জীবনে অন্তত পাখি হওয়ার ইচ্ছেটা পূরণ হোক

শুক্রবার, ডিসেম্বর ৭, ২০১৮ ১:১৯ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


সুটকেস হাতে কলেজের হোস্টেল থেকে পালিয়ে সোজা মেজদির স্কুলে। আমায় দেখে মেজদি তো অবাক! আরে একি কান্ড। আবার কলেজ হোস্টেলে বুঝিয়ে সুঝিয়ে দিয়ে আসা।

তারপর আর কি করি! দিলাম হোস্টেলে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে। আর তখন আমি জেদ করছি আমি আর কলেজে পড়তে চাই না। পড়লেও বাড়িতে থেকে। চট্টগ্রামে যেসব ভাই বোনেরা থাকে সবার কঠিন কঠিন আর শক্ত শক্ত মুখ। তারা আমাকে শুধু হোস্টেলে থাকতে বলে, পড়ালেখা করতে বলে। নিজেরা নিজেদের আনন্দে থাকে।

আমার কোনো বেড়ানো ছিলো না হোস্টেল আর ছুটির সময় বোনদের বাড়ি ছাড়া। এমনকি বিজয়মেলাতেও না। আর আমার যে কোনো একটা অসুবিধা হয়েছে সেটা বোঝার বা শোনার মতো সময় তাদের কারো নেই৷ খালি আমার সব দোষ। আমাকে বাড়ি থেকে এনে কলেজে ভর্তি করা হয়েছিলো বাড়ির কাছের বখাটে ছেলেদের উৎপাতের কারণে। তার মধ্যে স্কুলের কাছের একজনের সাথে আমার আবার একটু প্রেম প্রেম ভাব হয়েছিলো। মানে ক্লাস টেনে পড়ার সময় ১/২ দিন একটু কথা হয়েছিলো আর কি "এটুকই! সেসব থেকে আমাকে বাঁচাতে এবং সরাতে চট্টগ্রামে নিক্ষিপ্ত হলাম আমি।

কিন্তু আসল ঘটনা ভিন্ন। আসলে সে সময় আমি ছিলাম বিধ্বস্ত, সন্ত্রস্ত। আমি আমার খুব কাছের একজনের দ্বারা যৌন হয়রানীর শিকার হয়েছিলাম এবং হচ্ছিলাম। ঠিক সেসময় সেকথাটা কাউকে বলতে পারি নি আমি। ভয় পেয়েছি খুব, কষ্ট পেয়েছি খুব৷ কত রাত কেঁদে কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছি! আমি ছিলাম আমার বাবা মায়ের আহ্লাদি ছানা। তারপরও আমি তাদের কিছু বলতে পারি নি। এ ঘটনাই যে আমার জীবনের কত সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিলো এটা কাউকে বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়।

আমি সবকিছুতেই কনফিউজড হয়ে গেলাম। এমন কি সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও। এসব ক্ষেত্রে আমার ঘরে আমার অনেক বদনাম। কিন্তু এমন একজন কেউ ছিলো না যে আমার মতো করে আমার দু;খটা বুঝবে। তাহলে হয়তো জীবনটাই অন্যরকম হতো সেই ছোট্ট মেয়েটার। তো কলেজে হোস্টেলে জোর করে রাখছে তাই তিনদিন খাওয়া বন্ধ করে দিলাম।

হোস্টেল থেকে পারিবারিক অভিভাবককে ডাকা হলো। হোস্টেলের সুপার ছিলেন কলেজের সোশ্যাওলজির প্রভাষক, তিনি আবার আমার মেজদির ননদ। তিনিও অনেক চেষ্টা করলেন কিন্ত আমার রাগ ভাঙলো না৷ আরে আমার সমস্যাটাতো অন্য জায়গায়৷

যাই হোক আবার কিছুদিনের জন্য বাড়ি আবার হোস্টেল। এর মধ্যে কলেজের সংসদ নির্বাচন৷ দাঁড়িয়ে গেলাম জিএস পদে৷ রেকর্ড সংখ্যক ভোট পেয়ে জিএস নির্বাচিত হলাম৷ ভিপি অনার্সের আপু নিগার সুলতানা৷ এজিএসের নাম ভুলে গেছি। দৈনিক পূর্বকোণ, দৈনিক আজাদীতে আমাদের ছবি এসেছিলো। এ খবরে আমার বড় ভাই ভীষণ ক্ষেপে গেলেন। তিনি আসলেন কলেজের সামনে। মোটর সাইকেলে বসেই কথা বললেন, আসলে ধমকালেন। হুমকি দিলেন বাবাকে জানাবেন, বলবেন আমাকে কলেজ থেকে পাঠিয়ে দিবেন। আমি সেকথায় ভীষণ ভয় পেলাম। মনে হলো এটা শুনলে বাবা মরে যাবে। বাবার স্ট্রোক হতে পারে। আমি কাঁদছি আর কবুতরের বাচ্চার মতো কাঁপছি। মোটর সাইকেলের মধ্যেই ভাইয়ার পা ধরে বসে ছিলাম যেন বাবাকে কিছু না জানায়। সেদিনের ঘটনা মনে পড়লে আমি আজও এরকম কবুতরের বাচ্চার মতো কাঁপি। ভাইয়া রাজি হলো কিন্তু আমাকে শর্ত দেয়া হলো আমাকে জিএস পদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে। আমি কথা দিলাম।

কাঁদতে কাঁদতে প্রিন্সিপাল ম্যাডামের রুমে গিয়ে সব জানালাম। তিনি বললেন আমাদের কলেজের সংসদ পদ থেকে পদত্যাগের কোনো ইতিহাস নেই। তুমি থাকো। তোমায় কোনো কাজ করতে বাইরে যেতে হবে না। জানালাম ভাইয়াকে। সবাই মেনে নিলো। কিন্তু আমি আরো আরো বিধ্বস্ত থেকে বিধ্বস্ত হয়ে গেলাম। কলেজের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় আগের বছর আবৃত্তি, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতায় অংশ নিয়েছিলাম। কোনটাতে প্রথম, কোনটাতে ২য় হয়েছিলাম। আগের বছর বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় ২য় হয়েছিলাম৷ এবার সবকিছু থেকে গুটিয়ে নিলাম নিজেকে৷ একা একা কাঁদি। কলেজ হোস্টেলের ছাদে বসে থাকি একা একা। কলেজের স্যারদের কাছে পড়তে যাই কিন্তু হোস্টেলে ফিরে পড়ি না। প্রচন্ড কষ্ট। রাগ, ক্ষোভ, অভিমান। আবার অদ্ভূত ব্যাপার হলো এসবের সাথে থাকে পবিবারের প্রতি তীব্র ভালোবাসা। এখনো একই রকম! এত লাথি খাই তারপরও! স্কুলে ভালো ছাত্রী হিসেবে সুনাম ছিলো। কলেজের প্রি টেস্টে খারাপ করলাম।

এবার পরিবারিক অভিভাবক চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটির পড়ুয়া বোনকে ডাকা হলো। আমাদের পদার্থ বিজ্ঞানের অসিত স্যার ছিলেন খুব ভালো একজন মানুষ। তিনি আমার বোনকে বললেন, "ও তো ভালো কিন্তু কেনো এমন হচ্ছে দেখা উচিত "। আমার বোন আমাকে অনেক কিছু বলে চলে গেলো। আমি একা। আমি আস্তে আস্তে হোস্টেলের ছাদে গেলাম। আমার ভিতরের মন আমায় বলছে, তোর মরে যাওয়া উচিত। আর সেই হ্যারাসমেন্টের ঘটনা আমায় বলে যাচ্ছিলো তোর পাপ হয়েছে, তোর পাপ হয়েছে, তুই মর, তুই মর। আর সেই ১৬/১৭ বছরের বাচ্চা মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে কষ্ট ভাগ করে নেয়ার কেউ তো ছিলোই না। বরং সবাই ওর দোষের কথাই সবাই বলে গেছে সবসময়। সে কালো, সে অভিমানী, সে ফ্যান্টাসি চিন্তা করে, সে ইমোশনাল, সে কাঁদে -সব তার দোষ। সব দোষ মাথায় নিয়ে মেয়েটি হোস্টেলের ছাদ থেকে পাখি না হয়েও পাখি হয়েই উড়তে চাইলো। মনে হলো তার জীবনে অন্তত পাখি হওয়ার ইচ্ছেটা পূরণ হোক। মেয়েটি শূণ্যে ঝাপ দিলো! কেনো দিলো, কি কারণে দিয়েছিলো সেগুলো নিয়ে আকাশে বাতাসে অনেক কানাকানি হয়েছিলো সেদিন! মেয়েটি কিন্তু তারপরও বেঁচে গিয়েছিল! অরিত্রি নাই হয়ে গেলো!


  • ৩৩১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

মিনার্ভা সেঁজুতি

লেখক ও আবৃত্তিকার

ফেসবুকে আমরা