তাসনুভা আনান

মানবাধিকারকর্মী, অভিনেত্রী

মায়া আর কায়ার ছায়ায় আমার নারী দিবস

কেমন আছো মা? জানো, আজ নারী দিবস। সবাই হন্যে হয়ে এই দিবসে কেক কাটে, উপহার দেয়; একটা উৎসবের মতো। কিন্তু জানো মা, আজ বার বার তোমার সামনেই মাথাটা নত করতে ইচ্ছে করছে। কেনো? আমার জীবনে একমাত্র তুমিই সে নারী যাকে আমার মনে হয় কখনো দেবী, কখনো পুজারী। তুমি না থাকলে আমার মানুষ হওয়াটা সম্ভব ছিলো না মা।

সেই ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি একজন দায়িত্ব বোধহীন, সহজ সরল পুরুষ মানুষ নিয়ে ঘর করে আমাদের মানুষ করেছো। কতটুকু চাওয়া তোমার জীবনে পূর্ণ হয়েছে মা? হ্যা, আজ এই কথা বলতেই হয় তোমার মায়ের মৃত্যুতেও তুমি নানু বাড়ি যাওনি। অজুহাত ছিলো আমাদের পরীক্ষা।

আমার আজ ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে আদৌ কি সেটা সত্য কথা ছিল? নাকি আমার সাথে ঘটে যাওয়া ছেলেবেলার সেই চরম বাজে ঘটনার জন্য ই.....। কোনোদিনও তোমায় সে কথা বলা বা জিজ্ঞেস করার সাহস হবে কিনা জানি না। 

বিশেষ করে আমায় মানুষ করেছো তুমি। শিখিয়েছো লোভ সংবরন করে কি করে বেঁচে থাকা যায়। স্পষ্টভাষী হতে তুমি শিখিয়েছিলে কিনা জানিনা তবে তোমায় দেখেছি, কখনো ই তোমার আশেপাশে আজকালকার এই "জানেন ভাবী" টাইপের নারীদের দেখা পাইনি। 

ও মা, কেনো শেখালে? এতটা স্পষ্ট ভাষী আমি। মানুষ আমায় ভয় পায়, সমীহ করে, কদরও করে কিন্তু জানো তো, জীবনে ভালোবাসার সাহস খুব কম মানুষেরই আছে। তোমায় বলতে চেয়েছিলাম অনেকবার, শুরুও করেছিলাম কিন্তু তুমি জানো, বোঝো সব কিছু, কিন্তু মানো না। আর কথা বলা হয় না আমাদের। 

জানো এই সমাজে আমাদের নারীদের অবস্থান ঠিক কোথায়? এই নারী দিবস টা আসলেই বোঝা যায়। একদিনের জন্য নারীকে বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হয়। আমার কাছে বিষয়টা খুব ছ্যাচড়া লাগে। বছরের অন্য দিনগুলি কি সেই নারী অথর্ব থাকে?

তবুও মাঝে মাঝে নিজেকে সান্ত্বনা দেই এই ভেবে যে এই রকম একটা দিবস ছিলো বলেই তোমাকে হয়তো কিছুদিনের জন্য হলেও কাছে পেয়েছিলাম। আজ জীবনের এইখানে এসে তোমার আর আমার মাঝে খুব মিল, তুমিও যেরকম অপ্রাপ্তি, বঞ্চনা, আর পুরুষতান্ত্রিককতার মাঝে নিজের জীবনটা সংসার নামের বেড়াজালে ভাসিয়ে দিয়েছো আমার জীবনটাও হরেক রকমের না পাওয়ার মাঝেই অতিবাহিত করেছি।

তবে আমি বলি কি তুমি বুদ্ধিমান, কখনোই নিজের কষ্ট বা ভালোবাসা প্রকাশ করোনি। কিন্তু জানো, জীবনের মস্ত বড় ভুল করে বসে আছি। বার বার করে প্রকাশ করেছি নিজের হাহাকার, নিজের সীমারেখা অতিক্রম করে। ভেবেছি এই মানুষ টা নিরাপদ। কিন্তু জানো? যেখানে প্রকাশ করেছি সেখানটায় আমি অস্তিত্বহীন, শেষ অবধি ব্যক্তিত্তহীন, ছ্যাচড়া হয়ে গেলাম। না আমার নীরবতা বুঝলো, না আমার চিৎকার কেউ শুনতে পেলো।

তবে একটা জায়গায় হয়তো আমি জিতে গেছি। তোমার মত উপেক্ষা সহ্য করে বেঁচে থাকা বেছে নেইনি। আমার এই আমি নারী সব পারি। তবে এই সব ট্রিগার করা স্লোগানে আর মন ভরে না মা। সব লোক দেখানো। আমার জীবনে আলো না আসলে হয়তো আমি বুঝতামই না। দেখো না কতো আলো, এত আলো আমার চোখ ঝলসে যায়। কিন্তু তুমি নামের আলোটাই কোনো দিন আমার জীবনে আসলো না। কেমন কেমন করে বড় হয়ে গেলাম। কোনোদিন ও তোমার পাশে বসা হলো না। তোমার কতো কথা জমা ছিলো একটা কথাও শোনা হলো না। এতো কিছু শেখালে মা, ছ্যচড়া না হতে শিখাতে পারলে না?

ওমা কবে সেই নারি দিবসটা আসবে যেদিন তুমি আর আমি মিলে আমাদের জীবনের অনেক জমে থাকা কথা গুলো বলবো।

কোথায় কোথায় হেরেছি। কে কে কতো অপমান করেছে। এই শরীর নামের কায়াটা কে কে খুবলে খেতে চেয়েছে। কোথায় কোথায় ক্লান্ত হয়েছি। কোন পুরুষের বুকের মধ্যে, বাবার সেই জড়িয়ে ধরার ঘ্রান পেয়েছি। ওমা আসবে তো সেই নারী দিবসটা? প্লিজ ততোদিন বেঁচে থেকো। তোমায় লাল সালাম, তোমায় নারী দিবসের শুভেচ্ছা, একদিনের নয় মা, প্রতিদিনের।

945 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।