কাবেরী গায়েন

অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ওসাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শিক্ষক লাঞ্ছনাকারী শিক্ষার্থীদের হাতেই দেশের ভবিষ্যতের ভার!

শিক্ষক লাঞ্ছনার খবর প্রথম শুনেছিলাম ২০১৩ সালে পাবনার সাঁথিয়ার বনগ্রামে (না কি নবগ্রাম?)। কোন এক দশম শ্রেণীর ছাত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিলো সে কোরান অবমাননা করেছে। ফলে গোটা গ্রামের সম্পন্ন কিংবা গরীব সকল হিন্দু বাড়িতে আক্রমণ চালানো হয়েছিলো। কালী পূজার রাতে মন্দির তছনছ করা হয়েছিলো, বিগ্রহ লাঞ্ছিত করা হয়েছিলো। বাজারের সকল হিন্দুর দোকানে হামলা চালানো হয়েছিলো। আমরা ঢাকা থেকে যে প্রতিনিধি দল গিয়েছিলাম, গিয়ে শুনলাম সেই ছাত্রের 'অপরাধ'-এর জের ধরে স্থানীয় কলেজের অধ্যক্ষকে তারই প্রাক্তন ছাত্রের নেতৃত্বে একদল সরকারী দলের লোকজন গিয়ে সারা দিন রোদের মধ্যে কলেজ মাঠে দুই হাতে ইট দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলো। অজুহাত দিয়েছিলো সেই ছাত্রনেতা অধ্যক্ষকে দেখা করতে হুকুম দিয়েছিলো কথিত ধর্ম অবমাননার বিষয়ে আলোচনার জন্য কিন্তু তিনি কলেজ ছেড়ে তখন যেতে না পারলেও কলেজ শেষে দেখা করবেন জানিয়েছিলেন। সেই কারণে তার প্রাক্তন ছাত্র, বিশিষ্ট যুবনেতা গিয়ে তাকে এই শাস্তি দিয়েছিলো। তিনি সেই শাস্তি নিয়েছেন। সবাই দেখেছে। সেই প্রথম আমি এমন ঘটনার কথা শুনি। 

এরপর অনেক ঘটনার ভেতর দিয়ে আমরা গেছি। শ্যামলকান্তি স্যারকে কান ধরে ওঠবস করানো হয়েছিলো। স্থানীয় সংসদ সদস্য শিক্ষার্থীদের সামনে শ্যামলকান্তি স্যারকে চড় মেরেছিলেন। শ্যামলকান্তি স্যারকে হাজতে নেয়া হয়েছিলো। আমরা দল বেঁধে সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের কান ধরার ছবি দিয়েছিলাম। শ্যামল কান্তি জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন এক পর্যায়ে। কিন্তু সেই সাংসদের কোনো বিচার হয়নি। যেসব শিক্ষার্থী-শিক্ষক এই কাজের সাথে জড়িত ছিলেন, তাদের কোনো বিচার হয়নি। ঘটনার সূত্রপাত ঘটিয়েছে যাদেরকে আমরা 'কোমলমতি' শিক্ষার্থী বলি, তারাই।

হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের ঘটনার ক্ষত তো এখনো শুকায় নি। বিজ্ঞান পড়ানোর অপরাধে তাকে মারা হয়েছে। সেই মারধরে নেতৃত্ব দিয়েছে তারই শিক্ষার্থীরা। তাকে না জানিয়ে তার বক্তব্য রেকর্ড করেছে তাকে শাস্তি দেবার জন্য। স্যারকে জেলে নেয়া হয়েছে। আমরা শাহবাগে দাঁড়িয়েছি। শিক্ষক থেকে তিনি করুণার পাত্রে পরিণত হয়েছেন মূহুর্তেই। তিনি ছাড়া পেয়েছেন শেষতক। কিন্তু যাদের উস্কানিতে এই ঘটনা ঘটেছে, কিংবা যেসব শিক্ষার্থী এই ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের কিছুই হয়নি।

হৃদয় কান্তির ঘটনার সময়েই আরেক নারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছড়ানো হয়েছিলো তিনি ছাত্রীরা বোরকা পরে এসেছে বলে তাদের পিটিয়েছেন। পরে শিক্ষার্থীদের ভিডিও সাক্ষাৎকার থেকে জানা গেলো তিনি স্কুল ড্রেস না পরার জন্য শিক্ষার্থীদের বকাঝকা দিয়েছেন, কিন্তু তার সাথে বোরকা পরার কোনো সম্পর্ক ছিলো না, ছিলো না মারধরের কোনো ঘটনা। এই ঘটনা এবং রটনার সাথে সম্পর্কিত কারোরই বিচার হয়নি।

মাত্রই পড়ছিলাম গতকাল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক উন্মেষ রায় এবং আরো দু'জন শিক্ষককে শাস্তির দাবি তুলেছে শিক্ষার্থীদের একটি দরখাস্ত। আমি পড়ে দেখলাম তাদের দোষ- ফেসবুক স্ট্যাটাস। তারা কী অপরাধ করেছেন তাদের স্ট্যাটাস পড়ে বোঝা গেলো না, ধর্ম অবমাননাকর কী বক্তব্য তারা দিয়েছেন, স্ট্যাটাস পড়ে আমি অন্তত বুঝিনি। জানি না, তাদের ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে। আগাম অসহায়ত্ব জানিয়ে রাখলাম তাদের ভবিষ্যতের প্রতি।

আজ দেখলাম কলেজ শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। পুলিশের সামনে। কারণ তার কাছে এক শিক্ষার্থীর ফেসবুক পোস্টে নূপুর শর্মাকে সমর্থনের অভিযোগ নিয়ে এক দল মানুষ তার ঘরে ঢুকে সেই শিক্ষার্থীকে বহিস্কার ও শাস্তির দাবি জানালে তিনি পুলিশে ফোন দিয়েছিলেন। পুলিশের পাশে দাঁড়ানো আরো কত মানুষ! কেউ চোরাগোপ্তা পথে তাঁকে মারেনি, সবার সামনে তাকে জুতার মালা পরিয়েছে। জুতার মালা গলায় দেয়া এই শিক্ষকের কোনো অপরাধ ছাড়াই দুই হাত দিয়ে ক্ষমা চাওয়ার যে ছবি ভাইরাল হয়েছে, এটাই আমার দেশ এবং দেশের ভবিষ্যত। যেখানে অন্ধ শক্তির কাছে শিক্ষকরা হেরে গেছেন। অপদস্থ হয়ে না করা অপরাধে ক্ষমা চাইছেন। কোনো বিচার হবে এই অবমাননার? প্রশ্নই ওঠে না।

এই দেশে কথায় কথায় মারা যায় শিক্ষকদের। গলায় জুতার মালা তুলে দেয়া যায়। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সামনে তাদের কান ধরে ওঠবস করানো যায়। তাদের জেলে পোরা যায়। শুধু বলতে হবে ধর্মানুভূতিতে আঘাত দিয়েছেন তিনি। তাকে খুন করলেও সেটা দোষের হবে না আর। অথচ ধর্ষণকারী, খুনি, কোটি টাকা লোপাটকারীদের জনগন ঘেরাও করেছে, এমন একটি নজিরও নেই এই দেশে। 

এসবই করানো হয় 'কোমলমতি' শিক্ষার্থীদের দিয়ে। দুর্ভাগ্যক্রমে যেসব ঘটনার কথা বললাম, সেইসব ঘটনার শিক্ষকেরা এই দেশের সনাতনধর্মাবলম্বী নাগরিক। এই নাগরিকদের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে দেশ থেকে। দশ বছর কুড়ি বছর পরে এই ধর্মীয় পরিচয়ধারীদের সংখ্যা খুব বেশি থাকবে না এই দেশে। ফলে এই ধর্মীয় পরিচয়ধারী অনেক শিক্ষক থাকবেন না শিক্ষায়তনে। কিন্তু এইসব 'কোমলমতি' শিক্ষার্থীদের হাতে ন্যস্ত থাকবে তখন দেশের ভার। কেমন হবে সেই দেশ?

রাষ্ট্র কি কিছু ভাববে? দেশের প্রগতিশীল এবং সজ্জন সকলে কিছু কি করবেন? বলবেন? এগিয়ে আসবেন এই অন্ধকার ভবিষ্যত থেকে রক্ষা করতে?

আগামীকাল আমার এক জায়গায় পড়াতে যাবার কথা বাংলাদেশের গণমাধ্যম নিয়ে। বিকেলে ছায়ানটে যাবার কথা শ্রদ্ধেয় কামাল লোহানীর স্মরণসভায়। এক পত্রিকার প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে একটা লেখা আজ রাতেই লিখে কাল সকালের মধ্যে জমা দেবার কথা। আমি এসব কাজের কোনো অর্থ খুঁজে পাচ্ছি না। আমার কোনো কথার কোনো ক্লিপ দিয়ে কে আমার জন্য জুতার মালা নিয়ে অপেক্ষা করছে কোথায়, আমি জানি না। আমি এদেশে শিক্ষকতা পেশা নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমি দেশের ভবিষ্যত নেতৃত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন।

পদ্মা সেতুর উপরে ঝলমল করা হাজার আলোও এই অনিবার্য অন্ধকার ভবিষ্যতকে রক্ষা করতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। আমি ঘটনার বিচার দাবি করি না তোতাপাখির মতো আর। আমরা কি একটু ভাববোও না?

739 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।