যৌন প্রস্তাব তাকেই দিতে পারেন যে আপনার বিষয়ে আগ্রহী

বৃহস্পতিবার, মার্চ ২২, ২০১৮ ৭:৫৫ PM | বিভাগ : আলোচিত


বন্ধুতালিকার কয়েকজনার স্ট্যাটাস দেখলাম। গাজি রাকায়েত নামক নাট্যকর্মীর ইনবক্সে মেয়েদের যৌনাঙ্গ দেখতে চাওয়া কর্মকাণ্ডের পক্ষে দাঁড়িয়ে অনেকে এরকম লিখছেন। উনারা যা বলতে চাচ্ছেন, কথাগুলো সামারাইজ করলে এরকম হয় যে, কেউ কাউকে যৌন প্রস্তাব দিতেই পারে। কেউ কাউকে প্রেম ভালোবাসার প্রস্তাব দেবে, এটাই স্বাভাবিক।

মানুষ মানুষকে যৌন প্রস্তাব দেবে সেটাই স্বাভাবিক। কারো তা পছন্দ না হলে সে রিফিউজ করবে, বা এরকম ঘটনা ফেইসবুকের ইনবক্সে হলে ব্লক করে দেবে। কেচ্ছা খতম। এই নিয়ে বাড়াবাড়ির কী আছে?

কথাগুলো যারা লিখছেন, উনারা কমবেশি সকলেই পশ্চিমা বিশ্বের উদাহরণ টানছেন, বলে বেড়াচ্ছেন, ইউরোপ আমেরিকায় নাকি এরকম ডেইলি হয়। কেউ কিছু মনে করে না! আমি ইউরোপের একটা দেশে থাকি। আমেরিকা ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশ কয়েকটা দেশ ঘুরে দেখেছি। জার্মানিতে বেশ ভালো একটা অফিসে চাকরি করি। ডেইলি প্রায় ৩০ টি দেশের মানুষের সাথে আমার দেখাসাক্ষাৎ হয়। কিন্তু এরকম ঘটনা খুব একটা শুনি নি। বোঝা যাচ্ছে, যারা বাংলাদেশে থাকেন, বিশেষ করে মফস্বল থেকে ঢাকা এসেছেন, উনারা আমার চাইতে ইউরোপ আমেরিকা সম্পর্কে অনেক বেশি জানেন এবং বোঝেন। বিশেষ করে যারা এলাকার টঙ এর দোকানে আড্ডা দেন। ইউরোপ আমেরিকা সম্পর্কে উনাদের কাছ থেকে মাঝে মাঝে কিছু জ্ঞান নেয়ার খুব ইচ্ছে হয়।

ধরা যাক, বিলকিস নামক মেয়েটি একটা এলাকায় থাকে। একদিন বাবামাকে সাথে নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছে। আপনি একজন সক্ষম পুরুষ, একদম আসল পুরুষ যাকে বলে। বিলকিসকে দেখে আপনার যৌন কামনা জাগ্রত হলো। আপনি সরাসরি বিলকিসের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, বিলকিসের স্তন আপনি ধরে দেখতে চান। আপনার কী ধারণা, বিলকিসের উচিত, আপনাকে ভদ্র উপায়ে রিফিউজ করা?

বা ধরুন, আকলিমা কলেজে যায়। আপনি মেয়েদের কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েদের আসাযাওয়া দেখেন। এখন আপনি যেহেতু আসল পুরুষ, সেহেতু আপনার আকলিমাকে বিছানায় নিতে ইচ্ছে হলো। আপনি আকলিমাকে গিয়ে নিতান্তই ভদ্রলোকের মতো মুখ করে বললেন, আকলিমার যৌনাঙ্গ আপনি দেখতে ইচ্ছুক। আপনার কী ধারণা, এটি যৌন নির্যাতন নয়? এটি স্রেফ যৌন প্রস্তাব? সে রাজি না হলে আপনাকে ভদ্রভাবে রিফিউজ করে দিলেই কেচ্ছা খতম? আপনাকে সেইখানেই কষে চড় মারলে সেটা অভদ্র আচরণ? বাহ, আপনাদের যুক্তিবোধের তুলনা নেই।

বা ধরুন, আপনি বাসে চড়েছেন। একমেয়েকে দেখে আপনি উত্তেজনা অনুভব করলেন। উত্তেজনা বশত, আপনার লুঙ্গিটা খুলে আপনার যন্ত্রপাতি মেয়েটিকে দেখিয়ে মেয়েটিকে উত্তেজিত করতে চেষ্টা করলেন। তো, মেয়েটার উচিত, ভদ্রভাবে আপনাকে রিফিউজ করে ব্যাপারটি ভুলে যাওয়া?

ওহ, আপনার যুক্তি হচ্ছে, আপনি তো কাউকে জোর করেন নি! শুধু প্রস্তাব দিয়েন মাত্র? সিরিয়াসলি? দারুণ যুক্তি তো!

ইউরোপে আপনি ঘুরতে আসলে, প্রায়ই দেখবেন, বাসে ট্রেনে সুন্দরী মেয়েদের দেখলে, বা হ্যান্ডসাম ছেলেদের ছেলে মেয়ে উভয়ই খুব সুন্দরভাবে কমপ্লিমেন্ট দেয়। তারা ভদ্রভাবেই বলে, তোমাকে খুব সেক্সি লাগছে, বা সুন্দর লাগছে। তুমি কী আমার সাথে ডেইটে যাবে? অন্য মানুষটি অনিচ্ছুক হলে হেসে খুব ভদ্রভাবেই বলবে, না, সে ইচ্ছুক নয়। আর রাজি হলে তো কথাই নেই। খুব ভালো ব্যাপার। দুইজনকে দুইজনকে যত ইচ্ছা দেখুন এবং দেখান। কেচ্ছা এখানেই খতম।

শুধুমাত্র রেড লাইট জোন, এবং যেই এলাকায় ডিস্কগুলো থাকে, গে বার, লেসবিয়ান বার, ডিস্ক বার, ড্যান্স ক্লাব, ইত্যাদি জায়গায় আপনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে মেয়েদের কোনো ভালবাসার কথা ছাড়া, বা ডেইটে নিমন্ত্রণ ছাড়া সরাসরি যৌন প্রস্তাব দিতে পারেন। এরকম জায়গায় কেউ এসবে কিছু মনে করে না। তবে, আপনি কাউকে স্পর্শ করতে পারবেন না। দূর থেকে যৌন প্রস্তাব দিতে পারেন, অন্যজন রাজি না হলে আপনার সরে যেতে হবে। তাকে এই নিয়ে চাপাচাপিও করা যাবে না। করলে জেলের ভাত খেতে হবে।

কিন্তু আমাদের দেশের ফেইসবুকে লেখালেখি করা ইউরোপ আমেরিকা বিষয়ক বিশিষ্ট পণ্ডিতগণ, যাদের বেশিরভাগই মনে করেন ফ্রি সেক্স মানে মাগনা মাগনা সেক্স, ইউরোপ আমেরিকার মেয়েরা প্যান্ট খুলে তাদের জন্য এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করছে, ইউরোপে এসে নেমেই প্রথমে তারা যা জিজ্ঞেস করেন, ফ্রি সেক্স কই পামু? তারা বললেন ইউরোপ আমেরিকায় নাকি যে কেউ যে কাউকে সরাসরি যৌন প্রস্তাব দিতে পারে। বিষয়টি আমার জানা ছিলো না। এইসব দেশে বাসে ট্রেনে বা ফেইসবুকে সোশ্যাল মিডিয়ায় মেসেজে অনিচ্ছুক কাউকে এরকম প্রস্তাব কেউ দিলে সেটাকে যৌন নির্যাতন হিসেবেই ধরা হয়।

তো? আমি কী বোঝাতে চাইলাম? প্রস্তাব না দিলে মানুষজন সেক্স কীভাবে করবে? সেক্স করা খারাপ? যৌন প্রস্তাব দেয়া খারাপ?

যৌন প্রস্তাব দেয়া ততক্ষণই ভালো, যতক্ষণ যাকে দিচ্ছেন সে আগ্রহী। বা আপনাদের মধ্যে সেরকম অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে। আপনি যদি মনে করেন, সে আগ্রহী নয়, আপনি তাকে যৌন প্রস্তাব দিতে পারেন না। আকারে ইঙ্গিতে কোনোভাবেই নয়।

তবে এই বিষয়টিও খেয়াল রাখতে হবে, বাংলাদেশের একটি বড় অংশ নারী, সে যতই প্রগতিশীল হোক না কেনো, আশা করে, ছেলেটিই তাকে ভালোবাসার কথা বলবে, যৌন প্রস্তাব দিবে, খানিকটা চাপাচাপি করবে, এরপরে মেয়েটি রাজি হবে। অনেক মেয়েই বিষয়গুলো এনজয় করে। এবং তারা যে এক একজন সতী সাবিত্রী মহীয়সী নারী, তা প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টাও চালায়। যেন তাদের কোনো অনুভূতি নেই। তাদের কোনো যৌনতা নেই।

একজন পুরুষ তাকে নেবে, আর সে দেবে, তাদের ভাবগতিক অনেক সময়ই এরকম। আগ বাড়িয়ে মেয়েটিই প্রেমিককে যৌন প্রস্তাব দিচ্ছে, এরকম ঘটনা ঘটে বটে, তবে বিরল। এরকম প্রস্তাব দেয়ার আরেক বিপদ হচ্ছে, প্রেমিকটি মেয়েটিকে আর ভালো মেয়ে ভাবে না। যেন ছেলেটির যৌন প্রস্তাব দেয়াই স্বাভাবিক, তা মেয়েটি দিলে মেয়েটি চরিত্রহীন! ছেলেটি দিলে তা চরিত্রহীনতার প্রমাণ নয়।

এই ধরণের চিন্তাভাবনার জন্য দায়ী নারীর ওপর সতীত্বের ধারণা চাপিয়ে রাখা। সৎ বা অসতী যৌনাঙ্গের ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে না। মেয়েদের যৌন চাহিদা আছে, তা পুরুষের চাইতে বেশিই। মেয়েরা যতবেশি এই কথাগুলো স্বীকার করবে, প্রকাশ্যে বলবে, সমস্যাগুলো তত কমতে থাকবে।

তবে, সেটি অসভ্য অভদ্রভাবে যেখানে সেখানে অনিচ্ছুক ছেলেদের যৌন প্রস্তাব দিয়ে নয়।


  • ৮১৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

আসিফ মহিউদ্দিন

জার্মান প্রবাসী আসিফ মহিউদ্দীন বাঙলা অন্তর্জালে একজন নিধার্মিক ব্লগার এবং অনলাইন একটিভিস্ট।

ফেসবুকে আমরা