এটা পাবলিকের পরিবহন কিন্তু আমি পাবলিকের নই।

বৃহস্পতিবার, জুলাই ৪, ২০১৯ ৪:১১ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


আপনি মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন, হয়তো একজন আপনাকে নোংরা ইঙ্গিত দেবে তবে আপনার শরীর ছোঁয়ার সাহস পাবে না। কিন্ত গণপরিবহন যেনো নারীর শরীর ছোঁয়ার বৈধ লাইসেন্স দিয়েছে যৌন হয়রানিকারীদের, যেনো গণপরিবহনে উঠলেই আপনি তার মোটাদাগে ব্যক্তিগত সম্পত্তি। যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করতে পারবে। কিছু বললেই প্রাইভেট কারে চড়তে পারেন না, গণপরিবহনে উঠলে সহ্য করতে হবে, এমন কথা শুনতে হয়। 

বাংলাদেশে নারীরা কর্মক্ষম হওয়ার কারণে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দিয়েছে তেমনি অপর দিকে বাধা গ্রস্থ হয়েছে তার চলার পথ। রাজধানী ঢাকার কর্মক্ষম মানুষের প্রায় অর্ধেক অংশ জুড়েই নারীর অংশগ্রহণে এসে দাঁড়িয়েছে। তাই পুরুষের পাশাপাশি তাদের ছুটতে হচ্ছে কর্মস্থলে। পুরুষে পাশাপাশি তারাও চলছে গনপরিবহনে। শুধু কর্মজীবি নারী না, স্কুল কলেজের ছাত্রী, গৃহিনীসহ নারীরা গণপরিবহনে কতোটা নিরাপদ তা বহুকাল থেকে প্রশ্নের মুখোমুখি।

বিন্দু নারী উন্নয়ন সংগঠন একটি জরিপে দেখাচ্ছে প্রতি ১০০ জন নারীর মাঝে ৯০ জন নারীই গণপরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার হন প্রতিদিন। এদের মধ্যে বেশিরভাগ মাঝ বয়সী থেকে তার বেশি বয়সী পুরুষ এই হয়রানি মূলক কাজের সাথে জড়িত। যৌন হয়রানির গুলোর ধরণ ইচ্ছাকৃত স্পর্শ করা, চিমটিকাটা, গাঁ ঘেঁষে দাঁড়ানো, আস্তে আস্তে ধাক্কা দেওয়া, স্পর্শকাতর জয়গায় স্পর্শ করা, শরীরে লিঙ্গ ছোঁয়ানো, কাঁধে হাত দেওয়া এমনকি লিঙ্গ রেব করে দেখানো।

মূলত গনপরিবহনে চলাচলকারী নারীরা জীবনে বহুবার যৌন হয়রানীর শিকার হয়েছেন। প্রতিবাদ করতে গেলে এই সকল পুরুষরা দলবদ্ধভাবে নারীকে উল্টো শাসায় এবং আশপাশের মানুষ নীরব ভূমিকা পালন করে। আবার কেউ বাঁচতে হয়রানিকারীর থেকে দুরে সরার চেষ্টা করে। পুরুষের কাছে গণপরিবহনে যৌন হয়রানী হয় কিনা এই প্রশ্নে বেসরকারী সংস্থাটার আরেকটি জরিপে বলছে ১০০ জনে ৬০ জন পুরুষ বলেন হয়। বাকীরা এটিকে তাচ্ছিল্য, অযৌক্তিক, নারীদের প্রতি কটু মন্তব্য, তাদের পোষাক এই সকল বিষয়কে সামনে এনে ধরেন। এমনকি জরিপকারী নারীদের হেনস্তাও করে কোনো কোনো পুরুষ। যা পুরুষতন্ত্রের একটি ঢাল হিসেবে পুরুষ ব্যবহার করে আসছে।  যাতে বোঝা যায় কোন না কোনভাবে এরা এই কাজের সাথে সম্পৃক্ত।

এবার আসি হেলপার আর কন্ডাকটারের সরাসরি যৌন হয়রানি কথায়। গণপরিবহনে উঠতে গেলে হাত ধরে তোলা, হাতের নিচ দিয়ে যতটা সম্ভব স্পর্শকাতর জায়গা ছোঁয়া, সরাসরি পিঠে হাত দিয়ে চিমটি কাটা এসব প্রতিনিয়ত খুব দৃশ্যমান একটি বিষয়। একজন নারী তার জীবনে বহু বহু বার এ ধরণের যৌন হয়রানির শিকার হন। এত মারাত্মক বিষয় কেনো বন্ধ হয় না? তার কারণ অধিক মুনাফার লোভে অতিরুক্ত যাত্রী তোলা, সিসি টিভি ফুটেজ না থাকা, টিকিট না কাটা, মানুষের নীরব ভূমিকাই এই সমস্যা বয়ে নিয়ে চলেছে বহুদিন ধরে। যে সমাজে মানুষের পুরুষতন্ত্রের বীজ মাথায় প্রতিদিন বহন করে সেখানে এগুলো যেনো মামুলি ব্যপার। এত সংখ্যক নারী বাসে ওঠার পরও মহিলা সিটের সংখ্যা আনুপাতিক হরে কম। নারী এবং প্রতিবন্ধী মিলে নয়টি সিট আবার কোনো কোনো বাসে ছয়টি। তাও ইঞ্জিনকাভারের সাথে থাকে যেখানে বসা অত্যান্ত কষ্টকর। শুধু তাই না, এই সিটগুলোও অধিকাংশ সময় পুরুষের দখলে থাকে। এ ক্ষেত্রে বাস চালক বা কন্টাক্টররা নীরব ভূমিকা পালন করে।

২০১৮ সালে দোলনচাঁপা নামে শুধু নারীদের জন্য বাস সার্ভিসটি চালু হয়। যাতে মোট যাত্রী সিট ৩৪টি এবং নগর সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ এটি কে ৩০টি পর্যন্ত রাখতে চায়। এর বেশি করবে না। যদি এই হিসেব করি তবে প্রতিদিন ১০২০ জন নারী নিরাপদ চলাচল করতে পারবে। তা এই শহরের মোট কর্মক্ষম নারীদের তুলনায় একেবারে নগণ্য। দোলনচাঁপার বর্তমানে কয়েকটি বাস চলে। এক বছরেও পূরণ হয়নি সেই ত্রিশের কোটা। এই সবগুলো বললাম ঢাকা শহরের গল্প। গ্রাম বা জেলা শহরে এই নারী ও প্রতিবন্ধী সিট অলীক স্বপ্ন। সেখানে যৌন হয়রানি এক ভয়াবহ জাল বিস্তার করে আছে।

২০১৭ সালে গনপরিবহণে নারী, শিশু,প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের জন্য সংরক্ষিত আসনে অন্য কোনো যাত্রী বসলে এক মাসের কারাদন্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান থাকলেও আজ অব্দি তার কার্যক্রম দেখা যায়নি সারা দেশের কোথাও। কোনো প্রতিরোধ না থাকায় বাসে যৌন হয়রানিকে স্বাভাবিক বলেই মেনে নিতে শুরু করেছে নারীরা।

কখনো সমাজ প্রস্তুত থাকে না, তাকে প্রস্তুত করে নিতে হয়, করতে হয় যুদ্ধ সংগ্রাম। নারীর সংগ্রাম এক দিনের নয়, হাজার বছরের। আসুন স্লোগানে মেতে উঠি। গণপরিবহণে যৌন হয়রানী বন্ধ করি।

১। গণপরিবহনে যৌন হয়রানী বন্ধ করুন।
২। থামুন, আমাকে স্পর্শ করবেন না।
৩। আমার শরীর আপনার বিনোদনের জন্য নয়।
৪। এটা পাবলিকের পরিবহণ, কিন্তু আমি পাবলিকের নই।
৫। গণপরিবহণে যৌন হয়রানি আমাদের দেশ ও শহরকে কলুষিত করে।
৬। যদি গণপরিবহণে যৌন হয়রানি দেখো, চিৎকার করো।


  • ৩১৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

জান্নাতুল মাওয়া

এক্সেকিউটিভ ডিরেকট, বিন্দু BINDU(Best Initiative National Development Unification)

ফেসবুকে আমরা