#MeToo আন্দোলনের চেয়ে ধর্ষণ প্রতিরোধই উত্তম, দরকার মুক্তমনা নারীর

শনিবার, নভেম্বর ৩, ২০১৮ ৭:২৫ AM | বিভাগ : আলোচিত


আমার এক আমেরিকান কলিগ ছিলো মাত্র তেইশ বছরের। এক মেয়েসহ তার সেপারেশন ঘটে। যদিও সে সেপারেশনে রাজী ছিলো না তথাপি বর চাওয়ায় তাকে বাধ্য হয়ে মেনে নিতে হয় বিষয়টি।

সে নিজে কাজ করছিলো, মেয়েকে মানুষ করছিলো। তবে আলাদা হয়েও সেপারেশনকে মেনে নিতে পারছিলো না দীর্ঘ সময়। এভাবেই কয়েক বছর কেটে যায় তার। তেমনই দিনে এক কলিগ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়, যে সিঙ্গেল, সুদর্শন এবং মানুষ হিসেবেও যথেষ্ট উত্তম।

যখন জানলাম ছেলেটির প্রস্তাব সে ফিরিয়ে দিয়েছে তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কেনো ফিরিয়ে দিলে ওর প্রস্তাব, ওতো অনেক ভালো মানুষ। সে উওর দিয়েছিলো, আমারতো একটি বাচ্চা মেয়ে আছে তাই সহসা কোনো ছেলেকে বিশ্বাস করতে পারি না যদি আবার মেয়েকে...! অবাক হয়ে তাকিয়ছিলাম তার দিকে এই বয়সেই কতটা সচেতন সে সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে যে দেশে সন্তানদেরও আলাদা করে শেখানো হয় কী করে বাবা মায়ের মারকে রুখতে হয়! কোনটি সেক্সসুয়াল এ্যাবিউজ এবং রোধের উপায়।

সম্প্রতি, প্রিয়তি এবং সীমন্তি #MeToo আন্দোলনে শরিক হয়ে যৌন হেনস্থার অভিযোগ তুলেছেন জনাব রফিকুল ইসলাম এবং জনাব প্রণব সাহার বিরুদ্ধে। তাদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মেয়েদের মতামত দেখে আমি রীতিমত অবাক। অনেকেরই ভাবখানা এমন যেনো দেশে এই ঘটনা দু'টোই প্রথম এবং দ্বিতীয় যৌন হেনস্থারর ঘটনা এবং যথেষ্ট অবাক হবার মতো কোনো বিষয়। যে দেশে ঘরে ঘরে কাজের মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়, যে দেশে ভীড়ে হাঁটতে গেলেই পুরুষের হাত মেয়েদের শরীরের কোথা দিয়ে যে কোথায় চলে যাবে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই, সেই দেশে বসবাস করেও এটা কী এতোটাই অবাক হবার মতো কোনো ঘটনা?

তবে অবশ্যই সীমন্তির বিষয়টিতে আমি অবাক হয়েছি। অপ্রাপ্ত বয়স্ক যে কোনো মেয়ের সেফটি নিশ্চিত করা তার বাবা-মায়ের প্রধান দায়িত্ব এবং সেটুকু প্রজ্ঞা প্রতিটি অভিভাবকেরই থাকা উচিৎ যেনো সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে। মায়ের বর বা প্রেমিক হলেই যে সন্তান তার কাছে নিরাপদ এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

যাই হোক প্রিয়তি সেদিন 'সুবিধাজনক সময়ে সেক্স হবে' প্রতিশ্রুতি দেবার মাধ্যমে যেভাবে ধর্ষণ থেকে বেঁচেছিলো যেটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে আরও উত্তম পন্থা ছিলো যখনই তার সাথীকে ঘর থেকে বের হতে বলা হয় পার্সোনাল কথার অজুহাত দিয়ে তখনই বলা যেতো আমি চাই আলোচনায় সেও থাকুক। কাজ পাবার হলে সেটা এমনিতেই জোটে, সব শর্তে রাজী হবার দরকার নেই।

এখন প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে #MeToo আন্দোলন কতটা প্রভাব ফেলবে? বলতে বাঁধা নেই দেশীয় অধিকাংশ ছেলেই মেয়েদের রেসপেক্ট করতে শেখে নি এখনও। এমন কী যৌন হেনস্তাকেও আজও অনেকে মনে করে, ফানি বিষয়। অথচ এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেই সাথে আছে দেশীয় মেয়েদের পিছিয়ে থাকা চিন্তাচেতনা। অনেকেই মেয়েরা যৌন হেনস্তার শিকার হলে ভাবে জীবন শেষ, তার জীবন এবং চরিত্রে আর কিছু বাকী নেই। সেই সাথে প্রেম বা বিয়েসাদিতেও মেয়েদের মূল্যায়ণ করা হয় তার যৌনাঙ্গের অস্পর্শতা এবং ভার্জিনিটি দিয়ে। আজীবন ভার্জিনিটি সুরক্ষাই যেন মেয়েদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য, আর কোনো কাজ নেই এই জীবনে। সেই ভার্জিনিটি যদি হাতছাড়া হয়ে যায় তাহলে আর সেই জীবনের মূল্য কী? অথচ যৌনাঙ্গ শরীরেরই একটি পার্ট মাত্র।

নারীকে হাতের মুঠোয় রেখে ইচ্ছে মতো খেলাতে তার যৌনাঙ্গের উপর এত গুরুত্ব আরোপ নারীকে কন্ট্রোলেরই একটি কৌশল।

পুরুষের হাতেই নারী যৌন হেনস্তার শিকার হয় আবার সেই পুরুষ সমাজই তাকে চরিত্রহীনতার খেতাব দিয়ে সিল লাগিয়ে দেয়, যেনো সহসা আর ঘাড় সোজা করে দাঁড়াতে না পারে সে। নারীও হয়ত সেভাবেই চিন্তা করে, আমি শেষ, আমার জীবন শেষ! জীবন যেনো একটি ডিসপোজেবল গ্লাস, একবার ব্যবহারেই গার্বেজযোগ্য। অথচ যৌন হেনস্তার শিকার পুরুষও হয়। তারাও তখন মানসিক এবং শারীরিকভাবে আহতবোধ করে। কিন্তু তাদের উপর সামাজিক সন্মানহানি এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবার চাপ থাকে না। যেটা নারীদের ক্ষেত্রেও ঘটার কথা ছিলো। কিন্তু আমরা এখনও ততটা সচেতন হতে শিখেছি কই? আর ওটাই এখনও নারীকে দমনের বড় অস্ত্র পুরুষের হাতে। নারীই ধর্ষিত হবে আবার এর বদনাম এবং সার্বিক ক্ষতিও তারই। যেখানে আজও সেক্সের এস উচ্চারণেই নারীর চরিত্রের ধ্বস নেমে আসে, সেখানে নারী কী করে ধর্ষণ ঠেকাতে 'সেক্সে রাজী নই' বলে চিৎকার করে উঠবে হঠাৎ করে? অথচ #MeToo আন্দোলনের চেয়ে ধর্ষণ প্রতিরোধই উত্তম। যার জন্যে দরকার নিজের মনোভাব স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশের স্বাধীনতা। মনই যদি সামাজিক দাাসত্বের শিকার হয় তাহলে কি আর সেই মুুখে ভাষা থাকে?

শুধুমাত্র দু'জন প্রিয়তি বা সীমন্তিই নয় বাংলাদেশের অধিকাংশ মেয়েই কোনো না কোনো ভাবে যৌন হেনস্তার শিকার। কখনও পথে, কখনও কর্মক্ষেত্রে, কখনওবা নিজ ঘরে... এটা পুরুষরাও যেমন জানে, জানে নারীরাও। তাই অভিযোগকারীর বিশ্বাসযোগ্যতা কতটা প্রশ্নবিদ্ধ সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে এই আন্দোলনে শরিক নারীর সেফটি, অর্থনৈতিক অবস্থা, আইনী লড়াই, প্রমাণাদি এবং চাপ সইবার ক্ষমতায়।


  • ১৬২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শিল্পী জলি

সমাজকর্মী, ইউএস প্রবাসী

ফেসবুকে আমরা