শীলা চক্রবর্তী

পেশায় আইনজীবী শীলা চক্রবর্তীর জন্ম খুলনায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক আর মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করা শীলার নেশা রবীন্দ্র সঙ্গীত, ধ্রুপদী সঙ্গীত, কবিতা, অভিনয় এবং লেখালেখি। মঞ্চ নাটকেও তিনি নিয়মিত।

মাতৃত্বের ওপর মহান হবার ধারণা ইমপোজ করেছে পিতৃতন্ত্র

মাতৃত্বে পিতৃতন্ত্র‌ই মহান ইমেজ আরোপ করেছে, আবার মাতৃত্বকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার তথা রোজগারের পথে প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবেও প্রতিষ্ঠা দিতে সচেষ্ট হয়েছে। আমাদের সমাজে মাতৃত্ব এক মহান আইডেনটিটি, মাতৃত্ব ছাড়া মেয়েদের জীবন‌ই বৃথা, মাতৃত্বেই নারীর জীবনের সার্থকতা ইত্যাদি গালভরা বুলি শুনেই ছোট থেকে আমরা বড় হ‌ই। অথচ বাস্তব পৃথিবীতে যেই নারী রোজগারের জন‍্য বাইরের পথে পা বাড়ায়, মাতৃত্বকে দাগিয়ে দেয়া হয় রোজগারের পথে প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে। বিশেষত স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এসব জায়গায় সন্তানের মা অপেক্ষা অবিবাহিত তথা "ঝাড়া হাতপা" নারীকে অধিকতর যোগ‍্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ঝাড়া হাতপা শব্দটি খুব অবলীলায় ব‍্যবহার করা হয় যেন সন্তান একটি বোঝা!

একজন মাকে নানা অজুহাতে অযোগ‍্য ঘোষণা করা হয় এমনকী ছাঁটাইও করা হয়। বাচ্চা থাকলে সে অসুস্থ হবে, সেই "অজুহাতে" মা দু’দিন পরপর ছুটি নেবে, পরবর্তীতে গর্ভবতী হলে আবার দীর্ঘ মেটার্নিটি লীভে যাবে ইত্যাদি। উন্নত দেশগুলোতে এই প্রবণতা নেই, বরং সেখানে কর্মরত মায়েদের শিশুর জন‍্য আলাদা ব‍্যবস্থা থাকে কাজের জায়গাগুলোতে, প্রয়োজনে যাতে মা কাজের ফাঁকে ফাঁকে শিশুকে সময় দিতে পারেন বা ব্রেস্টফিড করাতে পারেন।

আমাদের উপমহাদেশে সামান্য কিছু সংগঠিত ক্ষেত্রে এ ব‍্যবস্থা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় ন‍্যূনতমের চেয়েও কম তো বটেই, উল্টে বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত বলেও মনে করা হয় না। বাচ্চার অসুস্থতাজনিত কারণে ছুটি বা মাতৃত্বকালীন ছুটি বিশেষ কারণে দীর্ঘায়িত হলেও নানা অসহযোগ, কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের বিবিধ বক্রোক্তি ইত‍্যাদির সম্মুখীন হওয়া যেন স্বাভাবিক ঘটনা! বাড়িতেও যে চাকুরিরতা মা সবসময় পরিবারের সাহায‍্য পাচ্ছেন এমনটা নয়, কোথাও বা পেলেও পর্যাপ্তভাবে পান না। শহরাঞ্চল বা মফস্বলে কিছু এলাকায় ডে কেয়ার বা ক্রেশের ব‍্যবস্থা থাকলেও অনুন্নত এলাকাগুলোতে এখনও সেভাবে এইগুলো চালু হয়নি। ফলে পরিবারের ওপর বা অর্থের বিনিময়ে রাখা পরিচর্যাকারিণীর ওপর ভরসা রাখতে বাধ‍্য হন কর্মরত মা। এমত অবস্থায়‌ও তার সারাক্ষণ চিন্তায় থাকা অস্বাভাবিক নয়। ফলে কাজের পরিবেশটিও তার পক্ষে বিঘ্নিত হয়। নিজের যত্ন‌ও করা হয় না ঠিকমতো। ভেঙে পড়তে থাকে শরীর। এছাড়া বিভিন্ন সাংসারিক প্রতিবন্ধকতা তো আছেই!

চাকরি করলে সন্তানের যত্ন হবে না থেকে শুরু করে পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ। এগুলো নিয়ে অনেক মায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় কাজ ছেড়ে দিতে। মেনে না নিলে অনেক ক্ষেত্রেই নেমে আসে শারীরিক মানসিক অত‍্যাচারের খাঁড়া। পরিণতিতে অশান্তি হয়, সংসার ভাঙে। আইনের দ্বারস্থ হতে হয় সন্তানের অধিকার পাবার জন‍্যে। আমার কাছে এই সংক্রান্ত বিষয়ে এমন‌ও অনেকে এসেছেন যারা মানসিক অত‍্যাচারের দরুণ এমনভাবে ভেঙে পড়েন যে কাউন্সিলিংয়ে পাঠাতে হয়। জীবনের প্রতি সমস্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে থাকেন তারা। ক্রমাগত সাংসারিক চাপ, পেশাগত চাপ, ঘরে বাইরে অসহযোগিতার চাপ সামলাতে সামলাতে ভেঙে পড়তে থাকেন তারা।

মাতৃত্বের ওপর মহান হবার ধারনা ইমপোজ করেছে পিতৃতন্ত্র। সন্তানকে গর্ভে ধারণ করা, স্তন‍্যপান করানো এবং হরমোনাল কিছু কারণে মায়ের সাথে শিশুর বণ্ডিং বেশি ভালো হয়, মায়ের টান‌ও অনেকটা বেশি হয়। নারী এমনিতেই সন্তানের সাথে বেশি জুড়ে থাকেন, এমনিতেই বড় হবার প্রতিটি ধাপে শিশুর কাছে মায়ের চাহিদাই বেশি থাকে। এর কারণ কিছুটা সামাজিক‌ও হয়। এরপরেও মাতৃত্বের সাথে জুড়ে থাকা কর্তব‍্য, দায়িত্ব, দায়ভার সবকিছুকেই বাড়িয়ে চড়িয়ে ইমপোজ করেছে পিতৃতন্ত্র, এবং তা মায়েদের একতরফা দায় হিসেবেই করেছে। এখন অবশ‍্য খুব কম হলেও কিছু ক্ষেত্রে বাবার পিতৃত্ব ছুটির চল হয়েছে, এটা খুব ভালো লক্ষণ, সন্তান তো বাবার‌ও, মায়ের একার নয়, এটা সবরকমভাবেই বুঝতে হবে।

সমাজের পুরনো নিয়ম অনুযায়ী নাম গোত্র পরিচয় সব বাবার, আর লালনপালনের দায়টা কেবল মায়ের, এই নিয়মে তো আর চলছেও না এখন! মায়েরা নিজেরাও সঙ্গীদের এগুলো বোঝাতে পারেন, সামাজিক বুলিইং এর প্রতিবাদ করা যেমন দরকার, পারিবারিক শোষণের প্রতিবাদ‌ও সমানভাবে হ‌ওয়া দরকার। আমাদের শহরাঞ্চলগুলোর পরিস্থিতি একরকম, অনুন্নত অঞ্চলগুলোতে আরেকরকম। সেখানে বাবা রাত জেগে সন্তানের দেখাশুনো করা বা সন্তানের অসুস্থতায় কাজ কামাই দিয়ে তাকে দেখার কথা ভাবতেই পারে না। বাবা বাড়িতে বাচ্চা দেখছে আর মা কাজে যাচ্ছে এই চিত্র তাদের কাছে এলিয়েন দেখার মতোই অস্বাভাবিক। শিক্ষিত শহুরে সমাজের বাবারা খানিকটা বদলালেও ওইদিকটা বদলেছে কি? ওটাওতো আমাদের সমাজেরই অংশ! পাহাড়ি অঞ্চলে মা সন্তানকে পিঠে বেঁধে নিয়ে কাজে যান, মাথায় করে পাথর ব‌ইছেন, পিঠে শিশু বাঁধা- এমন দৃশ‍্য বিরল কিছু নয়। এর ওপর যদি ঋতুকালীন ডিসমেনোরিয়ার ব‍্যথা যোগ হয় তাহলে তো মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা! আর শরীরের যত্নের কথা না তোলাই ভালো, ওসব ওদের কাছে বিলাসিতা। পিতৃতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র মাতৃত্বকে মহান করতে যতোটা আগ্রহী, অনেক ক্ষেত্রেই এই দায় ভাগ করে নিতে তার এক কণাও আগ্রহী নয়, এই প্রবণতাগুলোই সমাজের সমস‍্যাগুলোকে চিহ্নিত করতে সাহায‍্য করে।

534 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।