নারী পুরুষ সম্পর্কের রকমফের

বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪, ২০১৯ ৪:৩৮ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


নারী-পুরুষ আলাদা জেণ্ডার, আর এই কারণেই একজন আরেকজনের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ভালোবেসে স্বপ্ন দেখে, উড়াল দেয় আলাদা জগতে। কল্পনা আর আশাগুলো মিলিত হয় মনোজগতে। কেউ কবি হয়ে উঠে প্রথম যৌবনের ছোঁয়ায়। বয়ঃসন্ধি কালটা অনেক উদার, প্রেমের দরজা খুলে দেয়। তাইতো নারী-পুরুষ একে অন্যের কাছে আসে, শরীর ছুঁতে চায়। এ এক বড়ো ধরণের আকাঙ্খা। হাত ধরে হেঁটে যাওয়া, জড়িয়ে ধরা, চুমু খাওয়া ইত্যাদি। পার্কগুলোতে প্রেমিক-প্রেমিকারা ছাতা মাথায় দিয়ে একে অপরের কাছে আসে। কেউ কেউ সুযোগে থাকে স্পর্শকাতর অঙ্গগুলোকে ধরার। এটা তাদের দোষ না, এটি অজানা আগ্রহ থেকে জন্ম নেয়। সব প্রেমই এখন শরীর কেন্দ্রিক।
 
আমার মতে শুধুমাত্র যৌনতা নারী পুরুষকে কাছে টানে না৷ উভয়েই চায় একজন ভালো সঙ্গী, যে বন্ধুর মতন হবে৷ যাকে পেলে জীবনের প্রতিটি ক্ষণ মনোরম ভাবে কাটানো যাবে৷ নিজেদের স্বপ্ন আর আকাঙ্ক্ষাগুলোকে পূর্ণ করা যাবে৷ কষ্টগুলোকে মুছে ফেলা যাবে৷ বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন নারী কিংবা পুরুষ একজনের সাথেই সারাজীবন পার করে দেয়ার জন্য ইচ্ছুক থাকে৷ কিন্তু তা কিছু মানুষের জীবনে সম্ভব হয়ে উঠে না৷ একটা জীবনের চাওয়া পাওয়াগুলোর ভিন্নতার কারণে নারী পুরুষ এক সাথে মিলে থাকতে পারে না৷ কিন্তু যখন একটা নারীর ডিভোর্স হয় তখন সমাজের মানুষ কেনো নারীটির দিকে খারাপের আঙ্গুল তুলে? পুরুষটি খারাপ হলেও তাকে দোষারোপ করা হয় না৷ পুরুষটির কি কোনো দোষ নেই? পুরুষটি নিজেও নিজেকে সাধু ভাবে৷ শ্বশুড় বাড়ীর পুরুষ সদস্যসহ নারীরাও নারীটির গুষ্ঠি উদ্ধার করে ছাড়ে৷ এমন ধারণা থেকে সবাইকে দূরে সরে আসতে হবে৷
 
 
নারী পুরুষ নিজেদের দোষ স্বীকার করে শুদ্ধ হলে এত সংসার ভেঙে যেতো না৷ সন্তানগুলিও শান্তি পেতো৷ বিপথগামী হতো না৷
 
কপালে বড় টিপ পরা মানে সে চরিত্রহীনা।  এমন  কথা শোনা যায় পুরুষদের মুখে। চরিত্র কি কপালের টিপে দেখা যায়? নাকি যারা এসব কথা বলে তাদের সাথে কপালে টিপ পরা নারীরা শুইতে গিয়েছিলো? এসব অবান্তর কথা না বলে নিজের মা বোন আর বউয়ের সুরক্ষা করেন। হয়তো একদিন আপনার ঘরের নারীটিও এমন কথা শুনতে পারে।
 
চরিত্র কি গাছে ধরে? পেড়ে খেয়ে নিলাম। এক পুরুষ বহু নারীর সাথে শুয়েও চরিত্রহীন হয় না। প্রেম আর পরকীয়ায় কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটলে দোষ দেয়া হয় নারীকে৷ পুরুষ শুধু মজা লুটার ঘুড়ি৷ পুরুষের দোষ কারো চোখে পড়ে না৷ পড়বেই বা কেনো?
 
প্রেম পরকীয়া সব পুরুষের অধিকার ৷ এই সমাজের পুরুষদের মানসিকতা সব সময় নারীকেই অশ্লীল ভাবে৷ নারী কেনো প্রেম বা পরকীয়ায় জড়ালো? পুরুষটি ছাড়া যে কাজটি সম্ভব নয়, তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত সে স্বীকারোক্তি লম্পট পুরুষটি নিজেও স্বীকার করে না৷ নারীটিই চরিত্রহীনা, নারীর ইজ্জত চলে যায়৷ নারীটি সমাজে মুখ দেখাতে ভয় পায়৷ নারীর সংসার ভাঙ্গে৷ পুরুষের কিছুই হয় না, তারা আরেক বিয়ে করে আবার আধিপত্যের লড়াইয়ে জিতে যায়৷
 
একজন প্রেমিকাকে না পেয়ে জীবনে আর বিয়েই করেনি কোনো কোনো প্রেমিক। কিন্তু প্রেমিকাদের বাবা-মায়ের ইচ্ছাতেই বিয়ে করতে হতো। দু' একটা এমন ঘটনাও আছে, যে নারীরা উপার্জনক্ষম তারা প্রেমকে টিকিয়ে রাখকে না পেরে বিয়ে করেননি।
 
আবার ডিজিটাল যুগের প্রেমের রকমারী দেখা যায়। ইন্টারনেটের বদৌলতে একজন আরেকজনকে খুঁজে পেতে সময় লাগছে না। দেখা না হলেও মেসেজের মাধ্যমে যোগাযোগ হচ্ছে। তাছাড়া দেখা করার বিষয়টি অতি সহজতর হয়ে গেছে। নারীদের ঘরের বাইরে যেতে তেমন বিধিনিষেধ নাই। যেহেতু তারা স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়। চাইনিজ, ফাষ্টফুড খাওয়া, কোথাও ঘুরতে যাওয়া কোনো বিষয়ই না। প্রেমিক প্রেমিকারা তাদের ছবি আপলোড দিচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। প্রেম সংগঠিত হওয়াও যেমন সহজ হয়েছে, আবার খুব সাধারণ ঘটনায় সহজেই ব্রেকআপ হয়ে যাচ্ছে। ব্রেকআপ পার্টি হচ্ছে। সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে।
 
এ যুগের নারী-পুরুষদের কাছে শারীরিক মিলনের বিষয়টি অতি গুরুত্ব বহন করে। বিবাহ পূর্ব মিলন ঘটছে যাদের, তাদের যে সবারই স্থায়ী বন্ধন তৈরী হচ্ছে তাও নয়। বিচিত্র ধরণের প্রেমের উদ্ভব ঘটছে, সেই সাথে প্রেমের স্বরূপ বদলে যাচ্ছে। বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা কঠিন হয়ে গেছে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই ঠুনকো কারণে প্রেম একজন থেকে আরেকজনের কাছে চলে যাচ্ছে। প্রেমের সহজলভ্যতা বেড়ে যাওয়ায় প্রেম একটি হালকা ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। তথাকথিত যোগ্য পুরুষদের সাথে বিয়ে হচ্ছে অতি সুন্দরীদের। সৌন্দর্য এ যুগেও বেশী প্রাধান্য পাচ্ছে। সেটির ক্ষেত্রে কোনো ভেদাভেদ হচ্ছে না। তবে নারীরা এ যুগে বেশী যোগ্যতা সম্পন্ন হওয়ায় অনেক সময় পরিবার থেকে যোগ্য পাত্র পেলে বাবা-মায়ের মত অনুয়ায়ী প্রেমকে বিসর্জনও দিতে হচ্ছে। একই সময়ে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যার ঘটনাও এ যুগে ঘটছে।
 
আবার আবেগতাড়িত হয়ে প্রেম করে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করার প্রবণতা এ যুগে কম। কারণ এ যুগের নারী-পুরুষ অনেক বেশী বুদ্ধিদীপ্ত। তাই একাধিক প্রেম করার ঘটনাও ঘটছে। আত্মিক বন্ধনটা ততটা দৃঢ় নয়। এ যুগে প্রেম নিয়ে প্রতারণার ঘটনাও ঘটছে। নারী-পুরুষের মাঝে আর্থিক লোভ জাগ্রত হওয়ার কারণে সুবিধা অনুযায়ী প্রেম করছে।
 
প্রেম শ্বাশত চিরন্তন, যুগে যুগে প্রেম করে অনেকেই ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছে। প্রেমের ক্ষেত্রে বাহ্যিক সৌন্দর্য মূল আকর্ষণ না হয়ে যোগ্যতা বা মনের বিশ্লেষণ বেশী হওয়া দরকার। প্রতারণতার ঘটনাগুলো না ঘটে সে বিষয়ে নারী-পুরুষ সবাইকে সচেতন হতে হবে। সেই সাথে অভিভাবকদের সন্তানদের খোঁজ খবর রাখা প্রয়োজন যেনো তাদের জীবনে প্রেম থেকে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত খারাপ পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়।
 
একজন নারীর সাথে একজন পুরুষই তো শোয়৷ কিন্তু যখন কোনো কারণে রিলেশন শেষ হয়ে যায় তখন পুরুষটি নারীটিকে বেশ্যা, খানকি, মাগী বলে গালি দেয় এবং আরো হুমকি দেয় যে তার সাথে সেক্সের ভিডিও প্রকাশ করে দিবে৷ যে পুরুষটি নারীটির সাথে খানকিগিরি করলো সে পাক পবিত্র শুদ্ধ পুরুষ হলো কীভাবে?  পুরুষগুলোর মানসিকতা পরিবর্তনের দরকার৷ নারী না হয় পাপী, মেনে নিলাম। একই কাজ করে পুরুষ পূণ্যবান হলো কী করে? ভালোবাসা মানে "আমি তোমার সঙ্গে সেক্স করতে চাই" এই সত্যি কথাটা নারী-পুরুষ ন্যাকামো করে বলে "আমি তোমাকে ভালোবাসি" তোমার জন্য মরতেও রাজি। তুমি খুব সুন্দর। ভালোবাসার গায়ে প্রলেপ দিয়ে মিথ্যা কথাগুলো বলা হয়।
 
একজন নারী অথবা পুরুষের ছবি দেখে বা বাস্তবে দেখে তার প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হওয়াটা কাম, এর মধ্যে ভালোবাসা বলে কিছুই নেই। শুধুমাত্র তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের পরেই সেই আকর্ষণ চলে যায়। হয়তো পূণরায় যৌনতা অনুভব করে কিন্তু ভালোবাসা নয়। পৃথিবীতে এই ধরণের নারী-পুরুষের সংখ্যা বেশী। আর ফেসবুকে আরো বেশী। এরা সৌন্দর্যের মোহে পড়ে যায় যতো তাড়াতাড়ি, ততো শীঘ্রই সেখান থেকে বেরিয়ে পড়তেও সময় লাগে না। ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কের জন্য এরা যৌনতাকে বেশী গুরুত্ব দেয়।
 
ভালোবাসা ভিন্ন এক অনুভূতি, সেখানে দু'জন দুজনকে চিরস্থায়ী পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে। সেখানেও যৌনতা থাকতে পারে। তবে তা দু'জনের সম্মতিতে ঘটে। একজন আরেকজনের সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে থাকতে পারাটাই ভালোবাসা। এই ভালোবাসা আবার বিভিন্ন চাওয়া-পাওয়ার পরিপ্রক্ষিতে কমে যেতে পারে। হয়তো একসময় প্রচণ্ড রকম ভালোবেসে বিয়ে করে পরবর্তীতে তার চাহিদার পূরণ না হওয়াতে সেখানেও ভালোবাসা মলিন হয়ে যেতে পারে। ভালোবাসাহীন সংসার পৃথিবীতে অনেক আছে। শুধু সামাজিকতার দায়ভার বহন করতেই এমন সম্পর্কগুলো বেঁচে আছে। আর যারা মনে করেন যে, এরকম জোড়াতালি সম্পর্ক রাখার দরকার নেই, তারাই সংসার ত্যাগ করছেন। এটা এক ধরণের সাহসিকতা অথবা নিজেকে মিথ্যা সম্পর্ক বা ভালোবাসা থেকে রেহাই দেয়া।
 
সেক্স হয়েছে বলে তাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করা যাবে না, এমন কিছু নয়। তার জন্য আত্মহত্যা করতে হবে তাও নয়। জীবন অনেক সুন্দর, একবার ভুল হয়ে গেলে সেটা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নতুন করে জীবনকে নিয়ে ভাবতে হবে। এটি সাময়িক কষ্ট, যে পেরেছে এই স্মৃতিগুলোকে ভুলতে সেই ভালো আছে। যে আপনাকে নিয়ে ভাবে না, তার জন্য আপনার ভাবনাগুলোকে বিদায় করে দিন।
 

  • ৪৫৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

কেয়া তালুকদার

কবি ও প্রাবন্ধিক কেয়া তালুকদারের তিনটি কবিতার বই বের হয়েছে; "পূর্ণতা ফিরে এসো", "ছায়ামানব" এবং কলকাতার কবি মোনালিসা রেহমান'র সাথে যৌথ বই ভালোবাসার সাতকাহন প্রকাশিত হয় ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের একুশের বই মেলায়। ২০১৬ সালে পেয়েছেন 'সমতটের কাগজ' থেকে প্রাবন্ধিক হিসাবে পুরস্কার। ১৬ বছর আন্তর্জাতিক এনজিওতে চাকরী শেষে বর্তমানে "হেঁসেল" নামে রংপুরে একটি রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করছেন। লেখকের লেখা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছে।

ফেসবুকে আমরা