পহেলা বৈশাখে লাল-সাদা শাড়ি পরতো। এইগুলা হাবিজাবি শখ আর কি! রুমি সেইদিন বিজয় দিবসের কনসার্টে গেসিলো। টি এস সি তে। ওইখানেও একটা বোমা ফুটায় শুয়োরের বাচ্চারা!

-রুমি কি তখন মারা যায়?

-হুম।

-রুমিকে তো আপনি ভালোবাসতেন না। মেয়েটা মরে যাওয়ার সাথে আপনার মেন্টাল প্রবলেমের রিলেশন কী?

-বলতেসি। রুমি মারা যাওয়ার খবরটা শুনে আমার প্রথম রিএকশ্যান ছিলো, “আহারে! মেয়েটার ফিগার অনেক ভালো ছিলো! সোনাক্ষী সিনহার মতো অনেকটা!” ঐ যে দাবাং-এর নায়িকাটা! চিনছেন আপনি? যাই হোক! সিগারেট শেষ করে, আমি আবার তুনতুনির সাথে খেলাধুলা শুরু করলাম। তখন দেখি তুনতুনির গা থেকে রুমির গন্ধ আসে!

-মানে? সরি, বুঝিয়ে বলুন একটু!

-একেকটা মেয়ের গায়ে একেক ধরনের গন্ধ থাকে। তুনতুনির গা থেকে ওভালটিনের গন্ধ আসে। রুমির গা থেকে সবসময় লেবু পাতার গন্ধ আসতো। রুমির গন্ধ আমি তখন তুনতুনির গা থেকে পাইতেসি। আপনি আমার অবস্থাটা চিন্তা করেন! আমি আর চালায়ে যাইতে পারলাম না। তুনতুনিকে ধাক্কা দিয়ে সরায়ে দিলাম। তুনতুনি তো হা হয়ে গেলো। আমাকে জিগায়, “তোমার কী হইসে, বাবু”? আমার মেজাজ গরম হয়ে গেলো। সিগারেট ধরাইলাম একটা। আবার বিড়ালের মতো গায়ের সাথে আইসা ঘষাঘষি শুরু করলো। 'ধুর, মাগী' বলে এইবার আরো জোরে একটা ধাক্কা দিলাম তুনতুনিকে।

-তারপরে?

-তুনতুনি রাগ দেখায়ে চলে গেলো। তখন থেকেই মাথাটা গেসে আসলে আমার। আমার নতুন নতুন গার্লফ্রেন্ড হয়। পটায়ে বাসায় নিয়ে আসি। কিন্তু তারপরে যেই ফিল্ডে নামি, আমি আর কিছু করতে পারি না। লেবু পাতার গন্ধে আমার মাথা ব্যথা শুরু হয়। সবার গা থেকে সেইম গন্ধ ক্যামনে আসতেসে, আল্লা মালুম! প্রথমে ভাবলাম, জ্বীন-ভূতের আছর হইসে। তাবিজ পরলাম। হুজুর ডেকে বাসায় মিলাদ পড়াইলাম। কোনো রেজাল্ট নাই। এর মধ্যে আবার আমার বাসা থেকে বিয়ের কথা শুরু হইলো। যতোই প্রেম করি, আমার এরেঞ্জড ম্যারেজ করার ডিসিশন ছিলো আগে থেকেই। যেই মেয়েরা বিয়ের আগে প্রেম করে আর বয়ফ্রেন্ডের সাথে সেক্স করে, তাদেরকে কি আর বিয়ে করা যায়? বলেন, আপা? তারা কি ভালো মুসলমান ঘরের মেয়ে, আপনি-ই বলেন? মেয়ে মানুষ আকাম-কুকাম করার চান্স দেয় বলেই না ছেলেরা আকাম-কুকাম করে!

-বুঝতে পেরেছি! আপনি ঘটনাটা বলুন, প্লিজ!

-আমি খুঁজতেসিলাম পিচ্চি মেয়ে। বিয়ের জন্য অল্প বয়সী মেয়েরা ভালো হয়! মুখে মুখে কথা বলে না! নরম-সরম হয়। আর অল্প বয়সী মেয়ে হইলে ভার্জিন হওয়ার চান্স-ও বেশি। আজকালকার মেয়েদের যেই অবস্থা!

-আপনি একটু ব্রিফলি বলেন!

-বলতেসি। এতো তাড়াহুড়া কিসের আপনার? টাকা তো কম নেন নাই! তো যাই হোক! পয়সাওয়ালা লোকের মেয়ে খুঁজতেসিলাম। সব মিলায়ে ভালো পাত্রী পাওয়া খুব টাফ! ফাইন্যালি, এক মেয়েকে পছন্দ হয়। পুরান ঢাকার মেয়ে। কলেজে পড়ে। বাপের টাকা-পয়সাও ভালো। বিয়ে করলাম। লাখ খানেক টাকার ফার্নিচার নিয়ে নতুন বউকে বাসায় আনলাম। পুরান বাসা, মানে যেই বাসায় আমার গার্লফ্রেন্ডদের নিয়ে যাইতাম, ওই বাসা বিয়ের আগেই ছেড়ে দিসিলাম। নতুন বাসায় নতুন করে সংসার শুরু করলাম। কিন্ত কপালের কথা আর কি বলবো, আপা! সেই বালের প্রব্লেমটা বিয়ের পরেও গেলো না! আমার বউয়ের গায়েও দেখি লেবু পাতার গন্ধ! আপনাকে তো আগেই বলছি, লেবু পাতার গন্ধ পাইলে আমার জিনিস-পত্র আর দাঁড়ায় না! কি পেইন, দেখেন তো! বউ প্রথম কয়দিন লজ্জায় কিছু বলে নাই। তারপরে একদিন এমন ঝগড়া করলো! বড়লোকের মেয়ে তো! চ্যাটাং চ্যাটাং কথা জানে ভালোই! আমি অবশ্য বউকে কিছু বলার সাহস পাই নাই। তার বাপের অনেক পাওয়ার। এই মেয়েকে আমার কিছু বলার সাহস নাই। তো ওই মাগী আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিলো! পয়সার তেজ, বুঝেন না! ডিভোর্স তো দিলো-ই! মাগীর এত্ত বড় সাহস! সারা দুনিয়াকে জানায়ে দিলো, আমি নাকি ইম্পোটেন্ট! সাহসটা চিন্তা করেন! আমাকে ইম্পোটেন্ট বলে! আরে! আমি কি নতুন শুইতেসি নাকি? দশটা গার্লফ্রেন্ড চোদা শেষ আমার বিয়ের আগে! আর কতো মেয়েকে যে জায়গামতো টিপে দিসি, তার হিসাব নাই! হা হা হা!

-আপনি এখন আসলে কী চাচ্ছেন?

- আপনি আমার মাথা থেকে গন্ধটা সরায়ে দেন।এই লেবু পাতার গন্ধ মাথা থেকে দূর হয়ে গেলেই আমি আবার সেক্স করতে পারবো!

ততক্ষণে ডক্টর ফারহানা শারমীন মন ঠিক করে ফেলেছেন। এই জানোয়ারের বাচ্চাটাকে কোনোভাবেই সাহায্য করবেন না তিনি। চুলায় যাক প্রফেশনাল এথিক্স!

-আমার মনে হয়, আপনার সমস্যাটা মানসিক না। আপনি চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যান। আমি আপনাকে হেল্প করতে পারছি না।

-আপনি কি তাইলে বাল ফালাইতে চেম্বার খুলছেন? বাল-চ্যাটের সাইকিয়াট্রিস্ট আপনি!

-আপনার অভদ্রতা অনেকক্ষণ সহ্য করেছি। এখন কিন্তু ঘাড় ধরে বের করে দিবো!

কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো লোকটা। তারপরে চুপচাপ চেম্বার থেকে বের হয়ে গেলো। ভিজিটের টাকা ফেরত চেয়ে হইচই করলো না। সাইকিয়াট্রিস্টের চেম্বারের বাইরে ছিলো একটা লেবু গাছ। হঠাৎ লেবু গাছটাকে দেখে ক্ষেপে গেলো সে। পাশেই ভ্যানে ডাব বিক্রি করছিলো ডাবওয়ালা। ডাবের পাশে রাখা দাটা তুলে নিলো এক মিনিটে। তারপরে কোপাতে থাকলো লেবু গাছটাকে। ডাবওয়ালা ভয়ে দুই লাফ দিয়ে পেছনে সরে গেলো। রাস্তার অন্য মানুষজনও যে যেদিকে পারে, দৌড়ানো শুরু করলো। পাগলের বিশ্বাস কি! কখন গাছ ছেড়ে মানুষ কোপানো শুরু করে!

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফেসবুকে ভাইরাল হলো ভিডিও। অনলাইন নিউজ সবার হোম পেজে।

"ঢাকা শহরে নতুন আতঙ্ক: দা হাতে বদ্ধ উন্মাদ" (দেখুন ভিডিও সহ)।

গন্ধকাতর বদ্ধ উন্মাদ তখন হাজতে। জেলখানার কয়েদীদের পেশাব-পায়খানার বোটকা গন্ধ তার নাকে আসে না। বাসী খাবার আর বমির গন্ধেও তার নাক কুঁচকায় না। সে শুধু একটা গন্ধই পায়। লেবু পাতার গন্ধ। সেই গন্ধ আরো কড়া হতে থাকে তার দুনিয়াতে।


  • ৯৫৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফারজানা শারমীন সুরভি

জন্মস্থান ঢাকা, বাংলাদেশ। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্দান ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি করছেন। পেশায় একই বিভাগের গ্র্যাজুয়েট টিচিং এসিস্টেন্ট। লেখক হওয়ার স্বপ্ন নেই, কিন্তু লেখালেখির নেশায় একটা জীবন কাটিয়ে দেয়ার স্বপ্ন দেখেন।

ফেসবুকে আমরা