ঘরে কিংবা বাইরে, নারী নিরাপদ কোথায়?

শুক্রবার, ডিসেম্বর ৬, ২০১৯ ১১:৫৩ PM | বিভাগ : সম্পাদকের কীবোর্ড


একটা নারী যখন গর্ভবতী হয়, তখন আলট্রাসনোগ্রাম করে নিশ্চিত করা হয় আগত ভ্রুণটি ছেলে না মেয়ে? অনেক সময় মেয়ে হলে নারীর প্রতি একটা অবহেলার দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয় অথবা মেয়ে ভ্রুণটাকে নষ্ট করে দেয়া হয়৷ কখনই নারীর ইচ্ছা অনিচ্ছার গুরুত্ব দেয়া হয় না৷ মেয়ে হলে তার ভ্রুণও মায়ের গর্ভে নিরাপদ না৷

এরপর যখন মেয়ে শিশুটি জন্মগ্রগণ করে তখন পরিবারের মানুষজন ভাবে একে বেশী পড়াশুনা করানোর দরকার নাই, অথচ পরিবারের ছেলে সন্তানটি ভালো স্কুলে পড়ে৷ খাবার, পোষাক, বিনোদন, বাইরে চলাফেরা সব ক্ষেত্রেই স্বাধীনতা ভোগ করে ছেলে শিশুটি৷

মেয়ে সন্তানটি পরিবারের অথবা বাইরের মানুষ দ্বারা লালসার শিকার হতে থাকে প্রতিনিয়ত৷ একটা ভয় নিয়ে দিন দিন বেড়ে উঠে শিশুটি৷ কারো চুমুর স্পর্শ আর গোপন অঙ্গে স্পর্শ এতোটাই খারাপ ইঙ্গিত করে যে মেয়েটি মনের ভিতরে অজানা একটা সংশয় নিয়ে বড় হতে থাকে৷ অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাকেও বিষয়টা খুলে বলতে পারে না৷ শুধুই ভয় কেনো, এখন তো শিশুরাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে৷

তারপর যখন বয়োসন্ধিকালে পৌঁছায় তার নিরাপত্তার জন্য এবং বুকটা ঢেকে রাখার জন্য জন্য মা জামায় কুচি দিয়ে দেয়৷ অজান্তেই এক সময় মাসে মাসে নিঃস্বরণ হতে থাকে রক্তের ধারা৷ মায়ের ভয় তখন আরো বেড়ে যায়৷ সাথে করে স্কুলে, কোচিং-এ কিংবা মার্কেটে বেড়াতে নিয়ে যেতে হয়৷ তবুও সবকিছু এড়িয়ে মেয়েটি কোনো পুরুষের নজরে পড়ে যায়৷ প্রেমের লালসা ঘেরা স্বপ্নে বিভোর পুরুষগুলো তাকে পাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে৷ মা-বাবাকে তখন আরো সতর্ক হতে হয়৷ উৎকন্ঠায় দিন কাটে তাদের৷ মেয়ের পড়াশুনার অবনতি ঘটতে থাকে, মেয়েটাকেও ভয়ে ভয়ে পরিবারে আর বাইরে চলতে হয়৷ ইভটিজিং শিকার হয়ে কতো মেয়ে যে আত্নহত্যা করেছে তা বলা বাহুল্য৷ কিশোরী বয়সের এই যে অনিরাপত্তা তাকে শংকায় ফেলে দেয়৷ মেয়ে হয়ে জন্ম নেয়াকে ঝামেলা মনে করে৷ ছেলে হয়ে জন্মালে হয়তো এতো বিধি নিষেধ থাকতো না৷

এরপরে যখন কিশোরী বয়স থেকে কোনোরকম বেঁচে যায়, তখন কলেজে যাতায়াত শুরু হয়৷ মা-বাবা মনে করেন এখন বড় হয়েছে একা একাই কলেজ করতে পারবে৷ কিন্তু সেখানেও বিপত্তি; উঠতি বয়সের পাড়ার ছেলে আর কলেজের ছেলেদের অত্যাচারে কোচিং আর কলেজ করা তুঙ্গে উঠে যায়৷ মাকে আবার সাথে করে সব জায়গায় নিয়ে যেতে হয়৷ এখন অবশ্য আর এসিড ছোঁড়ার খবর শুনি না৷ এখন প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া না দিলে চাপাতি দিয়ে কোপানো হয়৷ মাথা খন্ড বিখন্ড না করলে যেনো প্রতিশোধ নেয়া সম্ভব হয় না৷ আরা কেউ কেউ ধর্ষণের শিকার হয়ে খন্ডিত হয়ে পড়ে থাকে পুকুর অথবা ডোবায়৷ মেয়েটাকে বলি হতে হয় খুনের৷ মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকরাও আজকাল ছাত্রীদেরকে করছে ধর্ষণ৷

আর যদি সে ভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পায়, তখনও প্রেমের দ্বারা প্রতারিত হয়ে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটায়৷ আর তা না হলে কোনো পুরুষের পাল্লায় পড়ে পর্ণ ভিডিও এর শিকার হয়৷ আর ওয়েব সাইটে যখন সেই ভিডিও আপলোড করা হয় তখন উল্লাসে পুরুষরা মেতে উঠে৷ পুরুষটা যেনো ধোয়া তুলসীপাতা৷ সম্মতিতে যেসব প্রেম হয় সেখানেও নারীটি প্রেগনেন্ট হয়ে পড়লে লোক লজ্জার ভয়ে বাচ্চা নষ্ট করতে গিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে৷

বিয়ের বয়স যখন হয় তখন ছেলে পক্ষ থেকে এসে তার যোগ্যতাকে মাপে না৷ দেখে মেয়ের পিতার কতো টাকা আছে? যৌতুক নিয়ে কতোটা লাভবান হওয়া যাবে৷ পিতা মাতা মেয়ের সুখের কথা ভেবেই হয়তো কিছু দিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করেন৷ তারপর শুরু হয় বাড়তি টাকার লোভ৷ শারিরীক আর মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে কাউকে মেরে ফেলা হয়৷ আবার কেউ কেউ সংসারে জীবিত থেকেও মরে যায়৷ স্বামীর ঘরেও মেয়েরা নিরাপদ নয়৷ আবার শ্বশুর শ্বাশুড়ি দেবর ননদ দ্বারাও নির্যাতিত হয়৷

আবার যদি কর্মস্থলে যায় সেখানেও পুরুষ সহকর্মী অথবা উর্ধ্বতন কর্মকর্তার দ্বারা প্রতারণার শিকার হয়৷ বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে দিনের পর দিন চলতে পারে ধর্ষণ৷

ডির্ভোস প্রাপ্ত নারীরাও নিরাপদ নয়৷ আজকাল কিছু পুরুষ এদের সন্ধানে থাকে৷ এদের একাকীত্বকে পুজি করে এদের সাথে যৌন সম্পর্কে জড়াতে চায়৷ টাকা হাতিয়ে নিয়ে একসময় উধাও হয়ে যায়৷

তারপর যখন ছেলের বউ আসে তখনও শুরু হয় অবহেলা৷ বউ দ্বারা নির্যাতনের ঘটনাও এদেশে কম নয়৷ নারীরাও নারীকে নির্যাতন করতে ছাড়ে না৷ বৃদ্ধ বয়সের নিরাপত্তাটা অন্য রকম৷ তার খারার, পোশাক, শখ, বেড়ানো, টিভি দেখা, অসুখে সেবা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও দেখা যায় গরমিল৷

অথচ সব ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা দেয়ার জন্য আমাদের পরিবার, সমাজ, স্কুল-কলেজ, আইন, রাষ্ট্র ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে৷ পরিবার সবসময় সর্তক থাকবে মেয়েটির নিরাপত্তা বিধানে৷ সমাজের পুরুষদের দ্বারা যেখানে এসব নির্যাতনের ঘটনা সেখানে প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে৷ স্কুল-কলেজে কোনো নারী যেনো নির্যাতনের শিকার না হয়, কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে৷ রাষ্ট্রের আইন ব্যবস্থা নারীর অনুকূলে থাকতে হবে৷ অপরাধী যেনো আইনের ফাঁক দিয়ে বের হতে না পারে, সরকারের সে ব্যাপারে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন৷ ডাক্তারি পরীক্ষার রির্পোট যাতে সঠিকভাবে ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে৷ আমরাই পারি আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে নারীর বেঁচে থাকাটাকে স্বার্থক করতে৷


  • ৪৪৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

কেয়া তালুকদার

কবি ও প্রাবন্ধিক কেয়া তালুকদারের তিনটি কবিতার বই বের হয়েছে; "পূর্ণতা ফিরে এসো", "ছায়ামানব" এবং কলকাতার কবি মোনালিসা রেহমান'র সাথে যৌথ বই ভালোবাসার সাতকাহন প্রকাশিত হয় ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের একুশের বই মেলায়। ২০১৬ সালে পেয়েছেন 'সমতটের কাগজ' থেকে প্রাবন্ধিক হিসাবে পুরস্কার। ১৬ বছর আন্তর্জাতিক এনজিওতে চাকরী শেষে বর্তমানে "হেঁসেল" নামে রংপুরে একটি রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করছেন। লেখকের লেখা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছে।