যেখানে বৈবাহিক সম্পর্ক চ্ছিন্ন করার সুযোগ আছে, তাহলে পরকীয়াই কেনো?

শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৮ ৪:১৬ PM | বিভাগ : আলোচিত


ভারতে এখন আর পরকীয়া অপরাধ না এই মর্মে ভারতের সুপ্রীম কোর্ট রায় দিয়েছেন। হায় পরকীয়া! দোষঘাট হলেও চলছিলোই তো দিব্যি লুকিয়ে চুরিয়ে গোপনে অথবা কেয়ারলেসলি কেয়ারফুলি এটিট্যুড নিয়ে। এইবার একেবারে প্রকাশ্যে খেলারাম খেলে যা দশা!

উহু, বাংলাদেশীদের আনন্দিত হবার কিছু নাই। এখনো বাংলাদেশে ওটি নির্দোষ যে -সেই ঘোষণা আসে নি অথবা বাংলাদেশের আইনে নেইই এমন কিছু।

ভারতের ওই আইনটি ছিলো ১৫৮ বছর আগের, ঔপনিবেশিক আমলের। আইনে বলা ছিলো, কোনো পুরুষ কোনো বিবাহিত নারীর সাথে তার স্বামীর অনুমতি ছাড়া যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তা আইনত অপরাধ।

এই আইনের বিরোধিতা করে মামলা করেন এক ভারতীয় ইতালীয় অভিবাসী নাগরিক। তিনি চেয়েছিলেন এই আইন বিলুপ্ত হোক কারণ এটি শুধু পরকীয়ায় পুরুষের দোষ দেখতে পাচ্ছে, নারীর নয়।

এই মামলায় ভারতীয় শীর্ষ আদালত এই মর্মে আলোচনা পর্যালোচনা করতে করতে অবশেষে ঘোষণা দিয়েছেন পরকীয়ার কোনো অপরাধ নেই। কেঁচো খুড়তে গিয়ে সাপ বেরোনো বোধহয় একেই বলে!

আর এই সাপ দেখে বাংলাদেশী ফেসবুকাররা আনন্দে উদ্বেলিত হিলহিলায়িত। আহ্, পরকীয়ার বৈধতার খবরে আকাশে বাতাসে আজি কী আনন্দ! যদিও বাংলাদেশে লুকিয়েই করতে হবে এই কাজ তবুও নিতান্তই মানুষ বলে মনের গোপন কোনে এতটুকু আশা কী জাগে না?

আসলে যিনি মামলা করেছিলেন তিনি শুধু দোষটি কেনো শুধু পুরুষের হবে নারীর কেনো নয় এই মর্মে করলেও এতে যা বেরিয়ে এসেছে তা হলো আইনটি আসলে নারীর অধিকারকেই ক্ষুণ্ণ করেছে। তার ব্যাক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী এই আইনে এই বিষয়টি বেশী গুরুত্ব পেয়েছে।

স্ত্রী যে নারীর সম্পত্তি নয় বা স্বামী কখনো কোনো বিষয়েই স্ত্রীর উপর জোর খাটাতে পারেন না সেটি বিচারে প্রাধান্য পেলেও শেষাবধি পরকীয়া অপরাধ নয় এই রায়ের ফলে পরকীয়ায় আগ্রহী ও অতি স্বাধীনতাকামী জনগণ বেশ আনন্দিত হয়ে পড়েছেন উল্লেখিত বিষয়ে নজর না দিয়েই। ফলাফল 'পরকীয়া বৈধ' -এমন রব।

তাদের জন্য আরেকটি খবর হলো ভারতীয় বিচারকরা বলেছেন, পরকীয়ার ফলে যদি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে এবং আদালতে যদি উপযুক্ত প্রমাণ হাজির করা হয় তবেই পরকীয়া আত্মহত্যা অপরাধের প্ররোচনা হিসেবে গন্য হবে। বিচারকরা এও বলেছেন, পরকীয়া বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হতে পারে কিন্তু অপরাধ হিসেবে গন্য হতে পারে না।

এইটুকু শুনে আনন্দিত হয়ে আমাদের দেশের পরকীয়াপ্রেমী বা অবাধ স্বাধীনতার আনন্দে মুক্তকচ্ছ মানবমানবীর পাশাপাশি পরকীয়া বিরোধীরাও মিনমিন করে কিছু বলছেন যদিও তা যৎসামান্য।

পরকীয়া নাকি উপকারী। পরকীয়া স্বাস্থ্যকর এমনও লেখা দেখলাম। বটে!

যে নারী স্বামীর পরকীয়া মানতে না পেরে দুই সন্তানসহ আত্মহত্যা করে তার জন্য পরকীয়া কেমন উপকারী জানি না। যে মা পরকীয়ায় জড়িত হয়ে নিজ সন্তানকে খুন করে তার কাছে পরকীয়া কতটুকু স্বাস্থকর বুঝি নাই।

যে পিতা পরকীয়ায় জড়িত স্ত্রীকে শাস্তি দেবার জন্য সন্তানদের খুন করে লুকিয়ে রাখে সেই পিতার কাছে পরকীয়ার মানে বিচারকরা জিজ্ঞেস করবেন না কোনোদিন।

পরকীয়ার আনন্দের বিপরীতে কিছু মানুষের হৃদয়ের বেদনা, অপমানের যন্ত্রণা, ধুঁকে ধুঁকে প্রতিনিয়ত মরে মরে বেঁচে থাকার কাহিনী কোনোদিন পাত্তা পাবে না ভাবলেই পরকীয়ার প্রতি বিবমিষা জাগে। সেই পরকীয়া আনন্দের আর নির্দোষ হয় কী করে?
আমি জানি না।

শাহানা বাজপেয়ীর কণ্ঠে সুন্দর কিছু গান আছে। তার মধ্যে ওই গানটা খুব ভালো লাগে, 'আমার হাত বান্ধিবি পা বান্ধিবি মন বান্ধিবি কেমনে'।

আসলেই তাই। গভীর প্রেমে পড়লে তো এই দশাই হয়। মন তো বাধা যায় না। মন যে কে কখন কার প্রেমে বাধা পড়বে কে বলতে পারে!

যার প্রেমে পড়ে আর উঠতেই পারে না নরনারী, সে কার স্বামী কার স্ত্রী? কারই বা পিতা মাতা, কেমন অবলম্বন তাতে কী আসে যায় -এই তো পরকীয়া!

আর এমন অবস্থা হলে দু’টি সম্পর্ক বজায় না রেখে যেকোনো একটিতে নিজেকে বেধে ফেলাই উত্তম। তাতে অন্তত মানুষের বিবেক বলে যে জিনিসটি আছে তার কাছে পরিষ্কার থাকা যায়। বড় কোনো অপরাধ সংঘটনের সম্ভাবনাও কমে যায়।

আর হ্যাঁ পরকীয়ার দোষে অবশ্যই দু’টি নরনারীরই সমান দুষ্ট। যারা এই প্রেমের সম্পর্কে আবদ্ধ হন তাদের একজন প্রতারক হলে অপরজনও ফেরেশতা কিছুতেই নয়। তিনিও সমান প্রতারকই।

নারী যদি ডিভোর্সী অথবা স্বামী পরিত্যাক্তা অথবা স্বামী কর্তৃক শারীরিক মানসিকভাবে নিগৃহীত বা যৌন জীবনে অতৃপ্তও হন তবুও কিছুতেই তিনি বৈধতা পেয়ে যান না আরেকটি বৈবাহিক সম্পর্কে লিপ্ত পুরুষের সাথে পরকীয়া চালানোর জন্য। এবং পুরুষের বেলাতেও একই কথা। 
পরকীয়া আজকাল অবশ্য টাইম পাস বা নিছক নির্দোষ আনন্দও কারো কারো কাছে। অথবা অসুখী যৌনজীবনকে একটু গোপনে সুযোগ দেয়া।
কোনোটাই তো মনুষ্য সমাজে স্বাস্থ্যকর হতে পারে না। যে কোনো অভিযোগেই আজকাল সম্পর্ক চ্ছিন্ন করার সুযোগ আছে। তাহলে পরকীয়াই কেনো?

আর এইসব সম্পর্কের মাঝে যদি সন্তান থাকে তবে পরকীয়া সত্যিই ভয়াবহ আকার ধারণ করে। 
সময় পাল্টাচ্ছে। মূল্যবোধ সংস্কার সামাজিকতা সবই হয়তো সময়েরই প্রয়োজনে পাল্টাবে ধীরে ধীরে। মানুষ শুধু নিজস্বার্থ বিবেচনায় এনে যা মন চায় তাই করতে পারবে এমনটা না হলেই হয়তো ভালো হবে। এবং মানুষ বলেই মনুষ্যত্বের জায়গাটুকু খুব সাবধানে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে।
আইন করে তার আর কতটুকু কী করা যাবে!


  • ২৫৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সালমা লুনা

ফিজিক্স আর পলিটিক্যাল সাইন্সে মাস্টার্স করেছেন। লেখালিখি করেন শখে। দায়বদ্ধতা অনুভব করেন নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলায়। হোপ সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন নামে একটি এনজিওর প্রেসিডেন্ট তিনি।

ফেসবুকে আমরা